kalerkantho


জনগণের ভোগান্তি কমাতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করুন

ওমর শরীফ পল্লব   

২২ জুলাই, ২০১৭ ১৭:১০



জনগণের ভোগান্তি কমাতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করুন

কয়েকদিন আগেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন নিরাপত্তার নামে তাকে জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন করা না হয়। যদিও নিরাপত্তার খাতিরে প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের গাড়িবহরের জন্য বাড়তি ব্যবস্থা নিতেই হয়।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) সদস্যদের প্রতি বলেন, ‘এসএসএফের সদস্যরা যাঁরা আমাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত তাঁদের এটুকুই বলব, আমাদের মানুষ নিয়েই কাজ। সেই মানুষ থেকে যেন আমরা বিচ্ছিন্ন না হয়ে যাই, সেই দিকটায় একটু ভালোভাবে দৃষ্টি দিতে হবে। ’

কিন্তু বাস্তবে কি প্রধানমন্ত্রীর কথা মান্য করা হচ্ছে? প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর কোনো অনুষ্ঠানে বা সভা-সমাবেশে গেলে সেজন্য আগেই রাস্তা বন্ধ করতে হয়। আর এজন্য রাস্তায় চলাচলকারী সাধারণ যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ঢাকার মতো জ্যামের শহরের ট্রাফিক পরিস্থিতি এ কারণে আরও মারাত্মক হয়ে ওঠে। কোথাও কোথাও দিনভর এ কারণে প্রচণ্ড জ্যামের কারণে জনসাধারণের ভোগান্তি হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিজ্ঞতা
ঢাকায় নিয়মিত যাতায়াতকারীদের মধ্যে অনেকেই ভিভিআইপিদের চলাচলের কারণে রাস্তায় আটকে থাকার দুর্বিষহ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। বিশেষ করে গরমের সময় এ সমস্যায় জনগণের প্রচণ্ড কষ্ট হয়। রাস্তায় অনাকাঙ্ক্ষিত দেরি হওয়ায় বহু মানুষ জরুরি মিটিং ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে ব্যর্থ হয়।

শুধু রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রীই নয়, রোড ক্লিয়ার রাখার নামে দেশি-বিদেশি ভিভিআইপির চলাচলের আগে, চলাচলের সময় ও চলাচলের বেশ কয়েক মিনিট পর্যন্ত রাস্তার উভয় দিকের যান চলাচল বন্ধ রাখার ফলে দীর্ঘ সময় ধরে চলাচলে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়।
রাতে যদি ভিভিআইপি গাড়ি চলাচল করে তাহলে আশপাশের গাড়িগুলোকে বন্ধ করার পাশাপাশি সেগুলোর লাইটও বন্ধ করতে বলা হয়। এতে ভিভিআইপি ব্যক্তিটি বুঝতেও পারেন না যে, তার যাতায়াতের জন্য কত গাড়িকে নিশ্চল অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। বহু স্থানে ফুট ওভারব্রিজগুলো ও রাস্তা পারাপার বন্ধ করে দেওয়া হয় বেশ কিছুক্ষণের জন্য। এ সময় সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনকে পেছন ফিরে দাঁড়াতেও বলা হয় কোনো কোনো স্থানে।

বিদেশি ক্রিকেট দল, এমনকি বিদেশি মন্ত্রীরা আসার সময়ও রোড ক্লিয়ার করতে গিয়ে হাজার হাজার যানবাহনকে কোনো জায়গায় ঠায় দাঁড় করে দরাখা হয়। চীনের প্রেসিডেন্ট  যখন ঢাকায় এসেছিলেন, তখন এয়ারপোর্ট রোড দিনভর একপ্রকার বন্ধই ছিল। সাধারণ মানুষের ভোগান্তির সীমা ছিল না।

ঢাকা শহরে রাস্তার সংখ্যা সীমিত ও গাড়ির পরিমাণ ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় একটি রাস্তা কিছুক্ষণ বন্ধ থাকলেই তার রেশ পড়ে অন্য রাস্তাগুলোতে। ফলে একটি রাস্তা কিছুক্ষণ বন্ধ থাকা মানে শুধু সেই রাস্তা নয় বরং দিনভর সম্পূর্ণ এলাকায় প্রচণ্ড যানজট। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নারী ও শিশুদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। হাসপাতালের রোগী ও অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখার ফলে বহু রোগীর প্রাণসংশয়ের আশঙ্কাও থাকে।

