kalerkantho


অপরাধটা দেশে হলে একশ ভাগ ব্যবস্থা নিতাম...

রহমান শেলি   

২০ জুলাই, ২০১৭ ১৭:২২



অপরাধটা দেশে হলে একশ ভাগ ব্যবস্থা নিতাম...

কোথা থেকে শুরু করব বুঝতে পারছি না। গতকাল রাত প্রায় বারটা। অফিস শেষ করে বাসায় আসব। এয়ারপোর্ট ক্যানপি-১ এর কাছে আসতেই একজন নারীকে দেখলাম- নিথর দাঁড়িয়ে আছেন। ভাঙ্গাচোরা এক শরীর কাঠামোর বিমূর্ত রূপ যেন। আমি দাঁড়ালাম। একনজর দেখলাম।  

হাতে পাসপোর্ট ধরা। তার হাতের তালু পোড়া, আঙ্গুলগুলো ঝলসে যাওয়া। কোনোমতে আলতো করে ধরে রেখেছেন পাসপোর্টটি। চেহারার দিকে তাকালাম।

বুকের ভেতরটা জ্বালা করে উঠলো। নির্যাতনের চরম চিত্র! কপাল কাটা, বোঝা যাচ্ছে রড দিয়ে পেটানোর চিহ্ন এসব। চোখ দুটির চারপাশ কালো হয়ে আছে। সব মিলিয়ে মুখমণ্ডলের দিকে তাকানো যায় না। নির্যাতনের ভয়াবহ ছাপচিত্র যেন!

মাথার অর্ধেকটা ঘোমটায় ঢাকা। চুলগুলো কাটা মনে হলো- চুরি করলে অনেক দেশে-এলাকায় চুল কেটে দেওয়া হয় বলে জানি। আবার কেউ কেউ এমনিতেই করেন গৃহকর্মী বা দুর্বলদের ওপর নির্যাতন চালানোর সময়।  

বললাম, চুল কাটা কেন? 

আমার প্রশ্নে ঘোমটা নামালেন, মুখ দিয়ে কিছু একটা বললেন। কিন্তু আমি বুঝলাম না।  

না বুঝলেও তার মাথায় থাকা কাটাছেঁড়া-পোড়া দাগের দিকে আবার দেখলাম। চুল কেটে ফেলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় মাইরের দাগ। এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে নির্যাতনের চিহ্ন নেই! অনেক কিছুই বলছে এইসব চিহ্ন।

তাকে এড়িয়ে বাসায় যাবার জন্য গাড়িতে উঠলাম। কিন্তু ভাবনায় রয়ে গেলেন নির্যাতিত ওই নারী। কল্পনা করলাম, তার পুরো শরীর আর মনের ওপর নির্যাতন কী পরিমাণ হয়েছে! মনটা কেমন যেন হয়ে গেল। হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলাম- ড্রাইভার, গাড়ি থামাও! 

ফেরত আসি ক্যানোপি এলাকায়। বুঝতে পারছি না, কী করব! 

এই অপরাধের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ কি হবে? অপরাধটা দেশে হলে এখনই এর বিরুদ্ধে একশ ভাগ ব্যবস্থা নিতাম। কিন্তু, উনি তো নির্যাতীত হয়ে এসেছেন বিদেশ থেকে- মরুর দেশ থেকে!

ওনাকে অফিসে নিয়ে এসে চা বিস্কুট দিতে বললাম। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল তার। কোথায় যাবেন, কেউ আসবেন কিনা তাকে নিতে- কিছুই বলতে পারছেন না! চোখ দিয়ে শুধু পানি গড়িয়ে পড়ছে!

এই হলো আমাদের মায়ের জাত, নির্যাতন সহ্য করতে করতে জীবন দিবেন, তবুও মুখ খুলবেন না! 

ওখানে কি আইন নেই? আইনে এর বিচার হয় না! খালি শুনি চুরি করলে নাকি হাত বা আঙুল কেটে দেয়, কঠিন শাস্তি দেয়। আরও গুরুতর অপরাধে নাকি প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড দেয়, শিরশ্ছেদ করে! 

ওইসব দেশে আইন কি শুধু আমাদের অপরাধের জন্য বা যারা তাদের বিরোধী তাদের জন্য, নাকি  নিজেদের প্রথম শ্রেণির মুসলমান যারা দাবী করেন তাদেরও ওইসব আইনে বিচার হওয়া উচিৎ?

শুনেছি মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক দেশের শাসক-নাগরিকদের দৃষ্টিতে আমরা নাকি তৃতীয় শ্রেণির মুসলমান! এখানকার মানুষ ধর্মীয় দৃষ্টিতে তুলনামূলক সহনশীল আর উদার হলেও সিল-ছাপ্পরটা মারা হয় অন্যরকম। এর বিপরীতে তাদের অনেক অপকর্ম আর অনাচার দুনিয়া জুড়ে ছি-ছি’র কারণ হলেও তারা নাকি নাম্বার ওয়ান!

এই প্রসঙ্গে আমার দুই একটি প্রশ্ন আছে। পাঠকরা কি তার উত্তর দেবেন? কাউকে আঘাৎ দেবার জন্য নয়। আমার এই লেখার কারণ না বুঝে কেউ মন্তব্য করবেন না- অনুরোধ থাকল। অবশ্যই ব্যক্তি খারাপ হয়, দেশ বা ধর্ম নয়- এটা আমিও স্বীকার করি)?

আমার প্রশ্নগুলো হচ্ছে-
১. আমরা বলে থাকি- মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই। মুসলমান-মুসলমান ভাই-ভাই হলে সৌদি আরব কি আমাদের নাগরিকত্ব দেয় (যেখানে ননমুসলিম দেশগুলো মুসলিমদের নাগরিকত্ব দিচ্ছে)?

২. অঢেল বিত্ত-বৈভবের মালিক আরব অভিজাত-ক্ষমতাসীনরা ইউরোপে প্রমোদবালা সঙ্গে নিয়ে সি বিচ ভাড়া করে দিনের পর দিন সেসব স্থানে মৌজ-মাস্তি করেন- সেগুলো সংবাদ শিরোনামও হয়। তখন তাদের কি ইসলাম মাথায় থাকে না?

৩. মুসলমানের আবার প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণি কি?

এই মায়ের কাছে আমি ক্ষমা প্রাথী। আমরা এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোনো আইন প্রয়োগ করতে পারলাম না। (আপাততে আমার কাছে এই মূহুর্তে এর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের কায়দা-কৌশল জানা নেই। কারো কাছে থাকলে জানাবেন। ) ভাবছি মিনিস্ট্রির মাধ্যমে নক করবো।

আমরা তার স্বামীর ফোন নম্বর সংগ্রহ করে তাকে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছি।

মা, আমাদের ক্ষমা করো! ভগিনী আমাদের ক্ষমা করো! কারণ, আমরা তৃতীয় বিশ্বের মানুষ। যাদেরকে ‘নমানুষ’ বলা যায়!

(পাসপোর্টে তার ছবি আছে। তাতে দেখলাম ‘গৃহকর্মীর চাকরি’ নিয়ে  যাবার সময় খুবই সুস্থ ছিলেন তিনি, আর দুই বছর পর ফিরে আসার পরে বিমানবন্দরে তোলা ছবিতে তার এখনকার চিত্র দেখুন)

লেখক: অ্যাডিশনাল এসপি, এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন

 


মন্তব্য