kalerkantho


সিরিয়ান শিশুরা নিধনযজ্ঞের শিকার

ফেরদৌস কাশিদা   

২৫ অক্টোবর, ২০১৭ ১৬:৪৩



সিরিয়ান শিশুরা নিধনযজ্ঞের শিকার

ছবি ইন্টারনেট থেকে

আলেপ্পো! জনবসতির সংখ্যা বিবেচনায় সিরিয়ার বৃহত্তম একটি শহর। আজ তা মানবিক বিপর্যয়ের অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।

আলেপ্পোর বেশকিছু অঞ্চলে সাংঘাতিক হত্যাযজ্ঞ ও বৃষ্টি পড়ার মতো বিমান থেকে বোমা নিক্ষেপে রাস্তাঘাট নষ্ট হয়ে গেছে এবং ঘরবাড়ির সম্মুখভাগ খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেছে। নান্দনিক এ শহরটি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সিরিয়াবাসীর জন্য শুধু ক্ষতি, বিনাশ ও মৃত্যুই যেন অবশিষ্ট রয়েছে। এক্ষেত্রে শিশুরাই বেশি আক্রান্ত।  

চলমান যুদ্ধ আলেপ্পো নগরীতে জীবনের সব রূপ নাশ করে দিয়েছে। শিশুহত্যা সেখানে প্রাত্যহিক বোমা ও গোলা বর্ষণের নিশ্চিত ফল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ শিশুদের কোনো অপরাধ নেই। একমাত্র এ কথা যে, তারা সিরিয়ায় বসবাস করে। তাদের দেশে তারাই যুদ্ধের বলি হচ্ছে।

দুর্যোগপূর্ণ কঠিন পরিস্থিতি ও পরিবেশে বাস করতে তারা বাধ্য হচ্ছে। প্রতিনিয়ত তারা হত্যা, সংঘাত, আক্রমণ, বোমাবর্ষণ ও দুর্ভোগের মুখোমুখি হচ্ছে। বস্তুত আলেপ্পো ও সিরিয়ার অন্য শহরগুলো শিশুদের কবরস্থানের রূপ ধারণ করেছে। এ মানবিক ট্র্যাজেডির দায়ভার কে নেবে? এর দায়ীইবা কে? কতদিন সিরিয়ার শিশুদের রক্ত ঝরবে, প্রাণ হারাবে এবং ফরিয়াদ করতে থাকবে; আর কেউ তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপও করবে না? বিশ্ববিবেক কখন জাগবে? 

নিঃসন্দেহে সংঘাতের ফলে সিরিয়ায় মানবতা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। শিশুরা নানারকম বিপদের হুমকিতে রয়েছে; যেমন হত্যা, সৈন্য সমাবেশ, পড়ালেখা থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং রোগব্যাধি। তাছাড়া যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব এবং পরিবার-পরিজনের বিয়োগের ফলে তারা মানসিক চাপেও ভুগছে। জাতিসংঘের এক রিপোর্ট মতে, সিরিয়ার সংকট শুরু হওয়া থেকে আজ অবধি ১০ হাজার শিশু নিহত হয়েছে। সেভাবে ইউনিসেফ শিশুদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় সিরিয়াকে গণ্য করেছে আলেপ্পোয় চলমান যুদ্ধপরিস্থিতি এবং নিত্যনৈমিত্তিক বোমাবর্ষণের কারণে। আজ সিরিয়া দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়ের শিকার। এখন পর্যন্ত আলেপ্পোর শিশুরা নিরাপত্তা ফিরে পাচ্ছে না। সহিংসতা, মৃত্যু ও ক্ষুধা তাদের চতুর্দিক থেকে বেষ্টন করে ফেলেছে।  

