kalerkantho


লাভ জিহাদ নাকি পছন্দের পুরুষকে বিয়ে করার লড়াই?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ২০:২৩



লাভ জিহাদ নাকি পছন্দের পুরুষকে বিয়ে করার লড়াই?

বাবা-মার বন্দিশালা থেকে হোস্টেলে আশ্রয়; বাবা-মার কাস্টডি থেকে কলেজ ডিনের অভিভাবকত্বে: এভাবেই কিস্তিতে-কিস্তিতে স্বাধীনতা পাচ্ছেন ২৪ বছর বয়সী হাদিয়া।

ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সোমবার অবশেষে হাদিয়ার কথা শুনেছে।

হিন্দু পরিবার থেকে আসা এই নারী বিয়ে করেছেন এক মুসলিম পুরুষকে। বিয়েটি চলতি বছরের শুরুতে বাতিল করে দিয়েছিল নিম্ন আদালত। এরপর থেকেই তাকে তার বাবার কাস্টডিতে রাখা হয়েছে।

সোমবার নয়াদিল্লিতে সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারকের এক বেঞ্চকে ২৪ বছরের ওই মেডিকেল শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমি স্বাধীনতা চাই। গত ১১ মাস ধরে আমাকে বেআইনীভাবে আমার বাবার কাস্টডিতে রাখা হয়েছে। আমি একজন ভালো নাগরিক হতে চাই, একজন ভালো ডাক্তার হতে চাই। কিন্তু আমি আমার নতুন ধর্মবিশ্বাসের প্রতিও সৎ থাকতে চাই। ’

হাদিয়া, যার আগের নাম ছিল আখিলা অশোকা, গত জানুয়ারিতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং পরে পরিবারের বিরোধীতা সত্ত্বেও এক মুসিলম পুরুষকে বিয়ে করেন।

হাদিয়ার স্বামী সাফিন জাহান নিম্ন আদালত তাদের বিয়ে বাতিলের যে রায় দিয়েছে তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে রিট করেন।

গত মাসে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, বিয়ের জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্কা নারীর নিজের সম্মতিই যথেষ্ট।

গত আগস্টে এর আগের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী সংস্থাকে আদেশ দিয়েছিল বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে যে বিয়েটি কোনো ‘লাভ জিহাদ’ ছিল কিনা।

সেসময় মানবাধিকার ও নারী অধিকার কর্মীরা আদালতের ওই রায়ের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদীদের ‘পিতৃতান্ত্রিকতা এবং ইসলামভীতি’-কেই উস্কে দেওয়ার অভিযোগ করেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা ‘লাভ জিহাদ’ এর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করেছে। লাভ জিহাদ বলতে তারা বুঝায় ইসলামপন্থীদের এমন একটি ষড়যন্ত্র যার মাধ্যমে হিন্দু নারীদেরকে প্ররোচনা, বিয়ে এবং অর্থের লোভ দেখিয়ে মুসলিম পুরুষরা বিয়ে করে।

হাদিয়ার বাবা কেএম অশোকা অভিযোগ করেন তার মেয়েকে মুসলিম বানানো হয়েছে সিরিয়ায় গিয়ে আইএস জঙ্গিদের হয়ে যুদ্ধ করতে পাঠানোর এক গোপন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে।

সর্বশেষ রায়ে সুপ্রিম কোর্ট হাদিয়াকে দক্ষিণ ভারতের তামিল নাড়ুর একটি কলেজে প্রেরণ করেছে তার পড়ালেখা শেষ করার জন্য। পড়ালেখা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আগামী ১১ মাস তামিলনাড়ু পুলিশ তাকে নিরাপত্তা দিবে।

এর মধ্য দিয়ে হাদিয়া তার বাবা-মার কাস্টডি থেকে মুক্তি পেলেন। সোমবার হাদিয়া তার বাবা-মার কাস্টডিকে বেআইনী বলে দাবি করেন। কোত্তায়াম-এ বাবার বাড়ি থেকে নয়াদিল্লি আসার সময়ই হাদিয়া বলেন তিনি তার স্বামীর সঙ্গেই থাকতে চান।

কিন্তু আদালতের সোমবারের রায়ে নাখোশ অল ইন্ডিয়া প্রগ্রেসিভ ওমেনস অ্যাসোসিয়েশন এর সেক্রেটারি কবিতা কৃষ্ণন। তিনি এই রায়কে ‘দুর্বল এবং লজ্জাজনক শো’ বলে আখ্যায়িত করেন।

তিনি বলেন, ‘হাদিয়াকে খুবই সীমিত স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। হাদিয়ার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষায় সুপ্রিম কোর্ট সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। আমি আশা করেছিলাম সুপ্রিম কোর্ট তাকে বলবে, তুমি পুরোপুরি মুক্ত। সুপ্রিম কোর্ট কেন বলেছে তোমাকে এখানে পড়েতে হবে, এবং তোমাকে হোস্টেলে থাকতে হবে? এটা কীভাবে কোর্টের কাজ হতে পারে?

