kalerkantho


যশোরের তিন বিদেশি মুক্তিযোদ্ধার কথা

ফখরে আলম    

২৫ মার্চ, ২০১৮ ১৪:৩৫



যশোরের তিন বিদেশি মুক্তিযোদ্ধার কথা

বাংলাদেশের জন্য ভারতীয় সৈন্যরা যুদ্ধ করেছেন। মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘মুক্তিযুদ্ধের  ইতিহাস’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, একাত্তরে দুই লাখ পঞ্চাশ হাজার ভারতীয় সৈন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেন। সালাম আজাদের ‘কন্ট্রিবিউশন অফ ইন্ডিয়া ইন দি ওয়ার অফ লিবারেশন অফ বাংলাদেশ’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়,  এক হাজার ৫০০ জন ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। প্রতিবেশী দেশ ভারত পূর্ব পাকিস্থানের মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করে। পাশাপাশি হাতে গোনা কয়েকজন বিদেশি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। একাত্তরে সেই বিদেশি মুক্তিযোদ্ধাদেরও ত্যাগের শেষ নেই। এদের মধ্যে একজন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যে প্রাণও দিয়েছেন। বিদেশি মুক্তিযোদ্ধাদের গল্প আমাদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে। এখানে আমাদের যশোরের তিন বিদেশি মুক্তিযোদ্ধার কথা কথাই বলছি। সেই উত্তাল সময়ে তারা যশোরে কর্মরত ছিলেন। 


শহীদ মোহাম্মদ আলী বীর প্রতীক


মোহাম্মদ আলীর বাড়ি ছিল প্রতিবেশী দেশ ভারতের মাদ্রাজ। তিনি বাংলায় কথা বলতে পারতেন না। কিন্তু বাংলাকে ভালোবেসে ছিলেন। বাংলার জন্যে জীবন উৎসর্গ করেই বীর প্রতীক খেতাব পেয়েছেন। দুঃসাহসী এই মুক্তিযোদ্ধা কোথায় শহীদ হয়েছেন, কোথায় তাঁর সমাধি? দীর্ঘ ৪০ বছরেও তা জানা যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের গবেষক জাহিদ রহমান ও মেজর অবসরপ্রাপ্ত ওয়াকার হাসান বীর প্রতীক একাত্তরের খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গবেষণা করেছেন। তারাই জানতে পারেন, মোহাম্মদ আলী বান্দরবানে পাকিস্থানী বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন। সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে। অবশেষে ৪০ বছর পর স্বজনরা মোহাম্মদ আলীর কবরের সন্ধান পেয়েছেন। যশোরের রসুলপুর গ্রাম থেকে বান্দরবানে ছুটে গিয়েছেন। কবর জিয়ারত করে বীর প্রতীক এই মুক্তিযোদ্ধার জন্যে প্রার্থনা করেছেন।
 
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর জীবিকার অন্বেষণে মোহাম্মদ আলী তাঁর দুই বন্ধুকে নিয়ে ভারতের মাদ্রাজ থেকে পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। এরপর সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। যশোর সেনানিবাস হয় তাঁর কর্মস্থল। সদর উপজেলার রসুলপুর গ্রামে ছোটখাটো একটি বাড়িও নির্মাণ করেন। ১৯৭১ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সুবেদার মেজর ছিলেন। তাঁর কর্মক্ষেত্র ছিল চট্টগ্রাম। ২৫ মার্চ রাতে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি কর্মকর্তা ও সৈনিকরা মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এ সময় অবাঙালি পাকিস্থানী সৈন্য মোহাম্মদ আলী বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্যে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চান। কিন্তু অবাঙালি বলে কর্মকর্তারা তাকে নিতে চাননি। এক পর্যায়ে প্রবল আগ্রহের কারণে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে সক্ষম হন। এরপর তিনি মেজর জিয়াউর রহমান ও মেজর শওকত আলীর নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কয়েকটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। একাত্তরের এপ্রিলে বান্দরবানে পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে মোহাম্মদ আলী অংশ নেন। তিনি এই যুদ্ধে বীরত্ব দেখান। এক পর্যায়ে শহীদ হন। মোহাম্মদ আলীর সঙ্গীরা তাঁকে রণাঙ্গনেই সমাহিত করেন। কিন্তু তাঁর কবরটি তখন চিহ্নিত করে রাখা হয়নি। ৪০ বছর পর মুক্তিযুদ্ধের গবেষক জাহিদ রহমান ও মেজর অবসরপ্রাপ্ত ওয়াকার হাসান বীর প্রতীকের সহায়তায় স্বজনরা মোহাম্মদ আলীর কবরের সন্ধান পান। মোহাম্মদ আলীর ২ ছেলে ও ৪ মেয়ে। বড় ছেলে আবদুর রাজ্জাক জনতা ব্যাংকে চাকরি করেন। ছোট ছেলে আবদুল হামিদ কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। 

