kalerkantho


।।সীমানা পেরিয়ে আরেক থানায় যাওয়া খুবই আইনগর্হিত, অনধিকার চর্চা।।

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৫ এপ্রিল, ২০১৮ ১৭:২৭



।।সীমানা পেরিয়ে আরেক থানায় যাওয়া খুবই আইনগর্হিত, অনধিকার চর্চা।।

এটা আমার একটি ব্যর্থতার ঘটনা। ০৪ এপ্রিল (বুধবার) সকালে ছোট মেয়েটাকে স্কুলে দিয়ে বাসায় ফিরছি। বাংলাদেশ মেডিকেলের সামনে দিয়ে সাতমসজিদ রোডে উঠতে গিয়ে হৈ চৈ শুনি। পাশ দিয়ে যেতে থাকা একজন বললেন, লাফিয়ে পড়েছে ওপর থেকে, লোকজন বলছে- ‘পাগল’। গৃহকর্মী হবে হয়তো। কে জানে কেন লাফ দিয়েছে....

ডানে ফিরে তাকিয়ে দেখি অনেক লোক দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে। সাত মসজিদ রোড কর্পোরেট শাখা রূপালী ব্যাংকের পাশে ম্যাপল লিফ স্কুলের একতলার টিনের ছাদে এক নারী বসে আছে (১নং ছবি, লাল গোল চিহ্নিত স্থানে মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছে)। ২/৩ জন লোক জোরের সঙ্গেই বলছে ‘পাগল’।

আমার মনে হলো, কোনো কারণে (সাংবাদিকসুলভ সন্দেহ) মেয়েটিকে পাগল বানানোর চেষ্টা করছে এরা। সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল বের করে ছবি তুলতে যাই, তখন মেয়েটি কিছুটা আড়ালে চলে যায়। আমি এগিয়ে গিয়ে সিকিউরিটি গার্ডকে বলি, ওকে নামানোর ব্যবস্থা করেন তাড়াতাড়ি, নয়তো...

স্কুলে প্রবেশরত অভিভাবক-স্টুডেন্ট আর শিক্ষক-কর্মচারীদের সামলাতে থাকা সিকিউরিটি গার্ড হোমরা-চোমরা মুডে জবাব দিলেন, নামানো হবে, পরে।

বুঝলাম নামী-দামী লোকজন সামলাতে অভ্যস্ত লোকটির কাছে আমার কোনো স্থান নেই। মেয়েটির চোখে আতঙ্কিত দৃষ্টি দেখলাম। এবার আমি দূরে সরে গিয়ে ভিডিও নেওয়ার চেষ্টা করি। মনে পড়ে যেতেই ৯৯৯ নম্বরে ফোন দেই। তারা ধানমণ্ডি মডেল থানায় ফোন মিলিয়ে দেয়। আমি সংক্ষেপে বিষয় বর্ণনা করে তাড়াতাড়ি সাহায্যের অনুরোধ করি। তাদের জানাই কেউ কেউ পাগল দাবি করলেও মেয়েটি হয়তো পাগল নয়। কোনো কারণে নিরূপায় হয়ে লাফিয়ে পড়েছে। এখন দ্রুত উদ্ধার না করলে ফের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। হয়তো পড়ে মারাই যাবে।

ও প্রান্ত থেকে ঘটনাস্থলের ঠিকানা, রাস্তা-মোড়, বাড়ির নম্বর সব জিজ্ঞেস করা হলো। আমার অস্থিরতা দূর করতে জানালেন, দ্রুতই পুলিশ আসতেছে ঘটনাস্থলে।

ইতোমধ্যে আওয়াজ শুনি মেয়েটাকে নামানো হচ্ছে, বিল্ডিংয়ের পেছন দিয়ে। আমিসহ কয়েকজন এগিয়ে যাই সাতমসজিদ রোডে, ডানে মোড় নিয়েই রূপালী ব্যাংকের পরেই আরেকটি স্কুল- আসসামাওয়াত নামের। সেখান দিয়ে মেয়েটিকে (বা বলতে পারেন আপদ) নামানো হয়েছে। দূর থেকে দেখলাম মাটিতে বসে আছে মেয়েটি নিজের বাম পাটি ডান হাতে ধরে। সামনে এগিয়ে গেলাম, কোনো কথার জবাব দিল না, শুধু ইশারায় পানি চাইলো। পানি কেউ দেয় না। দূরে দেখি একটি জারে খাবার পানি আছে, গ্লাসও আছে পাশে। দৌড়ে গেলাম পানি আনতে। একজন বাঁধা দিল- এইটাতো খাবার পানি!

