kalerkantho


সেকায়েপের শিক্ষকদের স্থায়ী করতে অনীহা কেন?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৮ মে, ২০১৮ ১১:৫১



সেকায়েপের শিক্ষকদের স্থায়ী করতে অনীহা কেন?

লেখার শুরুতেই আজ পাঠকদের উদ্দেশে একটা প্রশ্ন ছুড়ে দেব। প্রশ্নটি হলো, বলুন তো গত ১০ বছরে দেশের শিক্ষাখাতে সবচেয়ে বড় সাফল্য কী? 

প্রশ্নটি দেখে নিশ্চয় উত্তর দেয়ার জন্য উদগ্রিব হয়েছেন। হয়তো মাথা চুলকিয়ে চিন্তাও করছেন। থাক উত্তরটা আমিই বলছি, গত ১০ বছরে শিক্ষাখাতে দুটি সাফল্য আমার চোখে পড়ে। এক. বছরের শুরুর দিনে শিক্ষার্থীদের বিনে পয়সায় বই দেয়া (যদিও গেল বছর টিআইবি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের স্তরে স্তরে দুর্নীতির চিত্র দেখিয়েছে)। দুই. স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোয় কয়েক হাজার একাডেমিক ভবন নির্মাণ।  

এবার যদি গত ১০ বছরে শিক্ষাখাতের ব্যর্থতা সম্পর্কে জানতে চাই, তাহলে হয়তোবা কাউকেই মাথা চুলকিয়ে উত্তর দেয়ার প্রয়োজন হবে না। কেননা, আমাদের শিক্ষাখাত এতোটাই ব্যর্থতায় জর্জরিত যে, কোনটা রেখে কোনটা বলবেন অনেকে হয়তো তা ভেবেই পাচ্ছেন না। মোটাদাগে কয়েকটি ব্যর্থতার চিত্র যদি তুলে ধরি, তাহলে শুরুতেই বলতে হয় প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষা এমনকি দ্বিতীয় শ্রেণীর সাময়িক পরীড়্গার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হতে আমরা দেখেছি। এরপরেই রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পিইসি ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট জেএসসির মতো অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা আয়োজনের বিষয়টি। যার মাধ্যমে আমাদের অভিভাবকরা বাধ্য হয়েছেন তার প্রিয় সোনামনিটাকে কোচিংমুখী করতে। 

এ ছাড়া শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের আগেই চালু করা হয়েছে সৃজনশীল পদ্ধতি। আমি এমন বহু শিক্ষককে দেখেছি যারা সৃজনশীল পদ্ধতিতে স্কুলের সাময়িক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করতে না পেরে যেসব শিক্ষক প্রশ্নপত্র তৈরি করতে পারেন-তাদের দ্বারস্থ হতে। 

পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের ৮ বছর পার হতে চললেও তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি শিক্ষক নিয়োগ কমিশন ও স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার নীতিমালা। যার ফলে মেধার ভিত্তিতে নয় বরং ক্ষমতা আর অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ হচ্ছে শিক্ষক। আর নীতিমালা না থাকার কারণে হাটে বাজারে গড়ে উঠছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। লেখাপড়ার মান এবং ছাত্র-ছাত্রী কম থাকলেও কলাগাছের মতো রাতারাতি গজে ওঠা এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোই পরবর্তীতে এমপিওভুক্তকরণের আন্দোলন শুরু করে। অথচ প্রয়োজনের ভিত্তিতে সরকার যদি নিজেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতো তাহলে জাতিকে এমন অবস্থার সম্মুখিত হতে হতো না।  

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় জাতীয় শিক্ষা আইন এখনো মন্ত্রিসভাতেই ওঠাতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অথচ শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ আমাকে গেল সেপ্টেম্বরেই জানিয়েছিলেন যে, নভেম্বরেই জাতীয় শিক্ষা আইন মন্ত্রিসভায় উঠবে এবং শীতকালীন অধিবেশনে আইনটি পাশ হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো নভেম্বর পার হলো, শীতকালীন অধিবেশন পার হলো, এমনকি ২০১৭ সাল শেষ হয়ে ২০১৮ এলেও কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা আইন স্বপ্নই থেকে গেল। 

