kalerkantho


এই ছবি থেকে শিক্ষা নিয়ে যশোর রোড বাঁচান

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ১৫:৪৬



এই ছবি থেকে শিক্ষা নিয়ে যশোর রোড বাঁচান

কলকাতা-পেট্রাপোল সড়কের এই গাছগুলো কেটে ফেলা হয়নি

বেনাপোল। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এই গ্রামটি বাংলাদেশের যশোর জেলার শার্শা উপজেলার অন্তর্ভুক্ত। এখানে রয়েছে একটি সীমান্ত তল্লাশি ঘাঁটি এবং একটি আন্তর্জাতিক স্থলবন্দর। শুল্ক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রয়েছে আলাদা একটি কাস্টম হাউজ, রয়েছে একটি রেলস্টেশন যেখানে বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষ দু'দেশে প্রতিনিয়ত চলাফেরা করে। এই স্থলবন্দরের মাধ্যমেই দেশের প্রায় ৯০ ভাগ আমদানি-রপ্তানি হয়ে থাকে। আর এসব মালামাল দেশের নানা প্রান্তে পৌঁছানোর একমাত্র মহাসড়কের নাম যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক। যা ঐতিহাসিকভাবে যশোর রোড নামে খ্যাত।

আরো পড়ুন: শতবর্ষী গাছগুলো না কেটে বিভাজক হিসেবে ব্যবহার করুন

যশোর শহরের দড়াটানা থেকে বেনাপোল পর্যন্ত প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক। বাংলাদেশের মধ্যে এটিই একমাত্র সড়ক যার বাণিজ্যিক এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। তবে সড়কটির সৌন্দর্যের কাছে সবকিছুই যেন হার মেনে যায়। কারণ দেশের অন্য যে কোন সড়ক কিংবা মহাসড়ক সম্পূর্ণ থেকে আলাদা সবার প্রিয় সড়ক। সড়কটির উভয় পাশের মোটা মোটা বিশাল আকৃতির শতবর্ষী গাছগুলোয় সড়কটির এই পরিচিতি এনে দিয়েছে। বিশাল আকৃতির এসব গাছগুলোকে শতবর্ষী বলা হলেও এদের অধিকাংশটির বয়সই আসলে দুই শ ছুঁই ছুঁই। কথিত আছে কিছু গাছের বয়স আড়াই শ বছরেরও বেশি। সড়কটিতে রয়েছে যশোরের তৎকালীন জমিদার কালী পোদ্দারের লাগানো তিন শতাধিক গাছ। এক কথায় যশোর রোড মানেই প্রাচীন বৃক্ষরাশিতে সমৃদ্ধ এক মহাসড়ক। 

কিন্তু পাঠক, আপনারা সবাই জানেন, যে গাছগুলো কালের সাক্ষী হয়ে বছরের পর বছর কোটি পথিকের প্রাণ জুড়িয়ে আসছে, রাস্তা সম্প্রসারণের অযুহাতে তা আজ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যশোর জেলা প্রশাসন। শুধু জেলা প্রশাসন নয়, এই সিদ্ধান্তের সাথে কাজ করছে সরকারের সড়ক ও জনপদ বিভাগও। 

আত্মঘাতী এই সিদ্ধান্তটি আর সবার মতো আমাকেও নাড়া দিয়েছে। এ কারণে গেল ১২ জানুয়ারি কালের কণ্ঠের অনলাইনে এ নিয়ে একটি নিবন্ধও লিখেছি। যেখানে দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি, গাছগুলো না কেটেও কিভাবে মহাসড়ক চার লেনে উন্নিত করা যায়। উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছি বেনাপোল সীমান্তের ওপারে কলকাতা-পেট্রাপোল সড়কের কথা। যেখানে গাছ না কেটে করা হয়েছে চার লেনের সড়ক। পেট্রাপোল থেকে কলকাতার দূরত্ব ৮০ কিলোমিটার। আজকের লেখায় যে ছবিটি দেখছেন তা আসলে এই কলকাতা-পেট্রাপোল মহাসড়কেরই। বাংলাদেশের মতোই এই মহাসড়কটির উভয় পাশেও শতবর্ষী গাছে ঢাকা। কিন্তু ভারত সড়কটি চার লেনে উন্নিত করতে গিয়ে শতবর্ষী গাছ না কেটে সেগুলো বিভাজক হিসেবে ব্যবহার করেছে। ভারতের এই সিদ্ধান্তের ফলে পেট্রাপোল-কলকাতার রাস্তার সৌন্দর্য যেমন আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে, তেমনিই রক্ষা পেয়েছে সড়কের দুই ধারের কয়েক হাজার গাছ।

আরো পড়ুন: ৯৯৯-এ কল, বাচ্চাটি খুঁজে পেলো হারানো পরিবার

কিন্তু যশোর রোডের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা কেবল আমাকে বিস্মিতই করেনি বরং সড়ক ও জনপদের দায়িত্বে যারা রয়েছে তাদের সামগ্রিক জ্ঞান এবং বিচক্ষণতা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে।     

অত্যন্ত ব্যস্ত যশোর-বেনাপোল মহসড়কটি সম্প্রতি চার লেনে উন্নীত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা বাস্তবসম্মত, প্রয়োজনীয় এবং প্রশংসারও বটে। কিন্তু সড়কটি চার লেনে উন্নীত করতে গাছগুলো কাটতেই হবে এমন কোন ধরা বাধা নিয়ম আছে কী? 

যেখানে গাছগুলো রক্ষা করে বিকল্প ‘হাজারটা’ উপায়ে চার লেনে উন্নীত করা যাবে, সেখানে গাছ কাটার এই সিদ্ধান্ত কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। উন্নয়নের দোহাই দিয়ে যারা শতবর্ষী গাছগুলো কাটার মতো আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আসলে তারা উন্নয়ন বোঝেন কিনা তাতে আমার সন্দেহ আছে। আমি মনে করি, এই লেখাটির ছবি থেকে শিক্ষা নিয়ে রাস্তাটির দুই পাশ চওড়া না করে গাছগুলো নির্দিষ্ট দূরত্বে রেখে এক পাশ চওড়া করতে কর্তৃপক্ষ একটি স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নেবে। তাহলে একপাশের গাছগুলো রাস্তার বিভাজক হিসেবে ব্যবহার যাবে, অন্যথায় আলাদা রাস্তা তৈরি করুন।  

লেখক: জুবায়ের আল মাহমুদ
সাংবাদিক, পরিবেশ ও সমাজ উন্নয়নকর্মী


মন্তব্য