kalerkantho


মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ

সম্পা পাল , শিলিগুড়ি   

২০ মার্চ, ২০১৮ ১৪:৪৩



মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ

আমি একজন ভারতীয় বাঙালি মেয়ে। আজ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখছি কোথাও একটা তাগিদ অনূভব করে। কারণ এ দেশের সঙ্গে একটা যোগসূত্র আমার রয়েছে। হ্যাঁ একদিন এটা আমার পূর্ব পুরুষের দেশ আর আমার বাবা মায়ের দেশও ছিল। মুক্তি যুদ্ধের সময় বাবার পরিবার মায়ের পরিবারকে ভারতবর্ষে চলে আসতে হয়েছে জীবন রক্ষার তাগিদে। সেদিনের সেই ভয়ার্ত জীবন কখনো গল্প হতে পারে না সেটা বাস্তবের চাইতেও অনেক বেশী কিছু।

সময়ে অসময়ে এরকম বহু মুক্তিযুদ্ধ পৃথিবীর বুকে ঘটে গেছে। পরাধীনতা থেকে মুক্তিই যার প্রধান শর্ত। যুদ্ধগুলো ছিল মূলত সবল জাতির বিরুদ্ধে দূর্বল জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে বাঙালী জাতির স্বাধীনতার লড়াই- ই ছিল মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘদিনের শোষণ আর বঞ্চনার ফলশ্রুতি ছিল এই মুক্তিযুদ্ধ। সেদিন বাংলাদেশ বলে পৃথিবীর মানচিত্রে কোনো দেশ ছিল না। আজকের বাংলাদেশ সেদিন পূর্ব পাকিস্তান। ১৯৪৭ এর ১৪ই আগষ্ট ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে দুটো স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র পৃথিবীর বুকে জন্ম নিল ভারতবর্ষ ও পাকিস্তান নাম নিয়ে । পশ্চিম বাংলা রয়ে গেল ভারতবর্ষে আর পূর্ব বাংলা হলো পশ্চিম পাকিস্তানের একটি প্রদেশ , নাম হলো পূর্ব পাকিস্তান।

১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজদের অধীনতা থেকে মুক্ত হবার পর সেদিন বাঙালী জীবনে নতুন ভোর আর নতুন বাচার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু তা হলো না ১৯৪৭ থেকে আবার শুরু হলো নতুন সংগ্রাম। আবার জন্ম নিল বাংলা মায়ের বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী সন্তান।

পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান দূরত্বটা হাজার মাইলেরও বেশী। মাঝখানে আর একটা দেশ ভারতবর্ষ। এত দূরত্ব এত বাধা সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তান এ অঞ্চলের ওপর আধিপত্য বিস্তার করলো শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে। ধর্মের কারনেই বাঙালীর সামাজিক , অর্থনৈতিক , রাজনৈতিক , সাংস্কৃতিক জীবন পূনরায় শৃঙ্খলিত হলো।

১৯৭১ এর ২৬শে মার্চ যে মুক্তি আন্দোলনের সুচনা হয়েছিল সেটা কোনো হঠাৎ আন্দোলন ছিল না। ইতিপুর্বে আরো কয়েকটা আন্দোলন হলো । ১৯৪৮ খ্রী: ভাষা আন্দোলন-যেটা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু ভাষাকে চ‍্যালেঞ্জ জানিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার স্বীকৃতিদানের লড়াই। ১৯৬২ খ্রীষ্টাব্দে হলো শিক্ষা আন্দোলন। শিক্ষার সর্বজনীন অধিকারই ছিল এর মূল লক্ষ্য। তবে শুধুমাত্র শিক্ষার দাবীতেই এ আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আরো কিছু অধিকারের দাবী।