বল্লাম, খাবার পানিই তো দরকার, পানি খাওয়াতে হবে। এসময় সদাশয় এক নারী (সম্ভবত স্কুলের আয়া) এক গ্লাস পানি ঢেলে দিলেন। সেই পানি তাকে খাওয়াতে আরও চাইলো। আরো এক গ্লাস দেওয়া হলো। মেয়েটি কোনো কথা বলছে না, শুধু আতঙ্ক ফেটে বের হচ্ছে তার চেহারা থেকে। স্কুলে বাচ্চা নিয়ে আসা কয়েকজন নারী অভিভাবকও ছিলেন সেখানে। তাদের কোনো কথায়, আশ্বাসবাণীতেও মুখ খুলছে না সে। তাকে স্কুল থেকে দুজন নারী হাত ধরে বের করে আনলেন। বাম পায়ে ল্যাংড়াচ্ছিল সে। কপাল ফোলা, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কঠিন আঘাত পেয়েছে সেখানে। আমি বল্লাম, ওকে কিছু খাওয়াতে হবে আগে, ক্ষুধার্ত বোঝা যাচ্ছে।

দোকান থেকে এক বোতল পানি কেনা হলো, সঙ্গে রুটি কলা। মেয়েটি পানি কিছুটা খেলেও রুটি-কলা নিল না। এসময় সেখানে উপস্থিত এক নারী (গৃহকর্মী) বলছিলেন, মেয়েটিকে তিনি দেখেছেন আগে। পাশের বাসায়। খাবার চেয়ে খেয়েছে এর আগে তার কাছে। আমি আগ্রহ নিয়ে ‘কোন বাসায়’ জানতে চাইলেই মহিলা ইশারা করলেন ব্যাংক ভবনের দিকে কোনো একটি বাসা। এসময় উপস্থিত কয়েকজন দাঁরোয়ান এবং ছোট দোকানদার শ্রেণির লোক ‘ঘেউ ঘেউ’ করে উঠলো, অই মাতারি, ওইটা তো ব্যাংক, বাসা হইলো কই? যত্তোসব... মহিলা ভয় পেয়ে আস্তে করে সরে গেলেন।

আমি যা বুঝার বুঝে নিলাম... সমস্যা এই আশেপাশেই আছে এবং যারা এর পেছনে আছে, তাদের লোকজন এখানে আছে। নিজের পেশাগত পরিচয় কোথাও দেই না (একদম বাধ্য না হলে)। এবার আমি সেটার প্রয়োজন বোধ করলাম। সবাইকে শুনিয়ে মেয়েটিকে বল্লাম, আমি সাংবাদিক! তোমার ভয়ের কিছু নেই। বল, কে তোমার এমন অবস্থা করেছে, কাকে ভয় পাচ্ছো। এখনি পুলিশ আসবে, খবর দিয়েছি (মিনিট পনের হলেও পুলিশ তখনো আসতে পারেনি কোনো কারণে)।

মেয়েটির পরিচয় জানার চেষ্টা করছি এবং খেয়াল করলাম ভীড় যেন একটু পাতলা হয়ে গেল। একপর্যায়ে দেখলাম, আমি একা, মানে আমার পাশে থাকা অন্য লোকজনও সরে গেছেন (দুষ্টগুলি বিপদ মনে করে আর ‘ভালজনেরা’ বিপদ হতে পারে ভেবে)। সামনে শুধু ফুটপাত গুলজার করে রুটি-বিস্কিট-চায়ের দোকান দিয়ে বসা লোকটি (খুব বিরক্ত হচ্ছিলেন আমার ওপর, কেন জানি না) এবং তার কয়েকজন কাস্টমার।