এ ছাড়া আমরা রাজনৈতিক পরিচয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদের চিত্র দেখেছি। সেই সাথে দেখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজিতে মাত্র ২ জন শিক্ষার্থীর পাশ করার বিষয়টি। আর পাবলিক পরীক্ষাগুলোয় অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থীর পাশ করা এবং জিপিএ ৫ অর্জনের বিষয়টি না হয় বাদই দিলাম। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে। শিক্ষাখাতে হাজারো ব্যর্থতার দায়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগেরও দাবি উঠতে দেখেছি। যদিও তিনি আজও মন্ত্রীর নরম গদিতেই বহাল তবিয়তে রহিয়াছেন। 

এবার লেখার মূল বিষয়ে আসি। শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে যখন দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে, ঠিক তখন ২০১৫ সালে সরকার মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আনার উদ্যোগ নেয়। সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি এন্ড অ্যাকসেস এনহেন্সমেন্ট প্রজেক্ট বা সেকায়েপ নামক একটি বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে আকর্ষণীয় বেতনে সারা দেশের প্রায় ৩ হাজার স্কুলে ৫ হাজার ২শ জন মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। এ বিষয়ে গত ২১ জানুয়ারি ‘শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে সেকায়েপের শিক্ষকদের স্থায়ী করুন’ শিরোনামে কালের কণ্ঠ অনলাইনে একটি নিবন্ধও লিখেছিলাম। 

মূলত গণিত, ইংরেজি এবং বিজ্ঞান বিষয়ে অতিরিক্ত শ্রেণী শিক্ষক (এসিটি) হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এসব শিক্ষকদের অধিকাংশই দেশের নামকরা কলেজ এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা করেছেন। নিয়োগের সময় মন্ত্রণালয় থেকে এসব শিক্ষকদের প্রকল্পের মেয়াদ শেষে অন্য প্রকল্পে স্থানান্তর অথবা এমপিওভুক্তি করে চাকরি স্থায়ী করার কথা বলা হয়েছিল। এমনকি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এসব শিক্ষকদের হাতে যে ওরিয়েন্টশন সহায়িকা দেয়া হয়েছে তার ২৬ পৃষ্ঠার ক ধারায় বলা হয়েছে, ‘জাতীয় বেতন স্কেল অনযায়ী এসিটিদের মূল বেতন ও অন্যান্য ভাতাদি প্রদান করা হবে এবং এটি ভবিষ্যতে এমপিও পদ্ধতিতে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে সেকায়েপ গৃহিত পদক্ষেপের স্থায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা হবে।’ 

শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য নিয়োগ পাওয়া এসব শিক্ষক প্রকৃত অর্থে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে কতটা অবদান রাখছে-তা আমি গেল জানুয়ারিতে সরেজমিনে কয়েকটি স্কুল পরিদর্শনের মাধ্যমে দেখেছি। ২১ জানুয়ারিতে প্রকাশিত ওই নিবন্ধে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চাঁপাইর বি বি উচ্চ বিদ্যালয়ের বদলে যাওয়ার চিত্রসহ আশেপাশের বেশকয়েকটি বিদ্যালয়ের অভূতপূর্ব সাফল্য তুলে ধরেছি। যে বিদ্যালয়গুলোতে ক’বছর আগেও শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল সাড়ে তিনশ/চার’শ, ঝরে পড়ার হারও ছিল লক্ষনীয়। সেসব বিদ্যালয়ে এসিটি শিক্ষকরা মাত্র দুই বছরে বিদ্যালয়গুলোকে বদলে দিয়েছে। ওইসব বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থী সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার পাশাপাশি অভিনব পাঠদানের কারণে পরীক্ষায় অকৃতকার্যের সংখ্যা এবং কোচিংয়ে যাওয়ার হারও কমে গেছে। সেই সাথে শিক্ষার্থীদের মন থেকে চলে গেছে বিজ্ঞান ভীতিও, ফলে স্কুলগুলোর বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। 

