kalerkantho


রিমু, আমি আর আমরা

আবদুল্লাহ আল মোহন   

১৯ মার্চ, ২০১৮ ১৫:২৭



রিমু, আমি আর আমরা

১.
রিমুকে নিয়ে লিখতে গিয়ে স্মৃতির আবেগে আক্রান্ত তীব্রভাবে আমি। কীবোর্ডে আঙ্গুল না চললেও মন ছুটে যাচ্ছে অতীতের সড়ক ধরে পিছন পানে। মনে পড়ছে কত কথা, মনের আকাশে ভাসছে প্রীতির মেঘমালা। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় পনের বছর একটানা ঢাকার বাইরে প্রশিকা, সোনালী ব্যাংক ও সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে মানিকগঞ্জ, বগুড়া ও সিলেটে ভিন্ন ভিন্ন পেশার বিচিত্র স্বাদের-পদের চাকুরির কারণে ঢাকার বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ-দেখা-সাক্ষাৎ আড্ডাবাজি একদম কমে গিয়েছিলো। স্বাভাবিকভাবেই রিমুর সাথেও কম দেখা হতো। ২০১৪ সালের মে মাসে ঢাকার নব প্রতিষ্ঠিত ভাসানটেক সরকারি কলেজে যোগদানের ফলে পুরানো দিনের স্বজন-বান্ধবদের সাথে সম্পর্কের নবায়ন ঘটার সুযোগ আসে। রিমুর মতোন বন্ধুদের সাথে শুরু হয় যোগাযোগের নতুন পর্ব। মাঝে-মধ্যে নানা উপলক্ষ্যে অবশ্য অনেকের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে অনিয়মিতভাবে। রিমুর সাথেও হয়েছে কয়েকবার।

২.
রিমুকে ফিরে পাই ২০১৪ সালের মাঝামাঝিতে। আমার কলেজে ক্লাসের বাইরে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে-প্রকাশে-সৃষ্টিতে শুরু করি ‘মঙ্গল আসর’ নামের নিয়মিত আলোচনা চক্র। আসলে মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ মাঠে পরিচালিত পাঠচক্রের সম্প্রসারণই হয়ে ওঠে ‘মঙ্গল আসর’। মনে রাখবার মতোন মানুষদের জন্মদিন-প্রয়াণদিনে স্মরণসহ নারী দিবস, প্রতিবন্ধি দিবস, পরিবেশ দিবসসহ নানা দিবস যাপনের পাশাপাশি সচেতনতামূলক বিষয়কেন্দ্রিক আসর বসানো শুরু করি ছেলে-মেয়েদের সক্রিয় অংশীদারিত্বে। এমনই এক বিকেলে কলেজ থেকে মিরপুর ১৪ নম্বর ডেন্টাল কলেজে ফেরার পথে সিআরপির সামনের ঘুপচি ঘরে চা-পানের আশায় প্রবেশ করতেই আকস্মিক উচ্চস্বরে ‘মামা’ বলে চিৎকার করে ওঠা রিমুকে দেখে আমি আনন্দে আবেগতাড়িত হই, আমার সাথের ছাত্র-ছাত্রীরা বিস্মিত হয়। আমরা পরস্পরকে ‘মামা’ বলেই সম্বোধন করতাম, কেন করতাম জানি না। তবে আকে বন্ধু বিপ্লবের ‘মামা’বলার কারণটা জানি। আবেগ স্তিমিত হলে জানা গেলো রিমু সেখানকার প্রতিবন্ধি কল্যাণ প্রতিষ্ঠানে এসেছিলো কাজে। কাজ শেষে চা পানের জন্য এসেছিলো সে তার একজন সহকর্মির সাথে। এভাবেই অনেকদিন পর রিমুর সাথে পুর্ন:মিলন ঘটে, আমরা একসাথে গাড়িতে লালমাটিয়া ফিরি, ওর অফিস চেনা হয় আমার। সেই থেকে রিমুর নিরন্তর সহযোগিতা পেয়েছি আমার ‘মঙ্গল আসর’-এর জন্য যেমন, তেমনি নানান নীতি সংক্রান্ত পাঠ পর্যালোচনাকালেও। আমার এই অক্লান্ত কর্মীবন্ধু, চিন্তনসখাকে আর পাবো না আগের মতোন, সেটা মানি কী করে আমি? রিমুর শূন্যতা অপূরনীয়, ওকে হারানো জাতীয় ক্ষতি বিবেচনা করি।