এসময় হঠাৎ মেয়েটি দাঁড়িয়ে হাঁটা ধরলো উদ্দেশ্যহীন। উত্তর দিকে যাচ্ছে, মোহাম্মদপুর মুখী। আমি পানির বোতলটা নিয়ে পিছে হাঁটা ধরলাম। প্রায় ১ কিলো হাঁটলাম তার পিছু পিছু। অনেক থামতে বল্লাম। নাম জিজ্ঞেস করলাম। বুঝতেছিলাম তার সাহায্যের দরকার, আগে হাসপাতালে নেওয়া দরকার। একপর্যায়ে শুধু বললো- আমি কাউরে বিশ্বাস করি না।

২৭ নম্বর পার হলো বেসামালভাবে, আমি দৌড়ে গাড়িগুলোকে ইশারায় থামালাম। কারণ, তার অমন আচরণে হঠাৎ যে কোনো গাড়ির চাপায় পড়তে পারে। সে লালমাটিয়ায় ঢুকে গেল। আমার বাসার পথ পেছনে ফেলে এসেছি। এক মুহূর্ত চিন্তা করে তার পিছু নেওয়া সাব্যস্ত করলাম। অনেক বোঝালাম। রাস্তায় চায়ের দোকানে বসাতে চাইলাম, চা খাও, বিস্কিট খাও... আমি আসলে ফিরে আসতে পারছিলাম না। মেয়েটির অবধারিত অমঙ্গল আশংকায়। বয়স কতো হবে? সর্ব্বোচ্চ ১৬/১৭। আমার নিজের বড় মেয়ের বয়স ১৫ বছর।

এসময় মনে মনে যা চাচ্ছিলাম তা পেয়ে গেলাম। ফুটপাতে পসরা সাজিয়ে বসা নারী চা-ওয়ালি  আমি খুব সংক্ষেপে ৫/৭ শব্দে ঘটনা বয়ান করলাম তাকে। কারণ, আমি অপরিচিত পুরুষ মানুষ বিধায় প্রচুর ঝুঁকি রয়েছে। আর আমার সঙ্গে যারা ছিলেন তারা কেউ নেই এখন। যে কোনো সময় অন্য কিছু ঝামেলা তৈরি হয়ে যেতে পারে যেহেতু মেয়েটি স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। মধ্যবয়সী নারী বিষয় বুঝলেন এবং মা-বোন ডেকে তাকে সেখানে ফুটপাতে বসতে বাধ্য করলেন।

এবার সে মুখ খুললো। যা জানালো তা হচ্ছে- নাম হামিদা। বাড়ি শেরপুরের নকলায়। একদিন আগে ঢাকায় এসেছে কোনো ‘মামার’ সঙ্গে। পাঠিয়েছে সৎ মা। আপন মা নেই। বাপ-ভাই আছে। আরও জানা গেল, একটি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে সেখানে (বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায়) আনা হয়েছে। 
তার ভাষায়, সে জান বাঁচাতে কোনো মতে পালিয়েছে। কী হয়েছে তার ওপর- এই প্রশ্নের জবাব দিল না। পুলিশ আসতেছে তাকে উদ্ধারে একথা বলতেই ফের আতঙ্কিত হয়ে উঠলো। বললো, পালিয়ে সে প্রথমে পুলিশ দেখে তাদের কাছে গিয়েছিল, তারা তাকে পাগল বলে ভাগিয়ে দিয়েছে। বুঝলাম, তার কথিত মামার সঙ্গীরা এই কাজ করেছে।

আরো জানালো, সে পালিয়ে রাস্তা না পেয়ে গাছে উঠে গিয়েছিল (সম্ভবত পাকড়াও করে নিয়ে যেতে পেছনে লোকজন আসছিল)। এরপর গাছ থেকে লাফ দেয় (অর্থাৎ ছাদ থেকে নয়, গাছ থেকে লাফ দিয়েছে সে)। যে বাড়িতে তাকে রাখা হয়েছিল, সেখান থেকে সিঁড়ি দিয়েই রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিল।

