kalerkantho


শিক্ষার গুণগত মানবৃদ্ধিতে 'সেকায়েপ'র শিক্ষকদের স্থায়ী করুন

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ১৬:৩৯



শিক্ষার গুণগত মানবৃদ্ধিতে 'সেকায়েপ'র শিক্ষকদের স্থায়ী করুন

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এসডিজি-৪ এর মূল লক্ষ্যই হলো সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা। সরকার এই লক্ষ্য পূরণে নানামুখি পদক্ষেপও নিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সবার জন্য অংশগ্রহণমূলক বা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করা যতটা না সহজ হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের হয়ে উঠেছে সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি। পাঠক, আপনারা এ বিষয়ে নিশ্চয়ই সবাই অবগত আছেন। পাশাপাশি মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের আন্তরিকতাও লক্ষাণীয়। এ বিষয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপও আমরা নিতে দেখেছি।  তবে আমি যদি ভুল না করি তাহলে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে সবচেয়ে যুগান্তকারি একটি পদক্ষেপের নাম 'সেকায়েপ'। 

আরো পড়ুন: শিক্ষা,গুণগত,মানবৃদ্ধি,সেকায়েপ,শিক্ষক,স্থায়ী,করুন

পাঠক, আজকের লেখায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সাথে মানহীন শব্দটি কিভাবে জড়িয়ে পড়লো-শুরুর দিকে এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো। আর শেষ দিকে সরকার গৃহীত সেকায়েপ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো। 

দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়নে প্রথম ২০০১ সালে বিভাগ ভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি থেকে সরে এসে গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করা হয়। পদ্ধতিটি সময় উপযোগী হওয়ায় শুরুর দিকে সবাই এই পদ্ধতিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখেছিল। গ্রেডিং পদ্ধতি নিয়ে অবশ্য এখনো সবার মনে ইতিবাচক মনোভাবই রয়েছে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে গ্রেডিং পদ্ধতিতে বিরাজমান জিপিএ নামক কথিত সোনার হরিণ পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে অসুস্থ করে ফেলেছে। আর এ জন্য প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনি, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষাসহ প্রতিটি শ্রেণীতে মাত্রাতিরিক্ত পাঠ্যবই অন্তভুর্ক্তির বিষয়গুলোকে দায়ী করলে খুব ভুল হবে কি?

দেশে প্রাথমিকে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে ৬টি করে বই পড়ানো হলেও এক বছরের ব্যবধানে পঞ্চম শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থী যখন ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হচ্ছে, তখন তাকে পড়তে দেয়া হচ্ছে ১৪টি বই। একই চিত্র ৭ম এবং ৮ম শ্রেণীতেও। তবে পাবলিক পরীক্ষা ১১টি বিষয়ে অনুষ্ঠিত হলেও ৯ম এবং ১০ম শ্রেণীতে ১৮টি বই পড়ার নিয়ম রয়েছে। শ্রেণীকক্ষে এই অতিরিক্ত বইয়ের চাপের কারণে প্রতিনিয়ত বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। আবার একদিকে আমাদের দেশের অধিকাংশ স্কুলেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত বেশি। আবার অন্যদিকে, প্রতিটি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেতেই হবে- এমন অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে শিক্ষার্থীরা স্কুলের চেয়ে কোচিংয়ের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে। 

অবশ্য জিপিএ ৫ অর্জনের মাত্রা এতোটাই বেশি যে আজ এটা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। ২০০১ সালে প্রথমবার যখন গ্রেডিং পদ্ধতি চালু হয়েছিল, সেবার সারাদেশে মাত্র ৭৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ অর্জন করেছিল। অথচ সময়ে ব্যবধানে আজ তা লাখের ঘর ছাড়িয়ে গেছে। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ‘সংখ্যা’ চিন্তার বিষয় না হলেও দেখা যাচ্ছে, এসব শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে যখন প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকতে পারছে না। মূলত এরপরেই সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে। প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষার্থীদের শিখন পদ্ধতি এবং যারা শিক্ষা দেয় অর্থাৎ শিক্ষকদের মান নিয়েও। 

এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। আমরা জানি শিক্ষা ক্ষেত্রে ‘সৃজনশীল’ নামক একটি বিশেষ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। যে শব্দটির আভিধানিক অর্থ সৃষ্টি করতে পারা। ধরা যাক, একজন কামার অত্যাধুনিক একটি দা কিংবা বটি তৈরি করেছে। সেই দা বা বটিটি একবার ধার (শান) করলে অন্তত ৬ মাস আর ধার (শান) করা লাগবে না- মূলত এটাই সৃজনশীলতা। এখানে ওই কামার দা কিংবা বটি আবিষ্কার করেনি বরং ওটা আবিষ্কার অনেক অন্য কেউ করেছে কিন্তু কামার তার দক্ষতা দিয়ে দা বা বটিকে এমন কিছু করেছে যার ফলে অনেকদিন ধার ছাড়াই কাজ করা যাবে। এটা ওই কামারের সৃজনশীলতা। সৃজনশীলতা মূলত এমনই। কিন্তু বর্তমান সময় সৃজনশীল শব্দটি উল্লেখ করলেই সবার মনে ভেসে উঠে পরীক্ষা শব্দটি। সৃজনশীল আর পরীক্ষা যেন সমার্থক! 

আসলে মানহীন শিক্ষার জন্যে এটাও অনেকটা দায়ী।  বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করা যাক- আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সৃজনশীল পদ্ধতি খুবই সময় উপযোগী। কিন্তু এই পদ্ধতি চালুর আগে আমাদের শিক্ষকরা এই পদ্ধতির জন্য প্রস্তুত আছেন কি না-তা আমরা ভেবেছি কি?

পেশাগত এবং সামাজিক কিছু দায়বদ্ধতা থেকে তৃণমূল পর্যায়ের কয়েক হাজার স্কুল ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। আমি বহু শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছি। সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্ন প্রণয়ন করতে পারে- এমন শিক্ষক আমি খুব বেশি দেখিনি। যেসকল শিক্ষক এই পদ্ধতিতে প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন না, তারা অ্য শিক্ষকের দ্বারস্থ হন। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট পারিশ্রমীক দিয়ে মেধাবী শিক্ষককের কাছ থেকে প্রশ্ন কিনে নিয়ে স্কুলগুলোর সাময়িক পরীক্ষাগুলো পরিচালনার দৃশ্যও আমি দেখেছি। এমন নানা কারণে দেশের শিক্ষার মান নিম্নগামী।

অথচ জাতিসংঘ ঘোষিত টেকশই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি-৪ এ সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। সরকার এসডিজি বাস্তবায়নে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আনার উদ্যোগ নেয়। এই উদ্যোগের ফলে ২০১৫ সালে সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস এনহেন্সমেন্ট প্রজেক্ট বা সেকায়েপ নামক একটি বিশেষ প্রকল্পের আওতায় আকর্ষণীয় বেতনে সারা দেশের প্রায় ৩ হাজার স্কুলে ৫ হাজার ২শ জন মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। গণিত, ইংরেজি এবং বিজ্ঞান বিষয়ে অতিরিক্ত শ্রেণী শিক্ষক (এসিটি) হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এসব শিক্ষদের অধিকাংশই দেশের নামকরা কলেজ এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী। নিয়োগের সময় মন্ত্রণালয় থেকে এসব শিক্ষকদের প্রকল্পের মেয়াদ শেষে অন্য প্রকল্পে স্থানান্তর অথবা এমপিওভুক্তি করে চাকরি স্থায়ী করার কথা বলা হয়েছে। 

শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য নিয়োগ পাওয়া এসব শিক্ষক প্রকৃত অর্থে শিক্ষার গুণগত মানবৃদ্ধিতে কতটা অবদান রাখছে-তা দেখতে সম্প্রতি আমি কয়েকটি স্কুল পরিদর্শন করেছি। কথা বলেছি স্কুলগুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের সঙ্গে। চাপাইর বি বি উচ্চ বিদ্যালয় এর মধ্যে একটি। গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলাধীন এই স্কুলটিতে ক’বছর আগেও শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল সাড়ে তিনশ/চার’শ, ঝরে পড়ার হারও ছিল লক্ষণীয়। কিন্তু এসিটি শিক্ষকরা গেল দুই বছরে বিদ্যালয়টিকে বদলে দিয়েছে। বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী সংখ্যা এখন আট শতাধিক। অভিনব পাঠ দানের কারণে পরীক্ষায় অকৃতকার্যের সংখ্যাও কমে গেছে। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক তোফাজ্জল হোসেন রানার মতে, শুধুমাত্র এসিটি শিক্ষকদের কারণে তার বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন আর কোচিং করে না। শিক্ষার্থীদের মন থেকে চলে গেছে বিজ্ঞান ভীতি। যে বিদ্যালয়টি বিজ্ঞানে সবচেয়ে পিছিয়ে ছিল সেই চাপাইর বি বি উচ্চ বিদ্যালয়টিই সম্প্রতি উপজেলা বিজ্ঞান মেলায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। কথা হয় কালিয়াকৈর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকতা দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গেও। তিনি জানান, পরীক্ষায় অধিকাংশ শিক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয় ইংরেজি, গণিত এবং বিজ্ঞানে। কিন্তু তার উপজেলায় যেসব স্কুলে এসিটি রয়েছে, সেসব স্কুলে অকৃতকার্যের হার অনেক কমে গেছে।

