kalerkantho


আইয়ামে জাহেলিয়াত ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৫ আগস্ট, ২০১৭ ১৪:০৮



আইয়ামে জাহেলিয়াত ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

শিরোনামেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে লেখার মূল বিষয়বস্তু। পেশাগত কারণে প্রায় সবসময়ই খবরের সাথে থাকতে হয়। লেখা-লেখি করার মতো অনেক বিষয় চোখের সামনে ভেসে উঠলেও সময়-সুযোগ কম থাকায় যথাসময়ে যথাটি কমই করতে পারি। তবুও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা অন্যদের মতো আমাকেও নাড়া দিয়েছে। বুকের ভেতরটা কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে। প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে এটা কি আদৌ আমার বাংলাদেশ! নাকি অন্য কোন দেশের ভিন্ন কোন জায়গায় আমরা বসবাস করছি!

সম্প্রতি দেশজুড়ে ধর্ষণের যে মহোৎসব চলছে তা আমার কাছে আইয়ামে জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগের মতোই মনে হচ্ছে। ভদ্র পল্লীর ঈশ্বররা যতটা না নিজেদের সভ্য জাতি হিসেবে প্রমাণ করতে চাচ্ছে, ততই আমরা অসভ্য জাতিতে পরিণত হয়ে যাচ্ছি।  

শিরোনামের স্বার্থকতা ধরে রাখতে লেখার শুরুতে অন্ধকার যুগ বা আইয়ামে জাহেলিয়াতের সময়ের কিছু চিত্র উল্লেখ করবো। এরপর ধর্ষণের কিছু পরিসংখ্যান এবং সবশেষ বিশ্লেষণের চেষ্টা করবো, কেন আমাদের সমাজ দিন দিন অন্ধকারের দিকেই ধাবিত হচ্ছে? 

২০০২, আমি তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। একদিন  ইসলাম শিক্ষার পাঠদানের একফাঁকে আমাদের প্রিয় মাওলানা শিক্ষক আব্দুল কুদ্দুস স্যার আইয়ামে জাহেলিয়াতের বর্বরতার গল্প শুনিয়েছিলেন।

পুরো গল্পটি মনে না থাকলেও এটুকু মনে আছে যে, আইয়ামে জাহেলিয়াতের সময় কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো। সে সময় ছিনতাই, রাহাজানি ছিল নিত্য দিনের ঘটনা। তবে জীবন্ত মানুষ (কন্যা সন্তান) কবর দেয়ার কথাটি শোনার সাথে সাথে আমার গায়ের প্রতিটি লোম দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। চোখ বন্ধ করে ভাবলে এখনো কপাল কুঁচকে যায়। মানুষ এমন নিষ্ঠুর কাজ কী করে করেছিল! তবে সে সময় হাজারো অন্যায়, অত্যাচার হলেও ধর্ষণের মতো নিকৃষ্ট অন্যায় হতো না। পুস্তকের পাতায় অন্ধকার যুগের ওই সময়ের বর্ণনাগুলোর মধ্যে ধর্ষণ শব্দটি আছে বলে আমার জানা নেই। তবে আমার জানার পরিধি কমও হতে পারে। এ কারণে লেখাটি শুরুর আগে আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদের কাছে আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে ধর্ষণ হতো কিনা জানতে চেয়েছিলাম। মিস্টার আজাদ আমাকে বলেছেন, 'আমি যতগুলো রেকর্ড পড়েছি তার কোন জায়াগায় ধর্ষণের কথা উল্লেখ আছে বলে আমার মনে পড়ে না। তবে সেসময় রাহাজানি এবং ছিনতাই বেশি হতো। কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়াটাই ছিল ওই সময়ের সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ। ’ 

সেসময় কন্যা সন্তানকে বাবা-মা কিভাবে আগলে রাখতেন এটিও মিস্টার আজাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম। এ বিষয়ে তার বক্তব্য, ‘ওই সময় গর্ভবতী মায়েদের বাবারা লুকিয়ে রাখতেন। শেষ পর্যন্ত যদি কন্যা সন্তান হয়েও যেত, তবে সন্তানসহ ওই মা-বাবা অজানা গহিনে চলে যেতেন। যদি লুকিয়ে রাখতে না পারতেন তাহলে নদীতে ভাসিয়ে দেয়ার ইতিহাসও রয়েছে। আর নিজের জীবনের বিনিময়ে কন্যা সন্তানের জীবন ভিক্ষার ইতিহাস তো অগণিত। ’ 