একপর্যায়ে জানালো সে দেশে যেতে চায়। মহাখালী গেলেই সোনারবাংলা বাসে শেরপুরে যেতে পারবে। ভাড়া আছে? জবাবে বললো ভাড়া লাগবে না, বাসওয়ালাদের বললে নিয়ে যাবে এমনিতে।

মেয়েটির ফুলে ওঠা কপাল জানান দিচ্ছিল, তার অবস্থা ভাল নয়, চিন্তা-ভাবনা করতে সমস্যা হচ্ছে। বাম পা এবং বাম হাতেও সমস্যা রয়েছে।

পুলিশে তার আতঙ্ক দেখে বল্লাম, ভয় নেই। ফের বল্লাম, তোমার শেরপুরের দেশি ভাইয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলিয়ে দেই, তাকে তোমার সমস্যার কথা বলো। ফোন দিলাম শ্রদ্ধেয় বন্ধু শেরপুরের নামী সাংবাদিক কালের কণ্ঠ প্রতিনিধি হাকিম বাবুলকে। তাঁকে বিষয় খুলে বল্লাম। হাকিম বাবুলের সঙ্গে কথা বলে মেয়েটি জানালো, হ্যাঁ, তাদের চেয়ারম্যান ও এলাকার লোককে চেনেন তার দেশি সাংবাদিক সাহেব। 

তবে হাকিম আমাকে জানালেন, দেশে ফিরে তো আবার সৎ মায়ের খপ্পরে পড়তে পারে (যদি তার কথা সঠিক হয়ে থাকে)। সেক্ষেত্রে... মেয়েটি তারপরেও জানালো সে দেশেই যাবে।

এসময় পাশে জড়ো হওয়া একজন আমাকে বুদ্ধি দিলেন- স্যার, ওর নিজের বাপ ভাইয়ের নম্বরে ফোন দিতে কন। ভাল পরামর্শ। বলতেই আমার হাত থেকে ফোন নিয়ে মেয়েটি নিজেই নম্বর ডায়াল করলো। এসময় স্মার্টফোন চালনায় তার দক্ষতা আর ক্ষিপ্রতা সবার নজরে পড়লো। ঠিক ক্লাস নাইন-টেনের ছেলে-মেয়েরা যেভাবে অনায়াস স্বাচ্ছন্দে এই ডিভাইসটি ব্যবহার করে ঠিক সেভাবে সে পরপর দুটি নম্বরে ফোন দিল। তবে পেল না কোনোটাকেই।

হতাশ হয়ে ফোন ফিরিয়ে দিয়ে বললো- পুলিশ তাগোরে ভয় দেখাইছে (তার এই কথার মানে কেউ বুঝলাম না)। সিএনজি স্কুটার ঠিক করা হলো- বোঝানো হলো ড্রাইভারকে যেন সোনারবাংলা বাস কাউন্টারে নামিয়ে দেয়। ভাড়া ১৮০ টাকা। অন্য কারও কাছে হইলে নাকি আড়াইশ নিত। যাহোক, আমার কাছে থাকা টাকা মেয়েটিকে দিলাম জোর করে। সিএনজি ভাড়া দিয়ে যা থাকবে তা দিয়ে পথে খাবার খেও।

কিন্তু এবার নয়া সমস্যা- সে সিএনজিতে উঠবে না। বাসে চড়ে যাবে। কেন? কারণ, বাসে অনেক লোক থাকে তাই সমস্যা হবে না বলে মনে করছে সে। সিএনজিওয়ালা আমাদের অনুরোধে অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর চলে গেলেন।

