kalerkantho


সু চি হাসলেন, বললেন, রোহিঙ্গা শব্দে আপত্তি!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৬ নভেম্বর, ২০১৭ ১৩:৪৭



সু চি হাসলেন, বললেন, রোহিঙ্গা শব্দে আপত্তি!

ফাইল ছবি

একটা ব্যাপারে মোটেই ভরসা পাচ্ছি না। সেটা হলো নিরাপত্তা।

প্রতিদিন দেশের প্রতিটি সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যমে খবরের মূল অংশ জুড়ে থাকছে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ। এটি আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যা অথবা সংকট নয়। অথচ এর দায়ভার যেন আমাদের ওপরই বর্তাচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকট ঘিরে অনেকটা চোর-পুলিশ খেলা চলছে যেন।

দেশি-বিদেশি প্রচারমাধ্যমে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে, অচিরেই রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করা হবে। কিন্তু কার্যত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যাচ্ছে না। বরং প্রতিদিনই মিয়ানমার থেকে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকছে। ফিলিপাইনে অনুষ্ঠিত আসিয়ান জোটের সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বিশেষ ভঙ্গিমায় হাতে হাত রেখে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চিকে এতটাই হাস্যোজ্জ্বল দেখা গেল যে মনেই হচ্ছিল না তাঁর দেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে নির্দয়, নিষ্ঠুর মানবিক নির্যাতন চলছে। বরং তাঁকে দেখে মনে হয়েছে এই মুহূর্তে তাঁর মতো মহাসুখে পৃথিবীতে আর কেউ নেই।

সু চি যেদিন আসিয়ান সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বিশেষ স্টাইলে হাত মিলিয়ে আনন্দ প্রকাশ করলেন সেদিনই বাংলাদেশের একাধিক দৈনিক পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছে, ‘আরো দুই লাখ রোহিঙ্গা আসছে বাংলাদেশে’। একই দিন চ্যানেল আইয়ে একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হলো, এ পর্যন্ত নতুন করে সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে। তার মানে সাড়ে ছয় লাখের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরো দুই লাখ। এরই মধ্যে বিভিন্ন সময়ে আসা এই দেশে রোহিঙ্গা রয়েছে প্রায় তিন লাখ। তার মানে অচিরেই মোট সংখ্যা দাঁড়াবে ১১ লাখের বেশি। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই নারী ও শিশু। নারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রয়েছে সন্তানসম্ভবা। একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার প্রকৃত সংখ্যা সঠিকভাবে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। কথার কথা, আজ যদি গণনায় ধরা পড়ে পাঁচ লাখ। কালই ১০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। গল্পটা সেই কাকের গল্পের মতো। এই শহরে ৯ হাজার ৯৯৯টি কাক আছে। যদি কম হয়, তাহলে মনে করবেন, অন্য শহরে বেড়াতে গেছে। আর যদি বেশি হয় তাহলে ধরে নেবেন অন্য শহরের কাক এই শহরে বেড়াতে এসেছে! তেমনি বলা যায়, বাংলাদেশে এ মুহূর্তে ১১ লাখ রোহিঙ্গা আছে। যদি বেশি হয় তাহলে ধরে নিতে হবে আশ্রয়শিবিরে গতকালই তাদের জন্ম হয়েছে। আর যদি কম হয় তাহলে ধরে নিতে হবে এসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঢুকে পড়েছে।

অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন, উদাহরণটা অনেকটা হাসিঠাট্টার মতো হয়ে গেল না! হ্যাঁ, তা ভাবতে পারেন। মিয়ানমার কি বাংলাদেশের সঙ্গে অনেকটা হাসিঠাট্টার মতোই আচরণ করছে না? একদিকে বলা হচ্ছে, অচিরেই রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করা হবে। অথচ প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে জোর করে পাঠানো হচ্ছে। এটা তো সমঝোতার লক্ষণ নয়। সমঝোতার কথা উঠলে একটি জায়গায় তো থাকতে হবে? তারপর তো আলোচনা হবে। কিন্তু মিয়ানমারের থামার তো কোনো লক্ষণই নেই। আশা করা হচ্ছিল, ফিলিপাইনে আসিয়ান সম্মেলনে নিশ্চয়ই বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আসিয়ান সম্মেলনে বিষয়টিকে গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। বরং এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আসিয়ান সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের ব্যাপারে বিস্তারিত কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি বিশ্বনেতাদের ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার না করারও অনুরোধ করেছেন অং সান সু চি। এতে কি আদৌ প্রমাণিত হয় মিয়ানমার রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে আন্তরিক? অথচ আমরা কতই না আশার বাণী শোনাচ্ছি। অনেকেই বলছেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু তত দিনে বাংলাদেশ কতটা বিপর্যয়ের মুখে পড়বে তা কি আমরা আদৌ ভেবে দেখেছি?

বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নির্ধারিত ক্যাম্পে তাদের রাখার ব্যবস্থা করা হলেও অনেকেই দেশের ভেতরে নানা জায়গায় ছড়িয়ে যাচ্ছে। প্রাথমিক অবস্থায় হয়তো অনেকেই একে কোনো সংকট বা সমস্যা বলে ভাববেন না। কিন্তু এখনই যদি এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জোরদার করা না যায় তাহলে ভবিষ্যতে সমস্যাটি ভয়াবহ রূপ নিতে বাধ্য। তার একটি সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরতে চাই। রোহিঙ্গারা যদি অবাধে অথবা চোরাপথেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঢোকার সুযোগ পায় তাহলে বাঁচার তাগিদে তারা নানা পেশার সঙ্গে যুক্ত হতে চাইবে। সুযোগসন্ধানী মানুষ তাদের অন্যায় পথে যুক্ত করবে। সন্ত্রাসী দলেও তারা ঢুকে যেতে পারে। যদি সত্যি সত্যি তারা এ ধরনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয় বা হতে পারে, তাহলে দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থার কী হবে?

লেখার শুরুতে ‘ভরসা’র কথা তুলেছিলাম। যতবারই রোহিঙ্গাদের নিয়ে লেখি ততবারই ১৯৭১ সালের কথা মনে পড়ে। আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আমরাও তো এভাবে দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। কাজেই দেশছাড়া রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে নেতিবাচক কিছু লিখতে মন চায় না। কলম থেমে আসে। কিন্তু আমাদের এই ছোট্ট দেশে আর কত দিন এই বাড়তি সমস্যা বয়ে নিয়ে বেড়াব? কত দিন...?

লেখক: রেজানুর রহমান, সম্পাদক, আনন্দ আলো 


মন্তব্য