৩.
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও কলেজ জীবনের বন্ধুদের অনেকের কাছেই রিমু আর জয়দের বাসা ছিলো আমাদের বন্ধুদের ভরসার আশ্রয়স্থল। সময়-অসময়ে গিয়ে হাজির হয়ে খাবারের ‘অদৃশ্য’ দাবি নিয়ে খালাম্মাকে কতই না জ্বালিয়েছি। খালাম্মার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে তাঁর করুণা লাভের আপ্রাণ চেষ্টা আমাদের কোনদিনই বৃথা যায়নি। রাজু ভাই, রিতুকেও কম অত্যাচার করিনি আমরা ভালোবাসার দাবিতে। আর ওদের বাড়ির টেলিফোন কাহিনি তো আমাদের অনেকের কাছে চিরস্মরণীয় ঘটনা। সেই ১৯৮৯-৯১ সালে টেলিফোন ব্যবহার করা ওদের বাড়িটি হয়ে উঠেছিলো আমাদের সদ্য শিবরাম চক্রবর্তীর ‘CALL-কারখানা’ গল্প পাঠের ব্যবহারিক প্রয়োগ কারখানা। বন্ধু মোখলেসের কীর্তিনামা এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে উল্লেখ না করাটা অন্যায়ই হবে। আমাদের ‘নাবালক‘ সুলভ দুষ্টুমির কত খেসারত যে দিতে হতো রিমুকে, পরে জেনে দারুণ আনন্দ উপভোগ না করে পারিনি আমরা। একবার তো টেলিফোন সেটটিই খুলে ব্যাগে ভরে নিয়েছিলো কে একজন বন্ধু আমাদের। কিন্তু সংযোগহীন সেটের মূল্যহীনতা সম্পর্কে সেই বন্ধুটির কোন ধারণা না থাকায় পরে চুপি চুপি যথাস্থানে সেটিকে পুন:স্থাপিত করায় আমাদের ইজ্জ্বত ‘পাংচার’ হওয়া থেকে রক্ষা পায় সেবারের মতো।

৪.
রিমু রাজনীতির মানুষ হলেও ক্ষমতাবলয়ের খুব কাছাকাছি থাকার সুযোগ পেলেও সেই ক্ষমতাকে কখনোই নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করেনি, করতে দেখিনি। ওর চিন্তায় থাকতো প্রতিবন্ধিদের কল্যাণ, আরেকটু বড় পরিসরে আসলে মানব কল্যাণ চিন্তায় সদা জাগ্রত ছিলো রিমুর সংবেদনশীল মনটা। অটিজমসহ প্রতিবন্ধিদের বিষয়ে শিক্ষাঙ্গণে আরো বেশি সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার প্রতি আমার আগ্রহ ওর মনে দাগ কেটেছিলো। শিশুদের সচেতনকরণ প্রক্রিয়াই সবচেয়ে বেশি কার্যকর বলে রিমুর আস্থা জন্মেছিলো। শিক্ষার্থীদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে সেটাই বেশি উপকারে আসবে বলে আমরা সহমত পোষণ করেছি। সেটা কীভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব সঠিকভাবে, সেই কার্য-করণ কৌশল নিয়ে কতই না কথা হতো আমাদের।

৫.
আমি দুপুর কিংবা বিকেলে কলেজ থেকে ফেরার পথে প্রায় নিয়মিতই আসাদগেট নেমে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের আমার সতীর্থ বন্ধু হিটো কিংবা রিমুকে ফোন দিতাম। ওদের না পেলে এএলআরডিতেও চলে যেতাম মিঠু ভাই, আজিম ভাইদের কাছে। সকলের সাথে আমার আলাপন চলতো কীভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আরো সঠিক ও কার্যকরভাবে মানবাধিকার, নারীর অধিকার, প্রতিবন্ধিদের অধিকার, পরিবেশ ও সমাজ সচেতনতার মতোন জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমরা আরো বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারি, এসব নিয়ে। রিমু কিংবা হিটোর সাথে লালমাটিয়া আড়ং এর পিছনে, মাঠের সাথে হাফিজ মামার ঘরোয়া খাবার হোটেলে নানা পদের ভর্তা আর ঝালের উত্তেজনায় কত যে সময় কেটেছে, দুপুর বিকেলে গড়িয়েছে, বিকেল সন্ধ্যায় পৌঁছেছে তার কোন হিসেব রাখিনি। সেই প্রাণবন্ত সমাজসেবক প্রাণের মানুষ রিমু নেই আমি কীভাবে ভাবতে পারি ?

৬.
আমার বন্ধু রিমু, আমাদের পরম আত্মীয় রিমু বেঁচে আছে, ছিলো, থাকবেও আমাদের সকলের শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত বলেই আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি। কারণ রিমু তার বন্ধুদের জন্য সবটুকু দিয়ে দিতে কখনো সংশয়ী ছিলো বলে দেখিনি আমি, আমরা কেউই। খালাম্মা এবং রিমুর ভাই-বোনদের শোকের কাছে আমাদের ব্যথা কিচ্ছুই না হয়তবা। খালাম্মার কথা ভাবলেই বন্ধু হারানোর বেদনা নীল সমুদ্রে পরিণত হয়, বিপাশা আর অনিরুদ্ধ সেখানে বজ্রাহত করে, আমি-আমরা ‘নীলকণ্ঠ’ হয়ে পড়ি না কী?

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সরকারি ভাষাণটেক কলেজ, কাফরুল, ঢাকা


মন্তব্য