kalerkantho


বাস্তবের আগেই কল্পনায় চাঁদে যাওয়ার গল্প শোনানো টিনটিন আজও সমান জনপ্রিয়!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১০ জানুয়ারি, ২০১৮ ২১:২১



বাস্তবের আগেই কল্পনায় চাঁদে যাওয়ার গল্প শোনানো টিনটিন আজও সমান জনপ্রিয়!

দেখতে দেখতে কেটে গেছে প্রায় ৯০ টা বছর। হাঁ, ৯০ বছরে পড়ল টিনটিনের আবির্ভাব দিবস। তবে, আবির্ভাবে বয়স ছিল প্রায় ১৫ বছর। সেই দিক দিয়ে দেখতে গেলে শতবর্ষের গন্ডি কবেই ছাড়িয়েছে একসময়ের তরুণ রহস্যপ্রেমী সাংবাদিক। তবে, টিনটিনের সৃষ্টিকর্তার মতে তার জন্মদিনটা ১০ই জানুয়ারীই।

কমিকস ভালোবাসেন কিন্তু হার্জের টিনটিনকে ভালোবাসেন না এমনটা হতেই পারে না। টিনটিন সিরিজটি বিংশ শতাব্দীর সবচাইতে জনপ্রিয় ইউরোপীয় কমিকসগুলির অন্যতম। মোট ৭০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত এই সিরিজের বইয়ের কপি বিক্রির সংখ্যা ২৫ কোটি ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই।

টিনটিন কমিকস সিরিজ যে অনবদ্য বৈশিষ্ট্যের কারণে পাঠকমহলে জনপ্রিয় তার মধ্য উল্লেখযোগ্য হল, গল্পের ঘটনার চমকপ্রদতা, অদ্ভুত রসবোধ, অসম্ভব ডিটেইলস ড্রয়িং, সমসাময়িক ঘটনার নিঁখুত বর্ণনা, সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটের গল্প ইত্যাদি। বিংশ শতকের অনেক সমসাময়িক ঘটনাই উঠে এসেছে টিনটিনের বিভিন্ন সিরিজে।

যেমন ‘নীল কমল’ (The Blue Lotus) বইটির ঘটনাপ্রবাহ তৈরী হয়েছিল ১৯৩৪ সালে সংঘঠিত চীন-জাপান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে। আবার “ওটোকারের রাজদন্ড” (King Ottokar’s Sceptre) গল্পটির প্রেক্ষাপট তৈরী হয়েছে রুমানিয়ার রাজা Carol II এর সাথে তদকালীন সমাজতন্ত্র-বিরোধী রাজনৈতিক দল “Iron Guard” এর সংঘাতের প্রতিচ্ছবি দিয়ে। এমনকি চাঁদে টিনটিনেও ডিটেলস বর্ণনার কারণে উপভোগ্য হয়েছে কমিকস প্রিয় মানুষদের কাছে।

কমিকস হলেও সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্যতে ভরা আছে টিনটিনের অ্যাডভেঞ্চার। টিনটিন, ক্যাপ্টেন হ্যাডক, প্রফেসর ক্যালকুলাস, জনসন ও রনসন প্রতিটি চরিত্রই অসাধারণ। কুকুর কুট্টুসও বিখ্যাত পৃথিবী জুড়ে। ছোট থেকে কিশোর বয়সে পাগলের মত মানুষ গিলেছে টিনটিন সিরিজের একেকটা বই।

আদতে টিনটিন, বেলজিয়ান শিল্পী জর্জ রেমি (১৯০৭–১৯৮৩) রচিত একটি কমিক স্ট্রিপ সিরিজ। জর্জ রেমি বাংলায় হার্জ নামেই পরিচিত)। ১৯২৯ সালের ১০ জানুয়ারি ল্য ভাঁতিয়েম সিয়েক্‌ল (Le Vingtième Siècle) নামক একটি বেলজিয়ান সংবাদপত্রের ল্য প্যতি ভাঁতিয়েম (Le Petit Vingtième) নামক শিশুদের ক্রোড়পত্রে ফরাসি ভাষায় সর্বপ্রথম এই সিরিজের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

ধারাবাহিকভাবে মোট চব্বিশটি অ্যালবামে প্রকাশিত এই সিরিজটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। টিনটিনকে নিয়ে একটি সফল পত্রিকা প্রকাশিত হয়। টিনটিনের গল্প অবলম্বনে চলচ্চিত্র ও নাটকও নির্মিত হয়। সিরিজটি বিংশ শতাব্দীর সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় ইউরোপীয় কমিকসগুলির অন্যতম। তাই তো, মোট ৭০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত এই সিরিজের বইয়ের কপি বিক্রির সংখ্যা এখন ২৫ কোটি ছাড়িয়ে গেছে।