পাশে কয়েকজন ড্রাইভার ও অন্যান্য মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন। তারা অনেক বোঝালেন- মেয়েটি অন্য কাউকে সহ্য করতে পারছে না। বলছে, সে কাউকেই আর বিশ্বাস করে না। আমার কষ্ট এটাই লাগছিল- দুনিয়ায় এই বিশ্বাসটা কেউ তাকে দিতে পারছে না যে, সবাই এক ব্যান্ডের রেডিও নয়! একজন এই কথাটা তাকে বললোও। পাশ দিয়ে যেতে থাকা সুবেশি অফিসগামী এক নারীও বিষয়টি জেনে তাকে বোঝাত চাইলেন। না কাজ হলো না। আমি বললাম, তুমি ঢাকায় থাকতে চাইলে ভাল কোনো বাসায় দিয়ে দেব, সব মানুষ খারাপ না। আরামে থাকতে পারবে, আমি নিশ্চিত করবো। না, সে আসলে কাউকেই বিশ্বাস করে না।

আমার অফিস আছে। নিজে কিছুটা অসুস্থ। কয়েকজন বললেন, আপনি যথেষ্ট করেছেন, এবার যান। আমি তাদের অনুরোধ করে এলাম, কোনোমতে বুঝিয়ে একটা সিএনজিতে তুলে দিতে হামিদাকে (যদি নাম তাই হয়ে থাকে)।

ব্যর্থ মনোরথে ফিরে এলাম, ২৭ নম্বরে উঠতেই ফোন। একজন এসআই সাহেব ফোন দিয়েছেন ( ঘটনার পর থেকে এক ঘণ্টার বেশি হয়ে গেছে ততক্ষণে প্রায়)। বললেন, তিনি আমার কথিত ঘটনাস্থলে গিয়ে কিছুই পাননি। আমি ঘটনা বয়ান করলাম এবং দুঃখ প্রকাশ করে বল্লাম, মেয়েটি হয়তো চলে গেছে। আমি জেনেটিক প্লাজার পেছনে লালমাটিয়ায় তাকে ছেড়ে এসেছি। তবে তিনি যদি মিনিট দুয়েক অপেক্ষা করেন আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি ফের সেখানে গিয়ে। 
তিনি রাজি হলেন। আমি দৌড়ে গেলাম, দেখি মেয়েটি তখনো সেখানে আছে। পুলিশ সাহেবকে ফোন দিলাম, তিনি ফের ঠিকানা জানতে চাইলেন। ২৭ নম্বরের পশ্চিম পাশের গলি, লালমাটিয়া- বলতেই তিনি বললেন, ওহ্! আপনি তো এখন মোহাম্মদপুর থানায় চলে গেছেন, এটাতো আমাদের সীমার বাইরে!

আমি অসহায় ভঙ্গিতে বলি, ভাই, আমি তো দেড় ঘণ্টা ধরে এটা নিয়ে আছি। আপনারা একটু না হয় এগিয়ে আসলেনই, ঘটনা তো ধানমন্ডিতেই শুরু হয়েছিল। তিনি কী বললেন জানি না, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

এরপর আরও আধা ঘণ্টা আমি চেষ্টা করি মেয়েটিকে সিএনজিতে তুলে দিতে, কিন্তু তার ভেতরকার আতঙ্ক তাতে সায় দিচ্ছিল না। সে চায়, ওইখান থেকেই তাকে শেরপুরের বাসে তুলে দেওয়া হোক। এটা কীভাবে সম্ভব!

হাকিম বাবুলকে বলেছি, উনি মেয়েটি শেরপুরে পৌঁছালে সব ধরনের সহায়তা করবেন, প্রয়োজনে অর্থ সাহায্য করবেন। শেষতক এক তরুণ রিক্সাওয়ালা আমার সঙ্গে ছিলেন (দুঃখজনকভাবে চেহারা সুরত ছিনতাইকারীদের মতো)। তিনি অনেকটা দাবি নিয়ে মেয়েটিকে ধমক লাগালেন। একপর্যায়ে বললেন, সবাই খারাপ না। এই লোকটি এতক্ষণ ধরে আছে তোমার সঙ্গে, তোমার ভালর লাইগাই তো (এতে আমার সন্দেহ আরো বেড়ে গেল। কারণ, রিক্সাওয়ালা যা বুঝতেছে পুলিশ ভাইটি তা বুঝতেছে না)! সে বলে চললো- হে হের পকেটের সবগুলো টাকা (আড়াইশর কিছু বেশি) তোমাকে দিয়ে দিয়েছে...

