kalerkantho


কাজানে গোর্কির স্মৃতিশালায়

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৭ জুলাই, ২০১৮ ১১:০৪



কাজানে গোর্কির স্মৃতিশালায়

কাজান থেকে প্রতিনিধি : আলো-আঁধারির এক সিঁড়ি। সুড়ঙ্গের মতো নেমে যেতে হয় নিচে। সেখানে অবিকল এক বেকারির কারখানা। আটা-ময়দার মণ্ড দলা করে রাখা, ফুলে ওঠা রুটি, একদিকে চুল্লি। লোহার কিছু দণ্ডও দণ্ডায়মান। ওপরে জ্বলছে কেরোসিনের বাতি। অদ্ভুত এক ঘোর তৈরি হয় তাতে। যেন দেখা যায় ম্যাক্সিম গোর্কিকে; কাজানের এই কারখানায় কোরোসিনের আলোয় আর জীবনের অন্ধকারে কাজ করছেন বেকারি শ্রমিকের।

তখন তাঁর নাম আলেস্কেই পেশকভ। ১৮৬৮ সালে জন্ম নিঝনি নভগোরোদে। মাত্র চার বছর বয়সে বাবা মারা যায়; ১০ বছর বয়সে মা-ও। নানির কাছে মানুষ হচ্ছিলেন কষ্টেসৃষ্টে; সে কষ্ট থেকে মুক্তির জন্য বাড়ি ছেড়ে পালান ১২ বছর বয়সে। পড়ালেখাটা পেশকভ চালিয়ে যান তবু। ১৮৮৪ সালে ইম্পেরিয়াল কাজান ইউনিভার্সিটিতে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে চলে আসেন কাজানে। স্বপ্নপূরণ হয়নি। বেঁচে থাকার তাগিয়ে তাই নানা কাজ নিতে হয় তাঁকে। যেমনটা ১৮৮৬-৮৭ সালে বছরখানেকের মতো এই ১০, উলিৎসা গোরকোগোর এই বেকারিতে।

সে বেকারিই এখন জাদুঘর। ১৯৪০ সাল থেকে তা উন্মুক্ত দর্শনার্থীদের জন্য। কাল কাজানের শান্ত সকালে সেখানে গিয়ে দেখা মেলে গোর্কির নানা কাজের। তাঁর ছবি, অটোগ্রাফ, অনেক বইয়ের মূল কপি, ভাস্কর্য। এটি ছিল এএস ডেরেনকভের বেকারি; যিনি বিপ্লবীদের প্রতি সহানুভূতিশীল। কারখানা থেকে আয় দিতে দিতেন বিপ্লবী পার্টিতে। ১৬ বছরের পেশকভ এখানে এসে কাজ নেন বেকারি শ্রমিকের। আর নিজের নাম বদলে ‘গোর্কি’ ব্যবহার শুরু করতে করতে আরো চার-পাঁচ বছর। রুশ ভাষায় ‘গোর্কি’ শব্দের অর্থ ‘তেতো’। জীবনের তিক্ততার স্বাদ পেয়েছেন অল্প বয়সেই; সেই তিক্ত সত্য লেখার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার জন্যই ১৮৯২ সালে থেকে তাঁর ওই নামের আশ্রয়।

কাজানের এই জাদুঘরের বাইরেই গোর্কির আবক্ষ মূর্তি খোদাই করে রাখা। ভেতরে ঢুকতেই ইয়া বড় পোর্ট্রেট। পাশে তাঁর সই। ভেতরে আরো কত কিছু! তাঁর ব্যবহার করা নানা জিনিসপত্রও সযত্নে সংরক্ষিত। গোর্কির জীবনকালের নানা সময়ের ছবি; তাঁর পোশাক, কেরোসিনের বাতি, চায়ের কেতলি। এক পাশে চেয়ার-টেবিল বসানো কক্ষ, যেখানে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আসেন গোর্কিকে জানতে। আর নিচের তলায় সুরঙ্গে সোয়া শ বছর আগের সেই বেকারি।

নিজের আত্মজীবনী ‘মাই ইউনিভার্সিটিস’-এ গোর্কি লিখেছেন, ‘জীবন যত কঠিন হয়েছে, আমি নিজেকে তত শক্তিশালী ও চৌকস ভাবতে শিখেছি।’ আরেক জায়গায় কাজানের প্রসঙ্গে তাঁর উচ্ছ্বাস, ‘আমার জন্ম হয়তো নিঝনি নভগোরোদে; তবে স্পিরিচুিয়ারি জন্মটা কাজানে বলেই মনে করি। আমার সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড়।’ এতেই বোঝা যায়, শহরটি এই লেখকের মনে কী গভীর ছাপ ফেলেছিল!

কাজানে চার বছর ছিলেন গোর্কি, ১৮৮৪ থেকে ১৮৮৮ পর্যন্ত। তখনো তিনি লেখক হয়ে ওঠেননি। জীবনের কাছ থেকে রসদ সংগ্রহ করছিলেন কেবল। পরবর্তী সময়ে লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান; ওদিকে জার সম্রাটদের বিপক্ষে নেন ঘোষিত অবস্থান। এ জন্য বহুবার গ্রেপ্তার হন গোর্কি। একই সূত্রে বন্ধুত্ব তৈরি হয় রুশ বিপ্লবের অবিসংবাদিত নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের সঙ্গে।

তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস ‘মা’ লেখা যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময়। বলশেভিকদের পক্ষে ফান্ড রেইজিং ট্যুরে যান ১৯০৬ সালে। সেখানেই তা লেখা। বিপ্লবীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতায় গোর্কিকে নির্বাসনে পাঠানো হয় ইতালিতে। পরবর্তী সময়ে ১৯১৭ সালের সফল রুশ বিপ্লবের পর সোভিয়েত ইউনিয়নে শিল্পী-লেখকদের জন্য অনেক কিছু করেন গোর্কি। কিন্তু লেনিনের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাওয়ায় দেশে আর থাকেননি বেশি। জার্মানি এবং মূলত ইতালিতে কাটান অনেকটা সময়। ১৯৩২ সালে জোসেফ স্তালিন নিজে রাশিয়ায় ফিরিয়ে আনেন গোর্কিকে। ফ্যাসিস্ট মুসোলিনির দেশ থেকে বিখ্যাত এই লেখকের প্রত্যাবর্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য ছিল বিরাট এক প্রোগাগান্ডা জয়।

সেই গোর্কিতে আজও মনে রেখেছে রুশরা। প্রতিটি শহরেই রাস্তা, পার্ক, জাদুঘর—কিছু না কিছু আছেই তাঁর নামে। যেমন পা রয়েছে এই কাজানেও। সে জাদুঘরে গেলেই মনশ্চক্ষে দেখা মেলে বেকারি কারখানার আলো-আঁধারিতে কাজ করা শ্রমিক আলেস্কেই পেশকভের। ম্যাক্সিম গোর্কির! 



মন্তব্য