টিনটিন সিরিজের পটভূমি প্রধানত বাস্তব বিংশ শতাব্দীর দুনিয়া। সিরিজের নায়ক টিনটিন (ফরাসি সংস্করণে: Tintin ত্যাঁত্যাঁ) একজন বেলজিয়ান সাংবাদিক। প্রথম থেকেই বিভিন্ন অভিযানে তার সর্বক্ষণের সঙ্গী বিশ্বস্ত পোষা ফক্স টেরিয়ার কুকুর কুট্টুস (ফরাসি: Milou, মিলু; ইংরেজি: Snowy, স্নোয়ি)। পরবর্তীকালে তার অভিযানের সঙ্গী হন উদ্ধত, উন্নাসিক ও খিটখিটে নাবিক ক্যাপ্টেন হ্যাডক, প্রতিভাবান অথচ কানে খাটো প্রফেসর ক্যালকুলাস (ফরাসি সংস্করণে: Professeur Tournesol প্রোফেস্যর তুর্ন্যসল) এবং অপদার্থ গোয়েন্দা জনসন ও রনসনের (ফরাসি সংস্করণে: Dupond et Dupont দুপোঁ এ দুপোঁ, ইংরেজি সংস্করণে: Thomson and Thompson টমসন অ্যান্ড টমসন) মতো বেশ কিছু পার্শ্বচরিত্র।

কোনো কোনো কমিকসে হার্জে স্বয়ং উপস্থিত থেকেছেন অপ্রধান চরিত্র হিসেবে। আবার কখনও কখনও তাঁর সহকর্মীদের সেই সকল চরিত্রে অঙ্কন করেছেন। হার্জে এই কমিক স্ট্রিপ সিরিজটি আঁকতে লিন ক্লেয়ার (ligne claire) নামের শৈলী ব্যবহার করেন। পরিচ্ছন্ন ও অভিব্যক্তিমূলক অঙ্কনের জন্য সিরিজটি বহুকাল ধরে প্রশংসিত হয়ে আসছে।

আগাগোড়াই টিনটিন সিরিজের বৈশিষ্ট্য হল এর নির্মল হাস্যরস। পরবর্তীকালে তার সঙ্গে যুক্ত হয় পরিশীলিত শ্লেষ এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাষ্য।

পেশায় টিনটিন একজন সাংবাদিক। যে যুগের প্রেক্ষাপটে হার্জে টিনটিনের এই পরিচয়টি তার একাধিক অভিযানের বর্ণনায় ব্যবহার করেছেন, সেই যুগটি ছিল রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুগ। এমনকি বাস্তবে চন্দ্রাভিযানের বহু আগেই তিনি তাঁর কল্পনায় চাঁদে টিনটিনের অভিযানের গল্প শুনিয়েছেন।

হার্জে টিনটিনের একটি পৃথক জগৎ সৃষ্টি করেছিলেন। এই জগৎ ছিল আমাদের বাস্তব জগতের একটি সরলীকৃত অথচ সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। আর এই প্রতিচ্ছবি অঙ্কণে হার্জেকে সাহায্য করেছিল তাঁর সুসংরক্ষিত ছবির একটি সংগ্রহ।

তরুণ টিনটিনের বয়স ১৪-১৯ বছর, গোল মুখমণ্ডল আর কপালের ওপর আঁচড়ে তোলা চুল তাকে সহজেই চিনিয়ে দেয়। টিনটিন তীক্ষ্ণবুদ্ধির অধিকারী, আত্মরক্ষা করতে সক্ষম এবং সৎ, ভদ্র ও সহানুভূতিশীল। সে তার তদন্তমূলক সাংবাদিকতা, দ্রুত চিন্তা ও ভালো স্বভাবের মাধ্যমে সবসময় রহস্য সমাধান করে থাকে।

কমিকসের অন্যান্য বর্ণিল চরিত্রের বিপরীতে টিনটিন নিরপেক্ষ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। ফলে কমিকসের পাঠক নিজেকে টিনটিন হিসেবে কল্পনা করে নিতে পারে। টিনটিনের স্রষ্টা ১৯৮৩ সালে মৃত্যুবরণ করলেও তার সৃষ্টি এখনও টিকে আছে এবং বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে জনপ্রিয় সাহিত্যিক চরিত্র হিসেবে। টিনটিনের অভিযান নিয়ে ২০১১ সালে স্টিভেন স্পিলবার্গ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। প্রথমদিকে বর্ণবৈষম্য, কমিউনিজম বিদ্বেষ বা এজাতীয় কারণে সমালোচিত হলেও টিনটিন তার ‘অসাধারণ প্রাণশক্তি’র জন্যে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়।