বিভিন্ন রিপোর্ট ও প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আলেপ্পো এবং সিরিয়ার অপরাপর শহরগুলোয় চলমান সহিংস যুদ্ধ হাজার হাজার শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। যারা প্রাণে বেঁচে আছে, তাদের শৈশব কেড়ে নিয়েছে এবং তারা বেঁচে আছে দরিদ্রতা, মূর্খতা ও বঞ্চনার ঝুঁকি নিয়ে। বিশেষ করে তাদের অনেকেই পিতৃমাতৃহীন এবং জীবন-সম্পদ হারানোর স্বাদ আস্বাদন করেছে। এসব তাদের কাজ করে উপার্জন করতে, শিশু বয়সেই নিজের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে এবং কখনও পরিবারের ভরণপোষণ করতে বাধ্য করেছে। এ নিপীড়িত শিশুরা তাদের শৈশব সম্পর্কে কিছুই জানে না, চেনে না। খেলাধুলা অনুপস্থিত; কিন্তু গোলাবারুদ ও পারমাণবিক বোমার গর্জন, যা তাদের শিশুহৃদয়ে ভীতি ও আতঙ্ক ছড়ায়, তা সক্রিয়ভাবে উপস্থিত। কত বিরাট কষ্টে তারা দিনাতিপাত করছে। বাস্তবে কী ঘটে যাচ্ছে, তা বোঝার শক্তিও তাদের নেই। শুধু চোখ দিয়ে দেখে যাচ্ছে ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন, শিশু-যুবক-বৃদ্ধকে ধ্বংসাবশেষের ভেতর থেকে জীবিত বের করার দৃশ্য। তারা না ঘুমাতে পারছে, না বিদ্যালয়ে যেতে পারছে। মা-বাবার সঙ্গে মাটির নিচে শরণার্থী শিবিরে বন্দিজীবন কাটাচ্ছে মৃত্যু কিংবা আক্রমণে আহত হওয়ার প্রহর গুনে গুনে।  

এ হচ্ছে আলেপ্পোর শিশুদের অবস্থা। প্রতিটি মুহূর্তে যেন তারা মৃত্যুর মূল্য পরিশোধ করে যাচ্ছে। তাদের এখন মানসিক সমর্থন, পৃষ্ঠপোষকতা এবং চিকিৎসার খুবই প্রয়োজন। ভয়ানক বিস্ফোরণের মুহুর্মুহু শব্দ, যা তারা প্রতিদিন শুনছে। ভয়ংকর ধ্বংসের চিত্র, যা তাদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে চলছে। চিন্তা করুন, শিশুরা নিজেদের পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজনের হত্যা কিংবা আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার দৃশ্য স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করছে। এসব তাদের নিরাশ ও হতাশ করে তুলছে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া কিংবা বিতাড়িত হওয়ার ভয় নিয়ে সময় অতিবাহিত করছে। তো কে তাদের উদ্ধার করবে? 
আলেপ্পোয় উদ্ধার ও সহায়তা সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেখানে নিক্ষিপ্ত বোমাগুলোর আক্রান্তদের অর্ধেকই শিশু। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে এ রকম সহিংসতায় নিহত শিশুর সংখ্যার তুলনায় এটা সবচেয়ে বেশি। শিশু উদ্ধারকারী একটি সংস্থার হিসাব মতে, মোট নিহতের প্রায় ৩৫ শতাংশই শিশু। আলেপ্পোর শিশুরা যদি বোমাবর্ষণে মারা না যায়, তবে না খেয়ে তারা ক্ষুধার্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। তারা দুঃখজনক মানবিক বিপর্যয়ের ভেতরে মানবেতর জীবন যাপন করছে। সেখানে মানুষের বসবাস কষ্টসাধ্য ব্যাপার।

কারও অজানা নয়, আলেপ্পোর এহেন দুরবস্থা দিন দিন অবনতির দিকে এগোচ্ছে। সিরিয়ান শিশুদের মর্মান্তিক এ ট্র্যাজেডির পরিব্যাপ্তি ওই সংঘাতের চেয়েও বড় ও মারাত্মক, যা আমরা আমেরিকা-রাশিয়ার মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। সিরিয়ায় রক্তের এ বন্যা আর কতদিন বইতে থাকবে? 

