kalerkantho


তারিক সালমানরা আছে বলেই বাংলাদেশ নিশ্চিন্ত

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২১ জুলাই, ২০১৭ ১৫:২০



তারিক সালমানরা আছে বলেই বাংলাদেশ নিশ্চিন্ত

এই সেই ছবি, শিশুর হাতে আঁকা বঙ্গবন্ধু

তারিক সালমান- নামটা যখনই মনে কিংবা চোখে পড়ছে, তখনই মনে পড়ছে ছোট্ট অদ্রিতার আঁকা বঙ্গবন্ধুর অবিশ্বাসও সুন্দর ছবিটির কথা। বারবারই মনে পড়ছে, ভীষণ মনে পড়ছে।

ঘুমানোর জন্য চোখ বন্ধ করলেও কেন জানি মনটা ছটফট করছে। মনে হচ্ছে এখনই বরিশালে গিয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ুয়া শিশুশিল্পী অদ্রিতা করের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে আসি 'মা...অনেক বড় হও', আর তারিক সালমানকে ভীষণ ইচ্ছে করছে একটি স্যালুট দিতে।

আমার আজকের লেখার বিষয়টি পাঠকরা হয়তো এরই মধ্যে বুঝে গেছেন। তবুও লেখার প্রয়োজনে বরগুনা সদর উপজেলার ইউএনও তারিক সালমান এবং সম্প্রতি তার সাথে ঘটে যাওয়া অলৌকিক ঘটনার বিবরণ তুলে ধরছি।

গেল বুধবার সন্ধ্যায় ফেসবুকে হঠাৎ চোখে পড়লো অসাধারণ সেই ছবি দুটি। হাতের বামের ছবিটি পতাকার মাঝে বঙ্গবন্ধু এবং ডানের ছবিটি ছিল হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণের।

কোমলমতি শিশুর আঁকা পতাকার মাঝে বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ ছবিটি নাকি বিকৃত! আর ছবি বিকৃতির কারণে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক কাওয়া নেতা ইউএনও তারিক সালমানের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছেন। এই মামলার কারণে তারিক সালমানকে কারাগারেও যেতে হয়েছে (অবশ্য তিনি এখন জামিনে রয়েছেন)। ছবি দুটির ক্যাপশনে এমন লেখা পড়ে মনটাই খারাপ হয়ে গেল।

 

এরপর আমি অনেকবার ছবিটি দেখেছি, বারবার দেখেছি। এই লেখাটি শুরুর আগেও দেখেছি, বড় করে দেখেছি।  আমার চোখে বিকৃতি তো ধরাই পড়েনি, বরং আমি মুগ্ধ হয়েছি। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ুয়া একটি শিশু বঙ্গবন্ধুকে মনের মধ্যে শুধু লালনই করেনি বরং তা রং-তুলিতে ফুটিয়ে তুলেছে। শিশুটি মনোযোগ এতটাই ছিল যে, বঙ্গবন্ধুর বামগালের তিলটিও সে ভুলে যায়নি।  

তারিক সালমান মূলত বরিশাল সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা থাকাকালীন চলতি বছর ১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবসে শিশুদের নিয়ে একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। তিনি ওই আয়োজনে অংশ নেওয়া শিশুদের কথা দিয়েছিলেন যে, যার ছবি সবচেয়ে ভালো হবে তার ছবি দিয়ে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের আমন্ত্রপত্র ছাপানো হবে (নিঃসন্দেহে ক্রিয়েটিভ আইডিয়া)। তারিক সালমান তার দেয়া কথামতো ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র ওই প্রতিযোগিতায় প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করা শিশু দুটির আঁকা ছবি দিয়ে ছাপিয়েছেন।

চমৎকার আয়োজন। এভাবেই তো আগামী প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ছড়িয়ে দিতে হবে। তবে এমন সৃজনশীল আয়োজন ভালো লাগেনি বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ওবায়েদুল্লাহ সাজুর। বঙ্গবন্ধুর ওই অসাধারণ ছবিটি দেখে তিনি শুধু মর্মাহতই হননি, বরং সেই সাথে তার হৃদয় কেঁপে উঠেছে। আর এ কারণেই তিনি মানহানির মামলা ঠুকে দিয়েছেন। আমাকে অবাক করেছে যে, আয়োজনটি ২৬শে মার্চকে ঘিরে হলেও অ্যাডভোকেট সাজুর মানহানি হয়েছে আয়োজনের আড়াই মাস পর জুনে!  আর এ কারণে তিনি মানহানির অভিযোগ এনে গেল ৭ জুন আগৈলঝাড়ার তৎকালীন ইউএনও গাজী তারিক সালমানের বিরুদ্ধে ৫ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। আহারে! একেই বলে দরদ। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ভাষায় বলতে হয়, এগুলোই হলো কাওয়া আওয়ামী লীগ।

