kalerkantho


রাজধানীর ভাসমান রেস্তোরাঁর হালচাল

ড. এ কে এম হেলালউজ্জামান   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১১:১৮



রাজধানীর ভাসমান রেস্তোরাঁর হালচাল

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি, মানুষের কর্মসংস্থানের অভাব এবং সর্বোপরি রাজধানী ঢাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে জীবিকা নির্বাহের পেশা হিসেবে অনেকে ভাসমান রেস্তোরাঁর ব্যবসা বেছে নিয়েছে। দিন দিন তাদের সংখ্যা বাড়ছে।

কাস্টমারের কোনো অভাব হয় না। তবে প্রতিকূল অবস্থায় কাজ করতে হয়। কারো তেমন পৃষ্ঠপোষকতা নেই। অনেকটা নিজ উদ্যোগেই চলে এসব রেস্তোরাঁ।

এ ধরনের রেস্তোরাঁ পরিচালনায় পুঁজি বিনিয়োগ তুলনামূলক কম, আবার স্বল্প পুঁজিতে গ্রাহকসংখ্যা বেশি এবং লাভও তাত্ক্ষণিক। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে ভাসমান রেস্তোরাঁর প্রচলন আছে, বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষ, কর্মজীবী সাধারণ মানুষ এ ধরনের রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া করে। রাজধানী ঢাকার কথাই ধরা যাক, ধানমণ্ডির মতো অভিজাত এলাকার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য বাণিজ্যিক এলাকা, যেমন মতিঝিল, কারওয়ান বাজার, মনিপুর ইত্যাদিতে ভাসমান রেস্তোরাঁর কার্যক্রম চালু আছে।

স্বল্প আয়ের মানুষের বড় হোটেলে খাওয়ার সংগতি নেই। সেখানে খেতে গেলে বড় ধরনের বাজেট লাগে।

অনেকটা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থাকলেও ভাসমান রেস্তোরাঁয় খাওয়া ছাড়া তাদের উপায় থাকে না। নির্ধারিত বাজেটের মধ্যে সকালের নাশতা বা দুপুরের খাবার খাওয়া যায়। অনেকের পক্ষে বাসা থেকে এ ধরনের খাবার আনা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

ভাসমান রেস্তোরাঁগুলোকে নিম্নোক্ত ভাগে ভাগ করা যায়

ক. সকালে এমন রেস্তোরাঁ, যেখানে সকালের নাশতা পাওয়া যায়। পরোটা, রুটি, ভাজি ইত্যাদি বিক্রি হয়। তবে তারা একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বসে।

খ. এমন রেস্তোরাঁ, যেখানে দুপুরের খাবারের আয়োজন থাকে। খাবার থাকে। যেমন—ভাত, খিচুড়ি, ডিম, ডাল বা এক টুকরা মাংস খেতে লাগে ৫০ থেকে ৭০ টাকা। তারা সাধারণত নির্দিষ্ট এক জায়গায় অবস্থান করে।

গ. আরো কিছু রেস্তোরাঁ রয়েছে, যেগুলো চলমান ভ্যানের ওপর স্থাপিত, যেখানে পাওয়া যায় ফুসকা, চটপটি, পিঠা, কাবাব ইত্যাদি।

ঘ. এ ছাড়া রয়েছে কোনো ব্যক্তি কাঁধে করে বিক্রি করে  ঝালমুড়ি, বাদাম, চানাচুর ইত্যাদি।

এ ধরনের রেস্তোরাঁর কদর দিন দিন বাড়ছে। ক্রেতার তেমন অভাব নেই। ক্ষেত্রবিশেষে এ ধরনের রেস্তোরাঁর স্থায়ী কাস্টমার থাকে। সাম্প্রতিককালে এ ধরনের ৫০টি ভাসমান রেস্তোরাঁর ওপর গবেষণা পরিচালনা করা হয়। গবেষণালব্ধ ফলাফলের কিছু দিক উল্লেখ করা হলো।

ক. বেশির ভাগ রেস্তোরাঁর অবকাঠামো দুর্বল ও নাজুক, স্থায়ী বা চলমান ভ্যানের ওপর খাবার জিনিস রাখা হয়।

খ. বেশির ভাগ রেস্তোরাঁয় খাবার সরবরাহের জন্য যে প্লেট ও গ্লাস থাকে তা প্লাস্টিকের তৈরি, এগুলো ধোয়া-মোছা করার পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত নয়। অনেক ক্ষেত্রে গামছা দিয়ে মুছে খাবার পরিবেশন করা হয়।

গ. যারা খাওয়াদাওয়া করে তারা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। কেউ বা স্বল্প আয়ের চাকরিজীবী, কেউ রিকশাচালক, কেউ ভ্যানচালক।

ঘ. এ ধরনের রেস্তোরাঁ পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনগত কোনো কাগজপত্র কারো কাছে নেই। আইনি সংস্থার লোকজন তাদের উচ্ছেদ করতে চায় বা ভাড়া নেয়—এসংক্রান্ত প্রশ্নের তারা কোনো উত্তর দিতে চায়নি।

ঙ. বৃষ্টির দিনে তাদের গ্রাহকসংখ্যা কমে যায় এবং বিক্রি কম হয়। কয়েকটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তাদের মাথার ওপর পলিথিন ছড়ানো, যা রোদ-বৃষ্টিতে কাজে লাগে।

চ. বেশির ভাগ রেস্তোরাঁ সরকারি বা অন্য কারো সহায়তা ছাড়া নিজেরাই পরিচালনা করে।

ছ. নিজের জমানো পুঁজি, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার নেওয়া অর্থ দিয়ে চালু করেছে এ ব্যবসা।

জ. দৈনিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে এগুলো পরিচালিত হয়।

ঝ. দীর্ঘ মেয়াদের কোনো পরিকল্পনা নেই।

ঞ. মোটামুটি লাভ থাকে, তবে এভাবে চালিয়ে বিত্তশালী হওয়া কঠিন।

ট. যারা এ ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করে তারা একটি আইনি কাঠামোর আওতায় আসতে আগ্রহী।

ঠ. অনেকেই সরকারি সহযোগিতার প্রত্যাশী।

এ ধরনের রেস্তোরাঁ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নিম্নে বর্ণিত বিষয়টি বিবেচনার দাবি রাখে।

আইনি কাঠামোতে কিভাবে আনা যায় তার কৌশল প্রণয়ন প্রয়োজন, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পরিচালনার বিষয়ে যা যা করণীয়, যেমন—পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পরিবেশন, বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি সরবরাহ করা, সে বিষয়ে কার্যকর কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা আরো গবেষণার দাবি রাখে। এ কথা অনস্বীকার্য যে ভাসমান রেস্তোরাঁর প্রয়োজন আছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বিষয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবার উদ্যোগ দরকার।

লেখক : অধ্যাপক, আশা ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ



মন্তব্য