একথা বলতেই মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে টাকাগুলো ফেরত দিয়ে দিতে চাইলো। আমরা দুজনেই ধমকে উঠলাম।

এরপর রিক্সাওয়ালা আমাকে জোর করলো, স্যার আপনি এইবার যান। অনেক হইছে, হে যা করার করুক গা...

আমি অন্য সন্দেহ করলাম, লালমাটিয়া থেকে মিরপুর রোড ও মানিক মিয়া এভিনিউর মুখের মোড়ে তখন আমি, ওই মেয়েটি আর রিক্সাওয়ালা। আমি সরে যেতেই না আবার রিক্সাওয়ালা তাকে ফুসলিয়ে...

রিক্সাওয়ালাকে বললাম, তুমি আমাকে আমার বাসায় দিয়ে আস, প্লিজ। আমার সঙ্গে ভাড়া নেই, বাড়ি গিয়ে দেব... রিক্সাওয়ালা বিনা বাক্য ব্যয়ে রাজি হলো। আমি মনে মনে কিছুটা বিব্রত হলাম। কতো সুন্দর অভিজাত মুখওয়ালা মানুষ পিশাচের মতো চুষে খাচ্ছে দেশের মানুষের রক্ত, বিবেক, বিশ্বাস, আস্থা। আর ছিনতাইকারী টাইপের চেহারার রিক্সাওয়ালা বেটা তো মনে হচ্ছে, রীতিমতো ভদ্দরলোক!

আশা করছি সকালে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে ঘটা ওই ঘটনা কেন্দ্রিক আমার সব আশংকা ভুল হোক। পুলিশের কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। ভয়াবহ জাম আর পথের ঝামেলা এড়িয়ে এক থানার সীমানা পার হয়ে আরেক থানায় যাওয়া খুবই আইনগর্হিত আর অনধিকার চর্চার কাজ হয়ে যাবে। দয়া করে উর্দ্ধতনদের কেউ এই বিষয় নিয়ে খোঁজ-খবর করতে যাবেন না যেন।

এতবড় এই লেখা আসলে কাউকে ঠিক পড়ানোর উদ্দেশ্যে না- নিজের মনের ভার লাঘবের জন্যই এই রাত জেগে... আর অবিশ্বস্ত হওয়া সত্ত্বেও ফেসবুকেই পোস্ট দিলাম। কারণ, আমি শুধু মেয়েটির অমঙ্গল আশংকায় এবং সমূহ বিপদ থেকে তাকে রক্ষার চেষ্টায়ই ওই পাগলামি করেছি। কে যেন কিছুদিন আগে বলেছিলেন, শেরপুরসহ কয়েকটি অঞ্চল থেকে কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গের জন্য সহজ-সরল বা গরীব মানুষকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে আসে একটি চক্র... আশা করি আমার এই ধারণাও ভুল হবে...

[ছবিগুলো অনেক চিন্তা করে দিলাম। মেয়েটির ভবিষ্যতের কোনো ক্ষতি হবে (যদি বেঁচে থাকে) এই বিবেচনায় দিতে চাইনি। কিন্তু তাকে এবং তার মতো এমন ঘটনার শিকারদের বাঁচাতে হলে স্বজন বা দেশের সুধীজনদের কাছে এমন ছবি দেখানো দরকার। তাই দিলাম। যদি শেখ হাসিনার মতো ক্ষমতাবান কোনো মহৎ হৃদয় নড়ে উঠে মেয়েটির জন্য... তাহলে হতাশ ব্যর্থ অন্তরে কিছুটা শান্তি পাবো] (আহ্‌সান কবীর)

সাংবাদিক ও লেখক আহ্‌সান কবীরের ফেসবুক পোস্ট থেকে


মন্তব্য