আবদুল হামিদ বললেন, ‘আমার বাবা একাত্তরে চট্টগ্রামে শহীদ হয়েছেন বলে জানতাম। কিন্তু কোথায় বাবার কবর তা আমরা জানতে পারিনি। মাগুরার শ্রীপুরের শহীদ নায়েক আবদুল মোতালেব বীর বিক্রম এর ছেলে হাসান মিয়া আমাকে প্রথম জানান যে, বান্দরবানে আমার বাবার কবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। এরপর আমি, বড় ভাই ও দুই ভগ্নিপতি বান্দরবানে ছুটে যাই। সেখানে গিয়ে দেখতে পাই বাবার কবর সনাক্ত করা হয়েছে। আমরা কবর জিয়ারত করেছি। বাবার জন্য কেঁদেছি। আমার বাবা বাংলায় কথা বলতে পারতেন না। তিনি মাদ্রাজ থেকে এসেছিলেন। তিনি এদেশকে ভালবেসে এদেশকে স্বাধীন করার জন্যে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছেন। জীবন দিয়েছেন। এজন্যে আমরা গর্ব অনুভব করি। আমি শহীদ বীর প্রতীকের সন্তান- এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে?’ 


ওডারল্যান্ড বীর প্রতীক 

 

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিদেশিদেরও গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের সংগ্রামে তাঁরাও প্রাণবাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের নানারকম সহায়তা করার জন্যে এগিয়ে এসেছেন। এমনই একজন মুক্তিযোদ্ধা ডব্লিউ এস ওডারল্যান্ড। তিনি তাঁর বীরত্বের জন্য বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। তিনি ঢাকার টঙ্গী ও গাজীপুর এলাকার পাকসেনাদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। ওডারল্যান্ডের জন্ম আমষ্টারডামে। তিনি মূলত সৈনিক ছিলেন। ১৯৩৬ সালে ওলন্দাজ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে তিনি হাতে অস্ত্র তুলে নেন। ১৯৪১ সালে ডাচ মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়ে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। এরপর চাকরি সূত্রে বাটা কম্পানির এমডি পদে কর্মরত থেকে ১৯৭১ সালে এদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের কম্পানির গোপনস্থানে নিয়ে গিয়ে গেরিলা প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাদের খাবার সরবরাহ, আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি সব ধরনের সহায়তা প্রদান করেছেন। এমনকি তিনি ঢাকার সোনানিবাসে গিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করেছেন। 

এই বীরযোদ্ধা সম্পর্কে বাটার অবসরপ্রাপ্ত দুজন কর্মকতা মাহাতাবউদ্দিন ও নিয়ামউদ্দিন বলেন, ‘ওডারল্যান্ড আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। প্রথমদিকে বিদেশি নাগরিক হওয়ার সুবাদে তিনি সেনানিবাস থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সরবরাহ করতেন। পরে তিনি নিজেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।’ ওই সময় বাটার অন্য কর্মকর্তা কর্মচারীদের যুদ্ধ করার জন্য তিনি উৎসাহ দিয়েছেন। সংগঠিত করেছেন। নিজের যুদ্ধবিদ্যা কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের পরাজিত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য অর্জন করেছেন বীর প্রতীক খেতাব। বিদেশি এই মুক্তিযোদ্ধা ২০০১ সালের ১৮ মে অষ্ট্রেলিয়ার পার্থের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 


ফাদার মারিনো রিগন 


বিদেশি মুক্তিযোদ্ধা ফাদার মারিনো রিগন ১৯২৫ সালে ইতালির ভেনিস শহরে জন্মগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে রিগন পুরোহিতের দীক্ষা নিয়ে ১৯৫৩ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের যশোরে আসেন। এরপর যশোর, মেহেরপুর, ফরিদপুর জেলার বিভিন্ন চার্চে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে ফরিদপুরের বানিয়ারচকে দায়িত্ব পালন করার সময় রিগন তাঁর সহকর্মী ডাক্তার লক্ষ্মীবাবু, সিস্টার ইমেলদাকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতাল খুলে যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করেছেন। 

রিগন বলেন, ‘ফরিদপুরের মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত বাহিনীর প্রধান হেমায়েত গুলিবিদ্ধ হলে তাঁর অপারেশনের ব্যবস্থা করেছি। মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্থানী সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে আহত হয়েছেন। আমি আহত মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে চিকিৎসা সেবা দিয়েছি। তাদের খাবারের ব্যবস্থা করেছি। যুদ্ধে যাবার উৎসাহ যুগিয়েছি। ’ 

তাঁর কাছ থেকে আরো জানা যায়, মৎস্যজীবীদের নৌযানে তিনি বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন। যুদ্ধের সময় নৌযানের নাম রাখেন ‘সংগ্রামী বাংলা’। মুক্তিযোদ্ধাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে অন্য একটি নৌযানের নাম রাখেন ‘রক্ত বাংলা’। দেশ স্বাধীন হলে এটির নাম রাখেন ‘স্বাধীন বাংলা’। রিগন বললেন, ‘দীর্ঘদিন এদেশে বসবাস করে এদেশকে ভালোবেসেই আমি স্বাধীনতার জন্য লড়েছি। আমি বাঙালির দুর্জয় সাহস দেখেছি। পাকিস্থানীদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়িয়েছি।'

লেখক : কবি ও সাংবাদিক


মন্তব্য