হেলিকপ্টার খুব ব্যয়বহুল কি?
আর্থিক দিক দিয়ে বিষয়টিকে দেশের জন্য ব্যয়বহুল বলে মনে করবেন অনেকেই। কিন্তু কয়েকটি পরিসংখ্যান জেনে নিলে তা পরিষ্কার হবে। ভিভিআইপি গাড়িবহরে প্রায় অর্ধশত গাড়ি থাকে। পদ্মা সেতুর মূল কাজ উদ্বোধন করে সড়কপথে ফেরার সময় প্রধানমন্ত্রী গাড়িবহর নিয়ে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার অতিক্রম করেছিলেন। সে সময় তিনি ৫২টি গাড়ি নিয়ে টোল দিয়ে ফ্লাইওভার অতিক্রম করে প্রশংসিত হয়েছিলেন। তবে ভিভিআইপি চলাচলের বেশ কিছুক্ষণ আগে থেকেই সে রাস্তায় আই-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বহু গাড়ি টহল দিতে থাকে। এ সময় রাস্তার সব গাড়ি সরিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি কোনো নষ্ট গাড়ি থাকলে তা রেকার ব্যবহার করে টেনে নেওয়া হয়। সেজন্য আগেই সে রাস্তায় রেকার পাঠানো হয়।
ভিভিআইপি গাড়িবহরের অর্ধশত গাড়ির তেল খরচ মোটেই কম নয়। এছাড়া প্রতিটি গাড়িতে মোতায়েন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও অন্যান্য কর্মীদের বেতন-ভাতা, ওভারটাইম, খাওয়ার খরচ ইত্যাদির পেছনে ব্যয়ও কম নয়। হেলিকপ্টার ব্যবহার করলে এ বাড়তি ব্যয় থেকেও রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী ও র‌্যাব বর্তমানে হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে। বেশ কিছু হেলিকপ্টার শুধু সামরিক প্রশিক্ষণের কাজেই ব্যবহৃত হয়। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স অনুযায়ী বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে মোট ৬১টি হেলিকপ্টার রয়েছে। এসব হেলিকপ্টার সামরিক কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি ভিভিআইপি ব্যবহারের জন্য কয়েকটি হেলিকপ্টার আলাদা করে রাখা মোটেই অসম্ভব নয়।

বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হেলিকপ্টার ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে হেলিকপ্টার ভাড়া নিতে ঘণ্টাপ্রতি ৫০ হাজার থেকে সোয়া লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়।

হেলিকপ্টার ওঠানামার ব্যবস্থা আছে কি?
হেলিকপ্টার ওঠানামার জন্য প্রয়োজনীয় হেলিপ্যাড সব স্থানে রয়েছে কি না, এটি অনেকেরই প্রশ্ন থাকতে পারে। যদিও প্রধানমন্ত্রী যেসব স্থানে যাতায়াত করেন, তার অধিকাংশ স্থানেই হেলিপ্যাড রয়েছে। বিগত কিছুদিনের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সফরসূচি দেখলে বোঝা যাবে তাঁরা বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসে যেসব স্থানে যাতায়াত করেন তার মধ্যে রয়েছে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার, বুদ্ধিজীবী শহীদ মিনার, সচিবালয়, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, বঙ্গভবন, বসুন্ধরা কনভেনশন সিটি, ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও বিভিন্ন হাসপাতালে। এর মধ্যে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, বসুন্ধরা কনভেনশন সিটি, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিজস্ব হেলিপ্যাড বা হেলিকপ্টার ওঠানামার যথেষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। ঢাকার অ্যাপোলো ও স্কয়ার হাসপাতালের ছাদে হেলিপ্যাড থাকায় এসব হাসপাতালে যেতে হেলিকপ্টার ব্যবহার সুবিধাজনক। শহীদ মিনার কমপ্লেক্সে হেলিপ্যাড না থাকলেও সে স্থান সংলগ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের বিশাল মাঠ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম এলাকা কিংবা বঙ্গভবনের মাঠে হেলিকপ্টার ওঠানামার ব্যবস্থা করা সম্ভব। সেখান থেকে সচিবালয়ের দূরত্বও বেশি নয়। (ছবিতে দেখুন স্কয়ার হাসপাতাল, জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও বসুন্ধরা কনভেনশন সিটি সংলগ্ন হেলিপ্যাড)

হেলিকপ্টার ভোগান্তি কমাবে
দেশি-বিদেশি ভিভিআইপিদের চলাচলের জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হলে শুধু অধিকতর নিরাপত্তার ব্যবস্থাই হবে না, এতে সময়ও সাশ্রয় হবে। এছাড়া এতে বিশাল মোটরকেডের প্রয়োজন হবে না। রাস্তায় চলাচলকারী যাত্রীসাধারণেরও ভোগান্তি কমবে।
বর্তমানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্তারা সময় সাশ্রয়ের জন্য নগরীর আশপাশে তাঁদের ফ্যাক্টরি ও প্রকল্প এলাকায় যেতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করেন। জনগণের ভোগান্তি দূর করতে এ পদাঙ্ক ভিভিআইপিদেরও অনুসরণ করা উচিত।


মন্তব্য