অন্ধকার যুগ কতটা বর্বর ছিল তা ওপরের আলোচনায় নিশ্চয় কিছুটা অন্তত ফুটে উঠেছে। পাঠক চলুন এবার সে সময়ের সাথে বর্তমান সময়ের কিছুটা তুলনার চেষ্টা করি। আইয়ামে জাহেলিয়াতের সময় কন্যা সন্তাকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো। অন্যদিকে নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও মা-বাবারা সন্তানকে আগলে রাখতেন। এখনো অবশ্য অধিকাংশ বাবা-মা’ই নিজের জীবনের চেয়ে সন্তানকেই বেশি ভালোবাসেন। কিন্তু সে সময় নিজের কন্যা সন্তানকে বাবা-মা জীবন্ত কবর না দিলেও বর্তমান সময়ে বাবা-মায়ের হাতে সন্তান খুনের মতো ঘটনাও আমরা লক্ষ্য করছি।  

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ি, গেল বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ৬৪টি শিশু খুন হয়েছে বাবা অথবা মায়ের হাতে। চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ৩ হাজার ৫৮৯টি শিশু সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৬৮৬টি শিশুই শিকার হয়েছে যৌন নির্যাতনের।  

চলতি বছরের শুরুতে ১১ জানুয়ারি রাজধানীর দিয়াবাড়ীতে মায়ের হাতে শিশু খুনের প্রথম ঘটনা ঘটে। এরপর ২৮ মার্চ গাজীপুরের কাপাসিয়ার দিগদা গ্রামে তিনমাসের শিশু খুনের অভিযোগ উঠেছিল মায়ের বিরুদ্ধেই। খবরের পাতার তথ্য বলছে, ২০১৪ ও ১৫ সালেও অন্তত ১৫টি শিশু খুন হয় বাবা মায়ের হাতে।  আইয়ামে জাহেলিয়াতের সময় কি এমন হতো?

এতো গেল হত্যার ঘটনা। শিশু ধর্ষণের মতো ঘটনাও এদেশে হরহামেশাই ঘটছে। এ তালিকায় সবচেয়ে নিকবর্তী উদাহরণ গেল ৩১ জুলাই। এদিন রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় তিন বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।  এর আগে ওই একই এলাকায় ১০ জুন  আট বছরের একটি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়।  আমাদের চোখের সামনে এমন নিকৃষ্ট ঘটনার তালিকা দিন দিন দীর্ঘ হলেও অভিযুক্তদের শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে এমন ইতিহাস মনে করতে ডায়েরির পাতা খুঁজতে হয়। বিচারহীনতার আরও একটি উদাহরণ এখানে উল্লেখ করতেই হচ্ছে। ১৯৯৮ সালে তানিয়া নামের ৬ বছরের একটি শিশু ধর্ষণের পর খুন হলে দেশব্যাপি ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। কিন্তু ঘটনার দেড় যুগ পার হলেও রাষ্ট্র তানিয়া হত্যার বিচার আজও করতে পারেনি।  

ধর্ষণের সুষ্ঠু বিচার না হওয়ার অন্যতম কারণ সুষ্ঠু ডাক্তারি প্রতিবেদন। এখানে আমি আমার নিজস্ব কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরবো। সম্প্রতি যে কয়টি ধর্ষণের ঘটনা দেশব্যাপী আলোচিত হয়েছে তার মধ্যে বনানীর রেইন-ট্রি হোটেলে শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনা অন্যতম। কিন্তু ঘটনার ১ মাস পর ডাক্তারি পরীক্ষা করায় ধর্ষণের শিকার ওই শিক্ষার্থীর শরীরে ধর্ষণের কোন আলামতই খুঁজে পাননি ডাক্তাররা (অবশ্য ধর্ষণের ১৭ ঘণ্টার মধ্যে ডাক্তারি পরীক্ষা না করলে আলামত খুঁজে পাওয়া দুরুহ হয়ে যায়)। আচ্ছা ঠিক আছে, বিশ্বাস করলাম যে ১ মাস পর ডাক্তারি পরীক্ষা করা হয়েছে এ কারণে কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। জোরপূর্বক যৌনমিলনই সম্ভবত ধর্ষণের সহজ সংজ্ঞা। কাজেই কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হলে নিশ্চয় তার শরীরে ক্ষত তৈরি হবে এবং অনেক দিন ধরে ধর্ষিতা নারীর ব্যবহৃত কাপড়ে আলামত থাকে। অথচ ওই ডাক্তারি পরীক্ষায় এমন কোনো কিছুর স্পষ্ট উল্লেখ নেই।  

এখানে আমার কিছু কথা আছে। আচ্ছা মনে পড়ে চিত্র নায়িকা নাজনিন আক্তার হ্যাপির কথা? বনানীর শিক্ষার্থীর শরীরে ১ মাসের ব্যবধানে ডাক্তাররা আলামত খুঁজে না পেলেও হ্যাপিকে ৬ মাস পর পরীক্ষা করে ডাক্তাররা ১২ জনের যৌন আলামত খুঁজে পেয়েছিল। যদিও ওই প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করার কথা ছিল শুধুমাত্র ক্রিকেটার রুবেল হোসেনের কোনো আলামত আছে কি না।  ডাক্তারের ওই প্রতিবেদন সমাজের কাছে হ্যাপিকে প্রমাণ করেছে অন্য প্রকৃতির। কিন্তু রুবেল কোন প্রকৃতির তা পরীক্ষা করা হয়নি। অর্থাৎ রুবেল ওই ৬ মাসের মধ্যে কতটা সৎ পথে থেকেছিল তা জানা যেত, যদি তাকেও ডাক্তারি পরীক্ষা করা হতো। হ্যাপির ওই প্রতিবেদনটির কারণেই ক্রিকেটার রুবেল হোসেন আমাদের কাছে আজও ধোয়া তুলশি পাতার মতোই পবিত্র।  