সিরিয়ার নিষ্পাপ ও নিরপরাধ শিশুরা তাদের কবর এবং শরণার্থী শিবির থেকে চিৎকার দিয়ে বলছে, ‘আমাদের উদ্ধার কর, আমাদের নিরাপদ বসবাস করতে দাও। ’ কেউ কি সাড়া দেবে? আলেপ্পোয় চরমভাবে মানবাধিকার যে লঙ্ঘিত হচ্ছে, এর দায়ভার কে নেবে? আর কতদিন সিরিয়ার জনগণ, বিশেষ করে আলেপ্পোর শিশুরা এ সংঘাতের মূল্য পরিশোধ করতে থাকবে? যে সংঘাত সিরিয়ার সবক’টি শহর নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে, মানব ইতিহাসের নির্মম ও বর্বর হত্যাযজ্ঞ সেখানে চালানো হচ্ছে। এসবের দায়ভার কি সেসব বড় রাষ্ট্রের নয়, যারা এ সমস্যা সৃষ্টি করেছে এবং সিরিয়াকে সন্ত্রাসী গ্রুপদের জন্য অভয়ারণ্য ও তাদের বিনোদন স্পটে রূপান্তরিত করেছে? ওদের নাম, ওদের রঙ, ওদের প্রতীক ভিন্ন হলেও ওদের সবার লক্ষ্য একটাই। আর তা হচ্ছে সন্ত্রাসী।

এটা বাস্তব, সবাই সবার বিরুদ্ধে লড়ছে। আমেরিকা ও রাশিয়া সিরিয়ায় সন্ত্রাস দমনের ব্যাপারে একমত হয়েছে। তারা সামরিক সহায়তার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে এ লক্ষ্য সামনে রেখে যে, সিরিয়া থেকে সন্ত্রাসী দলগুলোকে প্রতিহত করবে এবং সেখানকার রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধ করবে। এ সংঘাত ৫ বছর ধরে চলে আসছে এবং এ পর্যন্ত ৫ লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়েছে, তাদের মধ্যে শিশুরাও আছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি, তারা উভয়পক্ষ বরং সেখানে আরও জটিলতা বৃদ্ধি করছে। বস্তুত তাদের ওই একমত হওয়া হাস্যকর। যুদ্ধ বন্ধ করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দেয়াই তাদের মূল টার্গেট। রাশিয়া তো প্রকাশ্যে আসাদ সরকারের সমর্থন জোগাচ্ছে। অন্যদিকে আমেরিকা সিরিয়ার সশস্ত্র গ্রুপগুলোর দিকে আরও অধিক সহায়তার হাত বাড়াচ্ছে।

এভাবে সিরিয়ার বিরুদ্ধে এ সংঘাত আঞ্চলিক সংঘাত থেকে আন্তর্জাতিক সংঘাতে পরিণত হয়েছে। এ সংঘাতের পেছনে রয়েছে অনেক স্বার্থ। এ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের স্বার্থই আমেরিকা ও রাশিয়া উভয় পরাশক্তির মধ্যকার সৃষ্ট দ্বন্দ্বের মূল হেতু। আলেপ্পোই সিরিয়ার প্রধান সংঘাতময় এলাকা। আর এটাকেই এ সংঘাতের খলনায়করা বেশি ভয় পায়। কেননা আলেপ্পো হাতছাড়া হওয়া মানে পুরো সিরিয়া হাতছাড়া হওয়া এবং সিরিয়াযুদ্ধে পরাজয় বরণ করা।  

কিন্তু পরিশেষে সিরিয়ার সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে তাদের শিশুদেরই এ সংঘাতের মাশুল দিতে হচ্ছে। এটা মূলত জটিল একটা খেলা, যার দড়ির শেষ মাথা বিশ্বের সেসব পরাশক্তির হাতে এবং যারা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা কখনও চায় না। সেজন্য উভয়পক্ষ- আমেরিকা ও রাশিয়ার মাঝে মূলত সিরিয়া নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। তারা বরং এ অঞ্চলে ইসরাইলের সার্বিক নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের স্বার্থে সিরিয়া বিনাশকরণ এবং সিরিয়াবাসীদের বিতাড়ন করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এবার কি তবে এ স্বাধীন বিশ্ব লজ্জিত হবে এবং তার বিবেক জাগ্রত হবে? 

আস সাদা আরবি পত্রিকা থেকে ভাষান্তর- মাহফুয আহমদ


মন্তব্য