১৯৫৮ খ্রীষ্টাব্দে পাকিস্তানের সামরিক শাসক আয়ুব খান দেশের শাসনভার দখল করে নেন। একদিকে সামরিক শাসন অপরদিকে শোষণ , বঞ্চনা ,অত্যাচার পূর্ব বঙ্গের মানুষের আর মেনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এরুপ পরিস্তিতিতে আওয়ামীন লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ১৯৬৬ খ্রীষ্টাব্দে বাঙালী জাতির জন্য স্বায়ত্তশাসন দাবী করলেন এবং পেশ করলেন ৬ দফা দাবী। এ দাবীর মূল বক্তব্য ছিল প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের স্বায়ত্তশাসন দান। এ দাবীর পর আওয়ামীন লীগের ছোট বড়ো অনেক নেতাই কারারুদ্ধ হলেন। মুজিবর রহমানকে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করে তার বিরুদ্ধে করা হলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। শুরু হলো দেশজুড়ে আন্দোলন , নেতৃত্বে এগিয়ে এলো ছাত্রসমাজ।  আন্দোলনের ভয়াবহতায় শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার মুজিবর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলো। তবে জনগণের অসন্তোষ তাতে থামেনি। ভেতরের অসন্তোষ শুধু স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষায়। কারণ বাঙালী জাতি বুঝতে পেরেছিল যে কোনো উপায়ে স্বাধীনতা আনতেই হবে। আর সেই স্বাধীন ভোর হতে বেশী বাকি নেই।

সালটা ১৯৭০ । সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। এই নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক আসনে জয়যুক্ত হলো আওয়ামীন লীগ নেতা মুজিবর রহমান। তার এই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় রাতের ঘুম কেড়ে নিল । শুরু হলো মুজিবর রহমান বিরোধী ষড়যন্ত্র । ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দে ৭ই মার্চ মুজিবর এক ঐতিহাসিক ভাষন দিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাস যে ভাষনকে চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরন করবে। তাতেই স্পষ্ট হয়ে উঠল এই শোষণ আর শাসনের স্বরূপ। এসবের শেষ প্রস্তুতি হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে এলো ২৫ শে মার্চের সেই কালো রাতকে।  হাজারো সংখ্যায় পাকিস্তানি সেনা রাস্তায় নেমে পড়লো। শুরু হলো নিষ্ঠুরভাবে বাঙালী হত্যা সঙ্গে চললো সরকারি বেসরকারী ঘরবাড়ি ধ্বংস , গৃহে অগ্নিসংযোগ , মহিলাদের সন্মানহানী। সে রাতে পাকিস্তানি সেনারা যাকে যেভাবে পেয়েছে তাকে সেভাবেই গুলি করেছে। ঢাকা সেদিন সত্যিই আতঙ্কের রাত। সে রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও বহু ছাত্র নিহত হলো। সে রাতেই মুজিবর রহমান গ্রেপ্তার হলেন। পরদিন অর্থাৎ ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হলো। শুরু হলো দেশজুড়ে আন্দোলন। দেশের সর্বশ্রেনীর মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়লো। ছাত্র থেকে শুরু করে কৃষক , শ্রমিক কেউই এ আন্দোলন থেকে পিছিয়ে যায়নি সেদিন। গড়ে উঠল মুক্তিবাহিনী , শুরু হলো গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ । এই সময় বহু মানুষ জীবন বাচাবার তাগিদে ভারতবর্ষে আশ্রয় গ্রহণ করে। ২৭শে মার্চ ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী মুক্তি যুদ্ধকে সমর্থন জানালেন । কূটনৈতিক ,সামরিক , অর্থনৈতিক সবদিক থেকেই ভারতবর্ষ সাহায্যের হাত এগিয়ে দিলো। নভেম্বরে গঠিত হলো মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ড । একে একে পাকিস্তানী ঘাটির পতন ঘটতে লাগল। দীর্ঘ নয় মাসব‍্যাপী চলা এই যুদ্ধ অবশেষে পূর্ণতা পেল ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দে। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ৯৩০০০ পাকিস্তানী সৈন্য আত্মসমর্পণ করলো। ঘরিতে তখন বিকেল ৫টা  ১ মিনিট, পাকিস্তান আত্মসমর্পণের দলীলে স্বাক্ষর করলো। লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগে বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম‍্য রাষ্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধ জয়ী হলো। বাংলাদেশ আজ অনেকটাই উন্নতির পথে। জাতীয় জীবনের অনেক বাধাই সে কাটিয়ে উঠেছে। আরো উন্নতি করুক আমার বাবা মায়ের ফেলে আসা এ জন্মভূমি। 

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের কবি



মন্তব্য