এই কাওয়া আওয়ামী লীগরা ৭৫-এর পর কোথায় ছিল? ৭৫ এর ১৫ই আগস্টের পর বঙ্গবন্ধুর নাম নেয়ার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়াই ছিল বিরল। আর এ কারণেই ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে, তখন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারের পর হাজার হাজার মানুষ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। মূলত এর পর থেকেই আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ছড়িয়ে দেয়ার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করে। এরই অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে নানা আয়োজনের মধ্যে ১৭ই মার্চ জাতীয় শিশু দিবস ঘোষণা করা হয় এবং ওই দিন শিশুদের নিয়ে দেশব্যাপি রাষ্ট্রীয় আদেশেই বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি শিশুরা যেন বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে সহজে জানতে পারে সেজন্য শ্রেণীকক্ষের পাঠে বঙ্গবন্ধুর জীবনী যুক্ত করা হয়েছে। টেলিভিশনগুলোতে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনুষ্ঠান প্রচার করা হচ্ছে।  

সমস্ত জাতি যখন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ছড়িয়ে দেয়ায় মনোযোগী, ঠিক তখন বরিশালে ঘটল উল্টো ঘটনা। বঙ্গবন্ধুর ছবি পেছনের পাতায় দিয়ে কার্ড বানানোর অপরাধে আয়োজক প্রধান তারিক সালমানকে হাজতবাসী হতে হয়েছে। এমন ঘটনায় আমি রীতিমতো বিব্রত ও স্তম্ভিত হয়েছি। আচ্ছা, ভবিষ্যতে আর কোন শিশু বঙ্গবন্ধুর ছবি আঁকবে তো!

আমি অবাক হয়েছি আরো একটি কারণে। এই তো সেদিনের কথা। চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এম এ লতিফ নিজের শরীরে বঙ্গবন্ধুর মুখ বসিয়ে পোষ্টার বানিয়ে রাস্তার মোড়ে মোড়ে টাঙিয়ে দিয়েছিলেন। যে কিনা প্রকৃতই বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করেছিল। কই তাকে তো কারাগারে যেতে হয়নি, দল থেকেও বহিষ্কার হননি তিনি। বরং এম এ লতিফ এখনো বহাল তবিয়তে রাজনীতি করে যাচ্ছেন। অথচ শিশুদের মাঝে বঙ্গবন্ধুকে ছড়িয়ে দেয়ার কারণে তারিক সালমানকে জেলে পর্যন্ত যেতে হলো। জাতি এই লজ্জা রাখবে কোথায়!

আমি স্পষ্ট অক্ষরে বলতে চাই, যারা আগামী প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধুকে ছড়িয়ে দিতে বাধা সৃষ্টি করছে, বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে শিশুদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে আগামীতে আমাদের জন্য আলো নয়, অন্ধকারই অপেক্ষা করছে।

শেষ কথা, বঙ্গবন্ধু তো নির্দিষ্ট কোনো দলের কিংবা গোষ্ঠীর নয়। বঙ্গবন্ধু সবার। তাই আজও তারিক সালমানদের মতো যারা নিরবে বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে তার আদর্শ ছড়িয়ে দেয়ার কাজ করে যাচ্ছেন, তারা যদি হয়রানির শিকার হন, তাহলে অবশ্যই রাষ্ট্রকে তাদের পাশে থাকতে হবে। কারণ এই তারিক সালমানরা আছেন বলেই আমরা এখনো নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি। ওনাদের মতো মানুষ যদি না থাকতো, তাহলে বঙ্গবন্ধুর অনেক কিছুই '৭৫-এর পর খুঁজে পাওয়া যেত না।  আর তারিক সালমান আপনাকে বলছি, ভাই ভালো কাজে বাধা তো আসবেই। যারা কখনো ভালো কাজ করেনি তারা এর মর্ম বুঝবে না। তাই বাধা পেলেও থেমে যাবেন না, প্লিজ। আমরা আপনার পাশে আছি, আছে সবাই।

লেখক : জুবায়ের আল মাহমুদ
সাংবাদিক : নিউজ টোয়েন্টিফোর টেলিভিশন
 


মন্তব্য