kalerkantho


সত্যিই

শ্যাতো ‘দ্য লেডিজ’

তাহমিনা সানি   

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শ্যাতো ‘দ্য লেডিজ’

ফ্রান্সের ছোট্ট একটি গ্রাম চেনানসু। প্রকৃতি যেন তার সবটুকু রূপের পসরা সাজিয়ে বসেছে এখানে। তবে গ্রামে বেড়াতে আসা পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে ধবধবে সাদা বিশাল এক শ্যাতো বা প্রাসাদতুল্য অট্টালিকা। শ্যাতো দু চেনানসু। শ্যাতোটির একটা অংশ স্থাপিত হয়েছে শের নদীর ওপর।

শ্যাতো দ্য চেনানসুর আরেকটি নাম আছে—‘দ্য লেডিজ’। প্রায় চার শতাব্দী ধরে এ অট্টালিকার মালিকানা বেশ কয়েকজন নারীর হাতে ছিল। ১৬ শতাব্দীতে থমাস বোইয়ে নির্মাণ করেন এটি। জায়গাটা কেনার পর এখানকার পুরনো প্রাসাদের অবকাঠামো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে বিশাল আকারের শ্যাতোটি গড়ার উদ্যোগ নেন তিনি। কিছুদিন পরে বোইয়ে মারা গেলে তাঁর স্ত্রী ক্যাথরিন ব্রিসুনের তত্ত্বাবধানে এটি তৈরি হতে থাকে। কিন্তু রাজা প্রথম ফ্রান্সিস পরে শ্যাতোটির মালিকানা নিয়ে নেন। পরবর্তী সময় ফ্রান্সিস মারা গেলে তাঁর ছেলে দ্বিতীয় হেনরি মালিক হন শ্যাতোটির। হেনরি তখন এটি তাঁর উপপত্নী জিয়ান দু পোচিকে উপহার দেন। জিয়ান ছিলেন রুচিশীল মহিলা। তিনি শ্যাতোর চেহারাই বদলে ফেলেন। বাগান, নদীর ধারে ব্রিজের ব্যবস্থা, এমনি অনেক কিছু করেন। কিন্তু হেনরি খুন হলে হেনরির প্রথম স্ত্রী ক্যাথরিন দু মেদিচি জিয়ানকে শ্যাতো থেকে বের করে এর দখল নেন।

ক্যাথরিনও ক্ষমতা নেওয়ার পর শ্যাতো দে চেনানসুর পুনর্নির্মাণ এবং সম্প্রসারণের জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এর মধ্যে ছিল জিয়ানের নির্মিত ব্রিজের ওপর দোতলা গ্যালারি নির্মাণ। ১৫৮৯ সালে ক্যাথরিনের মৃত্যু হলে তাঁর পুত্রবধূ লুই দু লোহেন ভডামন্ট এই শ্যাতোর দায়িত্ব নেন। তিনি রাজা তৃতীয় হেনরির স্ত্রী। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে রাজা তৃতীয় হেনরিও খুন হন। বিধবা লোহেন এতে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এর ছাপ পড়ে চেনানসুতেও। তিনি শোবার ঘর পুরোপুরি কালো রঙে ঢেকে দেন এবং সব কিছুতে শোকের আবহ ফুটিয়ে তোলেন। নিজেও সব সময় শোকের পোশাক পরে থাকতেন। পরে উত্তরাধিকারজনিত নানা জটিলতায় শ্যাতোটি বেশ কয়েকবার হাতবদল হয়। কিন্তু কোনো মালিকই এর শ্রী বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখেননি।

আঠারো শতকের মাঝামাঝির দিকে শ্যাতোটির মালিকানা এক ধনী ব্যক্তি ক্লদ দু দুপিনের কাছে চলে যায়। তাঁর স্ত্রী লুই দুপিন বেশ মেধাবী ছিলেন। শ্যাতোটিকে বেশ আকর্ষণীয় রূপ দেন তিনি। এর মধ্যে ছিল সাহিত্যের বৈঠকখানার মতো নান্দনিক সব জিনিস। কিন্তু একসময় ফরাসি বিপ্লব ঘনিয়ে আসে। বিদ্রোহীরা অট্টালিকাটি ধ্বংস করে দিতে চায়। আর এটা টের পেয়ে লুই দুপিন বুদ্ধি খাটান। বিপ্লবীদের বোঝান, শের নদীর ওপর যে ব্রিজটি প্রাসাদের সঙ্গে সংযুক্ত, সেটি বেশ কয়েক মাইল পথ কমিয়ে এনেছে। এই প্রাসাদ ও ব্রিজটি ধ্বংস করলে বরং তাদেরই ক্ষতি। এভাবেই এ মহীয়সী নারী শ্যাতোটি বাঁচালেন। মালিক হিসেবে শেষ যে নারী তাঁর পদচিহ্ন রেখে যান এই শ্যাতোতে, তিনি মার্গারিট পুলুজ। ধনীর দুলালী মার্গারিট ১৮৬৪ সালে এটি কেনেন। অট্টালিকাটির সৌন্দর্য বর্ধনে বেশ মনোযোগ দিলেও অত্যধিক বিলাসী জীবনযাপনের কারণে শেষ পর্যন্ত এর মালিকানা ধরে রাখতে পারলেন না তিনি। বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। বর্তমানে এই শ্যাতোটির মালিক হেনরি পরিবার। ১৯১৩ সাল থেকে এটি তাঁদেরই মালিকানায় আছে।


মন্তব্য