এমন বদলে যাওয়ার চিত্র দেখে এসিটি শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে জানানার আগ্রহ তৈরি হলো। চাপাইর বি বি উচ্চ বিদ্যালয়ে বর্তমানে দুই জন এসিটি রয়েছেন। এর মধ্যে কৌশিক রায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ, অন্যজন সোনিয়া আক্তার-যিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতকোত্তর করেছেন। একই চিত্র উপজেলার সিনাবহ উচ্চ বিদ্যালয়েও। এই বিদ্যালয়টিতে এসিটি রয়েছেন তিন জন। যারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে পেশা হিসেবে শিক্ষকতা বেছে নিয়েছেন। সহজপদ্ধতি পাঠদানের কারণে এসব শিক্ষক প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছে তাদের প্রিয় শিক্ষক। মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসলে সবকিছু যে বদলে দেয়া যায়-এ যেন তারই উদাহরণ। 

কিন্তু এসব শিক্ষকদের নিয়ে এই দুটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে যতটা না প্রফুল্লতা দেখেছি তার চেয়ে বেশি দেখেছি মলিনতা। কারণ সেকায়েপ প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়ে গেছে। নিয়োগের সময় এমপিওভুক্তি করা কিংবা অন্য প্রকল্পে স্থানান্তরের কথা বলা হলেও এ ব্যাপারে এখনো কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ফলে দুশ্চিন্তায় দিন পার হচ্ছে ৫ হাজার ২শ এসিটির। যাদের প্রায় সবারই সরকারি চাকরির বয়স শেষ হয়ে গেছে। পেশাগত কারণে আমি বিষয়টি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের নজরেও নিয়ে আসি। এসিটিভুক্ত স্কুলের শিক্ষারমান যাচাই করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের আশ্বাস দেন তিনি। 

আরো পড়ুন: এই ছবি থেকে শিক্ষা নিয়ে যশোর রোড বাঁচান

শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে এসিটি শিক্ষকদের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের ইতিবাচক দৃষ্টি বুঝতে পারি। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে এতো দেরি কেন? এখানে একটি কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই, এসিটি শিক্ষকদের স্থায়ী না করলে ভবিষ্যতে শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য সরকার চেষ্টা করলেও মেধাবীরা কখনোই এসব অস্থায়ী চাকরিতে আসবে না। কারণ মেধাবীদের জন্য হাজারটা দরজা খোলা রয়েছে। ওপরে এসিটি কৌশিক রায়ের কথা বলেছি। যিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ৪০ হাজার টাকা বেতনের চাকরি ছেড়ে ২৫ হাজার টাকার এসিটি হিসেবে যোগ দিয়েছেন শুধুমাত্র ভবিষ্যতে মন্ত্রণালয় চাকরিটা স্থায়ী করবে- নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এমন কথা উল্লেখ থাকার কারণে। 

তা ছাড়া বিষয়টা তো এমন নয় যে, মাধ্যমিকে আর কোন দিন শিক্ষকই লাগবে না। সারাদেশে প্রতিদিন শত শত শিক্ষক অবসরে যাচ্ছেন। সেকায়েপ প্রকল্পের মেয়াদ যদি আর না বাড়ে কিংবা এসব শিক্ষকদের অন্য প্রকল্পে স্থানাত্বর করা নাও যায়, তাহলে সারাদেশে অবসরে যাওয়ার কারণে যে পদগুলো শূন্য হচ্ছে সেই শূন্যপদগুলোও এই ৫ হাজার ২শ জন শিক্ষক দিয়ে পূরণ করা যায়। 

আসলে এসিটিদের বিষয়ে খুব দ্রুত একটা সিদ্ধান্তে আশা দরকার। তা না হলে আমরা ৫ হাজার ২ শ জন অভিজ্ঞ মেধাবী শিক্ষক হারাবো। আর অদূর ভবিষ্যতে সরকারের কোনো প্রকল্পেই হয়তো মেধাবীরা আসবে না। তাই এসডিজি বাস্তবায়নে এ বিষয়ে দ্রুত একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে সরকার- এমনটাই প্রত্যাশা করি।   

লেখক: জুবায়ের আল মাহমুদ
সাংবাদিক, সমাজ ও পরিবেশ উন্নয়নকর্মী


মন্তব্য