kalerkantho


ওজোন স্তরের সুরক্ষায় নিজেরাই উদ্যোগী হই

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৩:১২



ওজোন স্তরের সুরক্ষায় নিজেরাই উদ্যোগী হই

সূর্য জলন্ত গ্যাসের এক বিশাল অগ্নিগোলক। এর দূরত্ব পৃথিবী থেকে কমবেশি ১৪.১৬ কোটি কিলোমিটার বা ১ নভো একক হলেও, এর তাপমাত্রা এতটাই বেশি যে আমাদেরকে মাঝে মাঝে অস্বাভাবিক যন্ত্রণায় ফেলে দেয়।

পৃথিবী পৃষ্ঠে সূর্যের তাপমাত্রা কমবেশি ১৫ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও এর কেন্দ্রের তাপমাত্রা কল্পণাতীত।  কোনো কোনো বিজ্ঞানীর মতে সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রা কমবেশি ১ লাখ ১৫ হাজার সেলসিয়াসেরও বেশি। তবে কেন্দ্রে এর তাপমাত্রা অত্যাধিক বেশি হলেও সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে একটি বিশেষ স্তর রাখায় আমরা সূর্যের কেন্দ্রের ভয়াবহ তাপমাত্রা থেকে রক্ষা পেয়েছি। মূলত ওজোন স্তর নামক এই বিশেষ স্তরটি সূর্যের ১ লাখ ডিগ্রি তাপমাত্রাকে ছেঁকে পৃথিবীর বর্তমান তাপমাত্রায় (১৫ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পরিণত করেছে।  

লেখার এ পর্যায়ে ওজোন স্তর সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করবো। আর শেষাংশে এর সুরক্ষায় নেওয়া একটি ব্যতিক্রমী পদক্ষেপের বর্ণনা দেব।  

আসলে ওজোন স্তরের উপকারিতা বলে শেষ করা যাবে না। বিশেষ এই স্তর যদি না থাকতো তবে পৃথিবীর সব কিছুই মাত্রাতিরিক্ত তাপে বহু আগেই গলে যেত। মানুষসহ সব ধরণের প্রাণীকূলের বসবাস হয়ে পড়ত অসম্ভব।

ভূ-পৃষ্ঠের উপরিভাগের ২০ কিলোমিটার থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত এই বিশেষ স্তরটি বিস্তৃত। ওজোন স্তর হলো তীব্র গন্ধযুক্ত হালকা নীল বর্ণের গ্যাসীয় পদার্থ। এই অস্থায়ী গ্যাসের সামগ্রিক স্ট্রটোস্ফিয়ারকেই মূলত ওজোন স্তর বলা হয়। যা তাপমাত্রা কমানোর পাশাপাশি সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি আটকে রেখে পৃথিবীর জীবজগতকে রক্ষা করে।  

কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় এই স্তরটি মানুষ নিজেই আজ ধ্বংস করে ফেলছে। প্রযুক্তি ও শিল্প উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অসচেতন কর্মকাণ্ডের ফলে ওজোন স্তর আজ হুমকির মুখে। অধিক হারে গাছপালা নিধন, কালো ধোঁয়ার উৎপাদন বৃদ্ধিসহ নানা কারণে পৃথিবীতে অক্সিজেনের মাত্রা কমতে শুরু করেছে। আর অধিকহারে বাড়ছে ক্ষতিকর গ্যাস ক্লরো-ফ্লুরো-কার্বন বা সিএফসি। ক্ষতিকারক এই গ্যাস বায়ুমণ্ডলে নিঃসরণের কারণে ওজন স্তর ক্রমাগত ক্ষয়ে যাচ্ছে।  

বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য দায়ী সিএফসি গ্যাসের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পৃথিবীব্যাপি দেখা দেয় অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, দুর্যোগ ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে সামনের সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ।  

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে হিমালয় পর্বত ও অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের বরফ গলতে শুরু করেছে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইন্ডিয়ান ইনিস্টিটিউট অফ টেকনোলজি সেন্টার ফর অ্যাটমোস্ফেরিক সায়েন্স বিভাগ বলছে, ভারতীয় উপমহাদেশে আশঙ্কাজনক হারে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে গেছে। পাশাপাশি শুকনো মৌসুমে নদ-নদীতে পানি না থাকায় সমুদ্র পৃষ্ঠের লোনা পানি স্থলভাগের কাছাকাছি চলে আসছে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় অনাবাদি হয়ে পড়ছে ফসলি জমি। যা খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।  

আবার অতিরিক্ত খরায় ভুগর্ভস্থ পানির স্তর ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় দেশের উত্তরাঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার শঙ্কায়।  

জাতিসংঘের আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্যানেলের (আইপিসিসি) তথ্যমতে, আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে বাংলাদেশের অন্তত ১৭ শতাংশ ভূমি সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাবে।  

এ ছাড়া দ্য সায়েন্টিফিক কমিটি অন অ্যান্টার্কটিক রিসার্চ (এসসিএআইআর) জানিয়েছে, যে হারে অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলছে তাতে আগামী ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৫ ফুট পর্যন্ত বাড়তে পারে।

এ কারণে বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে তথা ওজোন স্তর রক্ষায় কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতেই হবে। এ কারণে ওজোন স্তরের সুরক্ষায় ১৯৯৪ সালের ১৬ই ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে 'ওজন দিবস' পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৯৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘ওজোন দিবস’ পালিত হয়।  

দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সভা-সেমিনারের মাধ্যমে পালন করলেও এ বছর নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার সেন্ট যোশেফস স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের আয়োজন ছিল ভিন্ন। ওজোন স্তর সুরক্ষায় অক্সিজেন উৎপাদনের দিক মাথায় রেখে তারা বৃক্ষরোপণ উৎসবের আয়োজন করেছিল। ওই প্রতিষ্ঠানের আড়াই হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী নিজেদের এক দিনের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে প্রত্যেকে ১টি করে গাছের চারা রোপণ করেছে। আর শিক্ষার্থীদের গাছের চারা বিতরণে সহযোগিতা করেছেন ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ফাদার লাজারুস রোজারিও। ‘আলোর মিছিল’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বেশ কয়েকমাস আগে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার তৎকালীন নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত ফারজানার সহযোগিতায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় ‘একদিনের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে বৃক্ষরোপণ’ বিষয়ক সেমিনার আয়োজন করেছিল। এই উৎসবে শিক্ষার্থীদের জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করতে আমি নিজেও অংশ নিয়েছিলাম। ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের রোপণ করা গাছ বাতাসে নির্গত সিএফসি গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধিতে যে দারুণভাবে বাধা প্রদাণ করবে তা অবশ্যই বলা যায়।  

শুধু বড়াইগ্রামই নয়, রাজশাহীর চারঘাট ও বাঘা এবং পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার শিক্ষার্থীরাও পর্যায়ক্রমে অংশ নিয়েছে ওজোন স্তর সুরক্ষার এই আন্দোলনে নাটোরের বড়াইগ্রামের মতো সেখানকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও আমি অংশ নিয়েছিলাম বৃক্ষরোপণ উৎসবে। নিজেদের টিফিনের টাকায় কেনা গাছের চারা শিক্ষার্থীরা নিজেদের বাড়িতে রোপণ করার ফলে এসব চারা মারা যাওয়ার হারও অনেক কম। এমনই আন্দোলন যদি পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে খুব সহজেই আগামীর পৃথিবীকে বাসযোগ্য করা যেত।

জুবায়ের আল মাহমুদ
সাংবাদিক, নিউজ টোয়েন্টিফোর টেলিভিশন


মন্তব্য