এমনকি অনেক গবেষক কেবল টিনটিন-চর্চায় তাদের কর্মজীবন ব্যয় করেছেন। ফরাসী জেনারেল চার্লস দ্য গল বলেছিলেন, তার ‘একমাত্র আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দী হলো টিনটিন’। টিনটিনের গল্পগুলি রহস্যের এক একটি ছকে-বাঁধা উপস্থাপনা। এই রহস্যের সমাধান করাও হয়েছে যুক্তিগ্রাহ্য পন্থায়। তবে তার সঙ্গে হার্জে মিশিয়ে দিয়েছেন তাঁর নিজস্ব কৌতুক রসবোধ।

টিনটিন সিরিজের বইগুলির তালিকায় একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।
১. সোভিয়েত দেশে টিনটিন (১৯২৯–১৯৩০)
২. কঙ্গোয় টিনটিন (১৯৩০–১৯৩১; ১৯৪৬, ১৯৭৫)
৩. আমেরিকায় টিনটিন (১৯৩১–১৯৩২; ১৯৪৫)
৪. ফারাওয়ের চুরুট (১৯৩২–১৯৩৪; ১৯৫৫)
৫. নীলকমল (১৯৩৪–১৯৩৫; ১৯৪৬)
৬. কানভাঙা মূর্তি (১৯৩৫–১৯৩৭; ১৯৪৩)
৭. কৃষ্ণদ্বীপের রহস্য (১৯৩৭–১৯৩৮; ১৯৪৩, ১৯৬৬)
৮. ওটোকারের রাজদণ্ড (১৯৩৮–১৯৩৯; ১৯৪৭)
৯. কাঁকড়া রহস্য (১৯৪০–১৯৪১; ১৯৪৩),
১০. আশ্চর্য উল্কা (১৯৪১; ১৯৪২)
১১. বোম্বেটে জাহাজ (১৯৪২–১৯৪৩)
১২. লাল বোম্বেটের গুপ্তধন (১৯৪৩–১৯৪৪)
১৩. মমির অভিশাপ (১৯৪৩–১৯৪৮)
১৪. সূর্যদেবের বন্দি (১৯৪৬–১৯৪৯)
১৫. কালো সোনার দেশে (১৯৪৮–১৯৫০; ১৯৭২)
১৬. চন্দ্রলোকে অভিযান (১৯৫০–১৯৫৩)
১৭. চাঁদে টিনটিন (১৯৫০–১৯৫৪)
১৮. ক্যালকুলাসের কাণ্ড (১৯৫৪–১৯৫৬)
১৯. লোহিত সাগরের হাঙর (১৯৫৮)
২০. তিব্বতে টিনটিন (১৯৬০)
২১. পান্না কোথায় (১৯৬৩)
২২. ফ্লাইট ৭১৪ (১৯৬৮)
২৩. বিপ্লবীদের দঙ্গলে (১৯৭৬)
২৪. আলফা কলা ও টিন‌টিন (১৯৮৬, ২০০৪, মরণোত্তর প্রকাশিত)

আলফা কলা ও টিন‌টিন (ফরাসি: Tintin et l’alph-art) দুঃসাহসী টিন‌টিন সিরিজের শেষ কমিক্স। ১৯৭৬ সালে বিপ্লবীদের দঙ্গলে বের হওয়ার পর আর কোন কমিক্স পুর্ণাঙ্গ আকারে বের হয় নি। এই কমিক্সের কাজ চলাকালীন ১৯৮৩ সালের ৩রা মার্চ ব্রাসেলসে হার্জে মারা যান। মাত্র ৪২ পাতার খসড়া ও প্রাথমিক স্কেচ থেকে এই কমিক্স তৈরি করা হয়। ১৯৮৬ সালে এটি প্রকাশ করা হয়। ১৯৯০ সালে এটি ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। বাংলায় এই কমিক্স প্রকাশ হয়নি।

বইয়ের জগত ছাড়িয়ে অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র জগতেও সাড়া জাগিয়েছে টিনটিন। ‘দি অ্যাডভেঞ্চারস অফ টিনটিন’। শিল্পী র্জজ রেমির কমিক বই সিরিজ অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি লিখেছেন স্টিভেন মোফ্যাট, এডগার রাইট ও জো কর্নিশ। প্রযোজনা করেছেন পিটার জ্যাকসন এবং পরিচালনা করেছেন স্টিভেন স্পিলবার্গ। সব মিলিয়ে এখনও সমান জনপ্রিয় টিনটিন ও তার কান্ডকারখানা।


মন্তব্য