রাষ্ট্রের কাছে বিচার না পেয়ে আত্মহত্যার মতো ঘটনাও আমরা দেখেছি। গাজিপুরের শ্রীপুরের নিঃসন্তান দম্পতি হযরত আলী ও হালিমা বেগম। এই দম্পতির পালিত মেয়ে ১০ বছরের আয়েশা আক্তারও সমাজের কিছু কীটের কাছ থেকে রক্ষা পায়নি। যে মেয়েকে গেল আট বছরে একদিনের জন্য কাছ ছাড়া করেননি, সুরক্ষা দিতে না পেরে গেল ২৯ এপ্রিল সেই মেয়েকে নিয়েই ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন হযরত আলী। খবরটি গণমাধ্যমে আসার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি আটক হলেও বিচার শেষ হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।

ওপরের উদাহরণগুলোর পর হলফ করেই বলা যায় যে, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই সম্প্রতি বগুড়া, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, গাইবান্ধা, নরসিংদীসহ দেশজুড়ে ধর্ষণের মহোৎব শুরু হয়েছে।  চাচার কাছে ভাতিজি নির্যাতন কিংবা শিক্ষকের দ্বারা ছাত্রী নির্যাতনের ইতিহাস নাই বা উল্লেখ করলাম।  

শেষ করার আগে শিউরে ওঠার মতো একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। গেল মে মাসে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার একটি গ্রামে মা-মেয়ে একসাথে ধর্ষণের শিকার হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তি ধর্ষণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ভাইরাল করে দিয়েছিল। আচ্ছা  আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে কি মা-মে এক সাথে ধর্ষণের শিকার হতো?  

ধর্ষণের খবর কানে এলে এক শ্রেণীর মানুষ নারীদের শালীনতার কথা বলেন। তাদের ভাষায় বোরখা পরে পর্দা করে চললে নারীরা ধর্ষণের শিকার হবে না। আমার কাছে এগুলো কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ছাড়া কিছুই নয়।  আচ্ছা বোরখা যদি নারীদের ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচায় তাহলে ৩ বছরের শিশু ধর্ষণ হলো কেন? ৮ বছরের আয়েশা ধর্ষণ হলো কেন? ১২ বছরের তানিয়া ধর্ষণ হলো কেন? 

আসলে এক শ্রেণীর কুরুচিপূর্ণ পুরুষের বিকৃত মানসিকতার কারণেই সমাজে অন্ধকার নেমে এসেছে। আমাদের প্রিয় রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তিন প্রকারের মানুষ রয়েছে যাদের চোখ জাহান্নামের আগুন দেখবে না। এক. যারা আল্লাহর রাস্তায় পাহারা দেয়। দুই. যারা আল্লাহর ভয়ে কাঁদে এবং তিন. যারা শরীরের মাহরাম নারীকে দেখে চোখ নিচু করে। ’(আত-তারগীব-৪৭১৩)। সুতরাং এখানে রাসূল (সা.) সরাসরি পুরুষের নজর সংযত করার নির্দেষ দিয়েছেন। তাহলে অবশ্যই নারীরা বোরখা না অন্য কিছু পরিধান করবে তা ভাবার আগে প্রত্যেক পুরুষের উচিত নিজের চোখ (নজর) সংযত রাখা।  

শেষ কথা, আসলে ধর্ষণ রোগব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। এর বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি রাষ্ট্রকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে প্রতিটি ধর্ষণ মামলা দ্রুত বিচার আইনে ৯০ দিনের মধ্যে কার্যকরের উদ্যোগ নিতে হবে। আর মামলার রায়ে যদি কোন ব্যক্তির ফাঁসি হয়, তাহলে ওই ফাঁসি জনসম্মুখে কার্যকরের উদ্যোগ ধর্ষণকে দ্রুত নিরুৎসাহিত করবে বলে আমি মনে করি। জানি না, লেখাটি যখন লিখছি কিংবা আপনারা যখন পড়ছেন, তখন কোনো মা-বোন কিংবা ছোট্ট শিশু ধর্ষিত হচ্ছে কি না!

লেখক : জুবায়ের আল মাহমুদ
সাংবাদিক, নিউজ টোয়েন্টিফোর টেলিভিশন


মন্তব্য