kalerkantho


প্রাইভেট প্র্যাকটিস : চিকিৎসক বনাম শিক্ষক

মো. শফিকুল ইসলাম ভূঞা   

৯ জুলাই, ২০১৭ ১৪:৪৮



প্রাইভেট প্র্যাকটিস : চিকিৎসক বনাম শিক্ষক

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী উপন্যাসের উদ্বৃতি দিয়ে শুরু করতে চাই। "গ্রামের প্রসন্ন গুরুমহাশয় বাড়িতে একখানা মুদির দোকান করিতেন। এবং দোকানেরই পাশে তাঁহার পাঠশালা ছিল। বেত ছাড়া পাঠশালায় শিক্ষাদানের বিশেষ উপকরণ বাহুল্য ছিলনা। তবে এই বেতের উপর অভিভাবকদেরও বিশ্বাস গুরুমহাশয়ের অপেক্ষা কিছু কম নয়। তাই তাঁহারা গুরুমহাশয়কেও বলিয়া দিয়াছিলেন, ছেলেদের শুধু পা খোঁড়া এবং চোখ কানা না হয়, এইটুকু মাত্র নজর রাখিয়া তিনি যত ইচ্ছা বেত চালাইতে পারেন। গুরুমহাশয়ও তাঁহার শিক্ষাদানের উপযুক্ত ক্ষমতা ও উপকরণের অভাব একমাত্র বেতের সাহায্যে পূরণ করিবার চেষ্টায় এরূপ বেপরোয়াভাবে বেত চালাইয়া থাকেন যে ছাত্রগণ পা খোঁড়া ও চক্ষু কানা হওয়ার দুর্ঘটনা হইতে কোনোরূপে প্রাণে বাঁচিয়া যায় মাত্র। "

প্রসন্ন গুরুমহাশয়ের পেশা ছিল ব্যবসায় (দোকানদারি) আর ব্রত শিক্ষকতা। ব্রতচারীগণ নিজের অর্জিত জ্ঞান অন্যদের মাঝে বিতরণ করেন পূণ্য লাভের আশায়। প্রসন্ন গুরুমহাশয়কে সে সময়ের ব্রতচারী শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধি বলা যেতে পারে বৈকি।

বছর তিরিশেক আগে পাড়ায় মক্তব দেখেছিলাম।

সন্ধ্যার পর বসত। ছেলে বুড়ো সবাই আসত। সবাই মিলে চাঁদা তুলে তিন-চারটা কুপি বাতির কেরোসিনের টাকা জোগাড় করত। হুজুর সাহেব কোনো সম্মানি গ্রহণ করতেন না। নিজের জমিতে কাজ করে সংসার চালাতেন আর পূণ্য লাভের আশায় সন্ধ্যার মক্তবে পড়াতেন।

এখন একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশক চলছে। আজও বিভিন্ন সভা সমাবেশে অনেকেই বলে থাকেন- শিক্ষকতা কোনো পেশা নয়, এটি ব্রত। শিক্ষকগণ মানবসেবা করছেন পূণ্য লাভের আশায়। তাই তারা যে সম্মানি কিংবা সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন তাই যথেষ্ট!

শিক্ষকদের জাতি গঠনের কারিগর, জাতির বিবেক এসব অভিধায় অভিহিত করা হয়ে থাকে। জাতি গঠনের এইসব নিরলস কারিগর সমাজের মর্যাদাবান মানুষও। শিক্ষকতাকে তাঁরা পেশা হিসাবে নিয়েছেন। সামাজিক জীব হিসাবে সমাজের অন্য দশজনের মতোই শিক্ষকদেরও অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মতো চাহিদাগুলো রয়েছে। শিক্ষকতার মহান পেশায় জড়িত হয়েছেন বলে তিনি কখনোই এসবের ঊর্ধ্বে নন।

তাঁদের পরিবার থাকবে না, সমাজ থাকবে না, বাবা-মায়ের ভরণপোষণ করা লাগবে না, কোনো উৎসব পালন করা লাগবে না, এই দৃষ্টিভঙ্গির আশু পরিবর্তন না হলে শিক্ষকদের দুর্দশা যেমন কমবে না, তেমনি শিক্ষায় প্রত্যাশিত সাফল্যও আসবে না।

যেকোনো বিবেচনায় শিক্ষকতা একটি পেশা। অন্যান্য পেশাজীবীর মতো শিক্ষকগণও পেশাজীবী। চিকিৎসকের চিকিৎসাসেবা যদি পেশা হতে পারে তবে শিক্ষকের শিক্ষাসেবাও পেশা। একজন চিকিৎসক হাসপাতালে নির্দিষ্ট সময় দায়িত্ব পালন শেষে প্রাইভেট প্রাকটিস করতে পারলে শিক্ষক কেন পারবেন না? ডাক্তারের প্রাইভেট চেম্বারে আসা কোনো রোগীর স্বজনকে হাসপাতালে না গিয়ে চেম্বারে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলে যে উত্তর পাওয়া যাবে ঠিক একই উত্তর মিলবে কোচিং সেন্টারে যাওয়া কোনো শিক্ষার্থীর অভিভাবককে একই প্রশ্ন করা হলে। এসব বিবেচনায় না নিয়ে শিক্ষকের প্রাইভেট প্রাকটিস বন্ধে করা আইনের যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

দেশে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা শিক্ষালয় ও চিকিৎসালয়গুলো জনসংখ্যা অনুপাতে পর্যাপ্ত নয়। ফলে দুটো যায়গার কোনোটিতেই মানসম্মত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না যা ব্যক্তি পর্যায়ে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করছে।

স্কুলে ফলপ্রসূ পাঠদানের উপযুক্ত অবকাঠামো, অনুকূল পরিবেশ, বিষয়ভিত্তিক যোগ্য শিক্ষক, উন্নতমানের পাঠ্যপুস্তক, ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতের প্রত্যাশিত হার এসব নিশ্চিত করা যায়নি বলে শিক্ষার্থীরা কোচিং-মুখী হচ্ছে। এ ছাড়া মাথাপিছু আয় বাড়ায় সব পরিবারে শিক্ষাসচেতনতা এবং শিক্ষায় বিনিয়োগ দুটোই বেড়েছে। সন্তানের ভালো ফলাফল নিশ্চিত করতে অভিভাবকগণ কারণে অকারণে কোচিং-মুখী হচ্ছেন। নামিদামি শিক্ষকের পেছনে লাইন দিচ্ছেন, শিক্ষক ভাড়া করছেন।

শিক্ষকদের প্রাইভেট প্রাকটিস বন্ধে আইন করবার আগে দেখতে হবে এটি কার প্রয়োজনে হচ্ছে। যাদের সন্তান কোচিং করে তাদের সাথে কথা বলতে হবে, শিক্ষকদের সাথে কথা বলতে হবে। অলিতে গলিতে গজিয়ে ওঠা লাখ লাখ কোচিং সেন্টার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়াও একতরফাভাবে আইন দিয়ে শিক্ষকদের প্রাইভেট প্রাকটিস বন্ধের চেষ্টায় পেশাজীবী হিসাবে শিক্ষকদের সাথে কোনো বৈষম্য করা হচ্ছে কি না তাও বিবেচনার দাবি রাখে।

লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, ঢাকা ক্যান্ট গার্লস পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ


মন্তব্য