kalerkantho


কলাপাড়ায় বেদেদের অপচিকিৎসা

শিঙা লাগাবি, শিঙা

জসীম পারভেজ, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)   

২০ মার্চ, ২০১৮ ০৯:৪১



শিঙা লাগাবি, শিঙা

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বেদে সম্প্রদায়ের নারীরা শিঙা টেনে মাথাব্যথা নিরাময়ের চিকিৎসা দিচ্ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘শিঙা টানি, মাজা টানি, কোমড় টানি, বাত ব্যথা টানি। শিঙা লাগাবি, শিঙা’—এভাবে হাঁকডাক দিয়ে সব ধরনের ব্যথা নিরাময়ের ধুয়া তুলে কলাপাড়া পৌর শহরের অলিগলিতে ঘুরে বেড়ায় বেদে সম্প্রদায়ের নারীরা। মানুষের শরীরের ব্যথা নিরাময় করার নামে ব্লেড দিয়ে চামড়া কেটে গবাদি পশুর শিং দিয়ে যুগ যুগ ধরে তারা ‘শিঙা টানা’ নামক এ অপচিকিৎসা প্রকাশ্যে চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে নানা কৌশলে বশ করে ছলচাতুরীর মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা, চাল-ডালসহ বিভিন্ন প্রকারের মাল।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ১৯ থেকে ৩০ বছর বয়সের তিন নারী কাঁধে কালো কাপড়ের বড় বড় ঝুলি নিয়ে পৌর শহরের বড় জামে মসজিদ চত্বর দিয়ে যাচ্ছে। তারা যাকে দেখছে তাকেই বলছে, ‘শিঙা লাগাবি, শিঙা? তোর সব ব্যথা চিরদিনের জন্য শেষ হয়ে যাবে। শিঙা লাগানোর পরপরই বাত ব্যথা চলে যাবে। না গেলে তুই যে শাস্তি দিবি আমি তা মেনে নেব। টাকাও ফিরে পাবি।’

তাদের কথায় মন গলে উপজেলার চাকামইয়া ইউনিয়নের মো. দুলালা ফকিরের। তাঁর মাথা ব্যথা চিরতরে নিরাময়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁকে মসজিদের দক্ষিণ পাশের একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। তিন বেদে নারী একসঙ্গে তাঁকে নানা কৌশলে পটিয়ে চলে। কথার ফাঁকে রেশমা বেগম নামের বেদে নারী ঝুলি থেকে একটি ব্লেড বের করে দুলাল ফকিরের মাথার দুই পাশের চামড়া চিড়ে। এরপর গবাদি পশুর একটি শিং বের করে এর সূচালো অংশ মুখে নিয়ে অপর অংশ রোগীর ক্ষততে লাগিয়ে চুষতে থাকে। ক্ষণে ক্ষণে শিংয়ের ভেতরে জমে যাওয়া কালো রঙের তরল পদার্থ দেখিয়ে বলে, ‘দেখছিস? তোর মাথা ব্যথা করবে না তো কার করবে? তোর মাথায় তো অনেক বিষ। আরো টাকা বাড়িয়ে দে সব বিষ নামিয়ে দেব।’

এ সময় আতঙ্কিত দুলাল ফকির বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। আমার কাছে পাঁচ শ টাকা আছে মাত্র। চাল-ডাল কেনার জন্য বাজারে যাচ্ছি। সব দিয়ে দেব। শুধু বিষ নামিয়ে দেন।’

তখন আরেক বেদে নারী বলে, ‘তোর মোবাইলটাও আমাকে দিয়ে দে। তুই জীবন অনেক ধনী হবি, তোকে সেই তদবিরের তাবিজও দেব।’

তিন বেদের শিঙা টানার দৃশ্য দূর থেকে দেখেন মো. হাসান হাওলাদার। পরে তিনি বলেন, ‘আমি বেদেদের শিঙা টানানোর গল্প শুনেছি। এবার স্বচোখে দেখলাম। তাদের বাটপারি আর ছলচাতুরী দেখে হতবাক হয়েছি।’

শিঙা টেনে ব্যথা নিরাময় বিষয়ে বেদে চিকিৎসক রেশমা বেগম বলেন, ‘বিশ্বাস না অইলে কি মানুষ এ চিকিৎসা নিত? মানুষ উপকার পায় তাই যুগ যুগ ধরে আমাদের চিকিৎসা নিচ্ছে।’

সেখানে উপস্থিত মাওলানা মো. নুরুজ্জামান বলেন, ‘এখন সবখানে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা চালু হয়েছে। কিন্তু এসব নারীরা ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে গরিব মানুষের চোখে ধুলা দিয়ে অপচিকিৎসা দিচ্ছে। এদের আইনের আওতায় আনা উচিত। তা না হলে সাধারণ মানুষ প্রতিদিন তাদের প্রতারণা শিকার হবে।’

শিঙা টানা চিকিৎসার বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা চিন্ময় হাওলাদার বলেন, ‘অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ব্লেড দিয়ে শরীরে ক্ষত তৈরি করে এ ধরনের অপচিকিৎসা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ক্ষত স্থানে যেকোনো সময় জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে। রক্তনালি কেটে গেলে অতিরিক্ত রক্তপাত ঘটতে পারে। তাই এদের অপচিকিৎসা বন্ধে সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত। চিকিৎসার নামে ধোঁকাবাজি বন্ধ করা দরকার। এলাকার শিক্ষিত ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে। পাশাপাশি বেদেদের সঠিক পথে ফিরিয়ে এনে তাদের বাস্তবিক জ্ঞান দিতে হবে। সর্বোপরি সবাই সচেতন হলেই শুধু বন্ধ হবে শিঙা টানা নামক এ অপচিকিৎসা।’


মন্তব্য