kalerkantho


চেতনাদীপ্ত মার্চে ঐক্যের শপথ

ড. হারুন রশীদ

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



চেতনাদীপ্ত মার্চে ঐক্যের শপথ

মার্চ বাঙালির জীবনে এক অনন্য মাস। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় মার্চের প্রতিটি দিনই অত্যন্ত ঘটনাবহুল ও তাৎপর্যময়। রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠন মাসজুড়েই নানা কর্মসূচি পালন করে। তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চে পাকিস্তানি জান্তারা সার্চলাইট অপারেশন চালিয়ে নির্বিচারে বাঙালি নিধন, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া, গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা, সর্বোপরি মুক্তিকামী জনতা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের জন্য আনুষ্ঠানিক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে এই মার্চ থেকেই।

৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণেই বঙ্গবন্ধু যার হাতে যা আছে, তা-ই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বললেন। ‘আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি’ বলে তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানালেন। এই দুর্গ গড়ে তোলার অর্থ যে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা তা বুঝতে কারো বাকি রইল না। শত্রুর মোকাবেলা করার দৃপ্ত আহ্বানও ভেসে উঠল তাঁর বজ্রকণ্ঠে। প্রয়োজনে খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়ার কথাও বললেন তিনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে যে ম্যান্ডেট তিনি পেয়েছিলেন বস্তুত সেই ম্যান্ডেটই তাঁকে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল।

এভাবেই ঘনিয়ে আসে ২৫ মার্চের কালরাত্রি। পাকিস্তানি জান্তারা ভারী অস্ত্র, কামান নিয়ে অপারেশন সার্চলাইটের নামে এ দেশের ছাত্র-জনতাসহ নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্মম হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। তারা রাজারবাগ পুলিশ লাইনসেও হামলা চালায়। সেই রাতেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ২৬ মার্চ প্রত্যুষে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সেই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে গর্জে ওঠে গোটা জাতি। যার হাতে যা আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে যায় এ দেশের মুক্তিপাগল মানুষ। শুরু হয় ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রাম। অতঃপর এক সাগর রক্তের বিনিময়ে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা লাভ। অবসান হয় ২৩ বছরের বৈষম্য আর বঞ্চনার। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে জায়গা করে নেয়।

দেখতে দেখতে স্বাধীনতার ৪৬ বছর পার করল বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শেখ হাসিনার সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে শেষ বছর পার করছে। সে হিসাবে এ বছর নির্বাচনের বছর। বাংলাদেশ নানাভাবে এগিয়ে গেছে। কিছুদিন পরই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উদ্বোধন করা হবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুগেও এখন দেশ। এ ছাড়া মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমেছে। যোগাযোগব্যবস্থায়ও এসেছে উন্নয়ন। উড়াল সেতু দৃশ্যমান এক উন্নয়ন বাস্তবতা। মেট্রো রেল, বাস র্যাপিড ট্রানজিটের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায়ও দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে আমরা প্রবেশ করেছি ফোরজির যুগে।

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করছে বাংলাদেশ। স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। এরই মধ্যে পিলারের ওপর স্প্যান বসে গেছে। পদ্মা সেতু থেকে বিশ্বব্যাংকের ঋণ প্রত্যাহার এবং নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করার ঘোষণা ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় সংকল্প নেতৃত্বের সাহসের প্রতীক। দেশাত্মবোধেরও জাগরণ হয় পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে।  শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে বর্তমান সরকার। প্রতিবছর জানুয়ারির প্রথম দিন প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দিয়ে পাঠ্যপুস্তক দিবস পালন করা হচ্ছে। এ বছরও ১ জানুয়ারি পাঠ্যপুস্তক দিবস পালন করা হয়।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে গেলেও রাজনৈতিক অনৈক্য, সংঘাত, সহিংসতা, সন্দেহ, অবিশ্বাস এক প্রধান সমস্যা হিসেবেই এখানে রয়ে গেছে। রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন দেশের রাজনীতিতে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির সহাবস্থান সম্ভব নয় বলেই এই সংকট দূর হচ্ছে না—এমনটিই বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এ ছাড়া জঙ্গিবাদও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে বারবার। ঘটছে ব্লগার হত্যা, হুমকি আসছে প্রগতিশীল চিন্তার মানুষদের ওপর। এসব সমস্যা উজিয়ে একটি আদর্শিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমাদের পৌঁছতেই হবে। তবেই স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে, ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার যে লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ, সেটি অর্জন করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকটের মূলে আছে নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে আস্থাহীনতা। সেটা জাতীয় নির্বাচনই হোক, আর স্থানীয় নির্বাচনই হোক। নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে, কিংবা কার অধীনে হবে—এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছতে পারছে না। এ অবস্থায় মনে রাখতে হবে, যখন সংকটের মূলে নির্বাচনব্যবস্থা তখন নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

মার্চ মাসেই বাঙালি তার চেতনাকে নতুন করে শাণিত করে। নতুন শপথে বলীয়ান হয়। অত্যাচার, নিপীড়ন আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্মারক মাস হিসেবে মার্চ প্রতিবারই আমাদের নতুন করে পথ দেখায়। তাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সব দেশপ্রেমিক দলকে চেতনাদীপ্ত মার্চে নতুন করে শপথ নিতে হবে। সব অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। তবে তা করতে হবে রাজনৈতিক সংহতি ও ঐক্য বজায় রেখেই।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

harun_press@yahoo.com


মন্তব্য