তবে হাদিয়ার বাবার আইনজীবি বলছেন, আদালতকে প্রথমে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ)-র তদন্ত প্রতিবেদন খতিয়ে দেখতে হবে। তার মেয়েকে জোর করে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে কিনা সেটা বুঝার জন্য। ভারতের প্রধান বিচারপতিও সেটা জানার জন্যই হাদিয়াকে নয়াদিল্লিতে ডেকে এনেছেন। ভারতের আইনে স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরণ বেআইনী নয়। তবে জোর করে ধর্মান্তরিত করা নিষিদ্ধ।

ওদিকে নারী অধিকার কর্মীরা বলছেন, হাদিয়ার লড়াই ভারতের পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।

ভারতের গ্রামসমাজজুড়ে এখনো নারী-পুরুষকে হত্যা করা হয় শুধু তাদের নিজেদের বর্ণ-জাত-পাত ও ধর্মের বাইরে বিয়ে করার কারণে। বেআইনীভাবে নারী শিশুর ভ্রুণ হত্যা এবং যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে অহরহ।

নারী অধিকার কর্মী কৃষ্ণন বলেন, ‘লাভ জিহাদ’ মূলত হিন্দুত্ববাদীদের বানানো একটি ধারণা। যে হিন্দুত্ববাদীরা বিয়ের ক্ষেত্রে নারীদের পছন্দ-অপছন্দ এবং সম্মতির প্রতি কোনো শ্রদ্ধাই দেখায় না।

তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বড় টিভি চ্যানেলকে লাভ জিহাদের এই কল্পকাহিনীকে উস্কে দিতে দেখা গেছে। আর হাদিয়া ইস্যুতে কেরালার নিম্ন আদালতও হিন্দুত্ববাদীদের এই নিপীড়নমূলক, পিতৃতান্ত্রিক এবং ইসলামভীতিমূলক মানসিকতারই প্রতিফলন ঘটিয়েছে। ’

কৃষ্ণন বলেন, ‘হিন্দুত্ববাদীরা এখনো নারীদেরকে যৌথ সম্প্রদায়ের সম্পত্তি হিসেবেই দেখে থাকেন। ’

নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন সরকারের সমালোচক কবিতা কৃষ্ণন বলেন, ‘বিজেপির হিন্দুত্ববাদী অঙ্গসংগঠনগুলোই ‘লাভ জিহাদ’ এর ধারণাকে ছড়িয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তারা মূলত নিজেদের হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডার নায্যতা উৎপাদন করতে চায়। ’

তিনি বলেন, “মূলত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) এবং এর অঙ্গসংগঠন বজরঙ দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ লাভ জিহাদ নিয়ে প্রচারণা চালিয়েছে। যেমনটা ২০১৪ সালে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ‘আগামী প্রজন্মের মেয়েদেরকে ‘লাভ জিহাদ’ নিয়ে সাবধান করতে হবে এবং মুসলিম ছেলেদের প্রেমের ফাঁদ থেকে বাঁচার উপায়ও শেখাতে হবে’। এমনকি বিজেপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো যেসব হিন্দু নারী মুসলিমদেরকে বিয়ে করেছেন তাদের বিরুদ্ধেও প্রচারণা চালিয়েছে। ’

মানবাধিকার কর্মী এবং সাবেক সরকারি কর্মকর্তা হার্শ মানদার বলেন, ‘লাভ জিহাদ এর ধারণাটির প্রচলন করা হয়েছে দুটি সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে গভীর বিভক্তি এবং দূরত্ব তৈরি করার এক সদুরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। ’

তিনি বলেন, ‘ভিন্ন দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘৃণা তৈরর জন্য সবসময়ই নানা ধরনের কল্পকাহিনী তৈরি করা হয়। লাভ জিহাদও তেমনই একটি ধারণা। যা আমার কাছে হাস্যকর বলেই মনে হয়। ’

‘কিন্তু আমার উদ্বেগের বিষয় হলো, ভারতের কেন্দ্রীয় সন্ত্রাসবাদ তদন্ত সংস্থা এবং উচ্চ আদালত ও সাবেক প্রধান বিচারপতিও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছেন! একেই আমি তীব্র উদ্বেগের কারণ বলে মনে করি। ’, বলেন মানদার।

ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ) সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া এর তদন্ত প্রতিবেদনে বলেছে, কেরালায় হিন্দু নারীদেরকে প্ররোচিত করে ইসলামে ধর্মান্তরিত করার ঘটনা ঘটানো হয়েছে সন্ত্রাসবাদী উদ্দেশ্যে।

মানবাধিকার কর্মী শবনম হাশমি বলেন, ‘লাভ জিহাদ’ কথাটি সন্দেহের সঙ্গে নেওয়া উচিত।

‘এই কথাটি ভারতের মুসলিমদেরকে দানবীয়করনের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। হিন্দুত্ববাদীরা এই ধারণাটি ব্যবহার করেছে খুবই কার্যকরভাবে যেভাবে তারা ‘গো-রক্ষা’ এবং হিন্দু দেবতা রামের নামে মন্দির নির্মাণের ধারণা দুটোকেও কাজে লাগিয়েছে মুসলিম বিদ্বেষ উস্কে দেওয়ার জন্য। ভারতীয়দেরকে বিভক্ত করার জন্যই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এই ধারণাগুলো। ’

সূত্র: আল জাজিরা


মন্তব্য