কিন্তু এসব সেকায়েপ শিক্ষকদের প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়ে গেছে। নিয়োগের সময় এমপিওভুক্তি করা কিংবা অন্য প্রকল্পে স্থানান্তরের কথা বলা হলেও মেয়াদ শেষ হওয়ার ৪ মাস পার হতে চললেও এ ব্যাপারে এখনো কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ফলে দুশ্চিন্তায় দিন পার হচ্ছে ৫ হাজার ২শ এসিটির। যাদের প্রায় সবারই সরকারি চাকরির বয়স শেষ হয়ে গেছে। চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয় এমপিওভুক্তির কথা উল্লেখ করায় প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও এসব শিক্ষকদের কেউই অন্য পেশায় না গিয়ে বেকার দিনযাপন করছে। অথচ এসিটি সমাজে এমন মানবিক বিপর্যয় ঘটে গেলেও মন্ত্রণালয় এখনো কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। 

পেশাগত কারণে আমি বিষয়টি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসেনের নজরে নিয়ে আসি। সোহরাব হোসেন আমাকে একাধিকবার জানিয়েছেন, ‘এসিটিদের স্থায়ী করার ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের মনোভাব ইতিবাচক। আমরা তাদের কাছ থেকে উপকৃত হয়েছি, তাদের (এসিটিদের) আমরা ছাড়বো না। আমরা চাচ্ছি তাদের সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম এসইডিপিতে স্থানান্তর করতে।’ এসিটিদের স্থায়ী করার সিদ্ধান্ত যখন নিয়েই ফেলেছেন তখন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা কেন দিচ্ছেন না-জানতে চাইলে সোহরাব হোসেনের মন্তব্য-‘সরকারি কাজ তো একটু সময়তো লাগবেই।’

আর এমপিওভুক্তিকরণের ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রী দায় চাপিয়েছেন অর্থমন্ত্রণালয়ের ওপর। শিক্ষামন্ত্রীর দাবি এসিটিদের স্থায়ী করতে অর্থমন্ত্রণালয়  প্রয়োজনীয় অর্থছাড় দেয়নি। বিষয়টি নিয়ে আমি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের সঙ্গে আলাপ করি। কেননা গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, ফুলবাড়ীয়া আক্কেল আলী উচ্চ বিদ্যালয়সহ এসিটি আছে- এমন ৪টি স্কুলের সভাপতি তিনি। এসিটিদের এই অনিশ্চিত জীবন নিয়ে কথা বললে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আমাকে জানান, এসিটি তার ৪টি স্কুলেরই পড়ালেখার মান বদলে দিয়েছে। এসিটিদের স্থায়ী করতে তিনি নিজেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু তার ভাষ্যমতে, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার জন্য এসিটিদের স্থায়ী করা যাচ্ছে না।’ 

একজন মন্ত্রীর মুখে কর্মকর্তাদের সিন্ডেকেটের কথা শোনার পর যেন আকাশ থেকে পড়লাম। এরপর আমি দ্রুতই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিতে শুরু করলাম। মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি সূত্র আমাকে জানিয়েছে, এসিটিদের স্থায়ী না করে, এসইডিপিতে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকতাদের কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ থাকবে। কেননা নতুন প্রকল্পে নতুন করে টাকা দেবে বিশ্বব্যাংক। আর এসিটিদের স্থায়ী করলে টাকা হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ থাকবে না। যদিও মন্ত্রণালয় এসিটিদের স্থায়ী করা হবে- এমন শর্তেই নিয়োগ দিয়েছিল। জানিনা কর্মকর্তাদের এই সিন্ডিকেটে শিক্ষামন্ত্রী কিংবা শিক্ষা সচিব জড়িত কিনা!   

যাই হোক, জাতির স্বার্থেই কর্মকতাদের সিন্ডিকেট ভেঙে অচিরেই এসিটিদের স্থায়ী করে প্রজ্ঞাপণ জারি করবে শিক্ষামন্ত্রণালয়- এটুকুই আশা করি। আর তা যদি করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য সরকার আরও আকর্ষনীয় প্রকল্পও যদি হাতে নেয়, তবুও এমন অস্থায়ী পেশায় কখনোই মেধাবীরা আসবে না। কেননা, মেধাবীদের জন্য হাজার দরজা খোলা রয়েছে। এ কারণে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, তালবাহানা না করে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির স্বার্থেই এসব অভিজ্ঞ, মেধাবীদের স্থায়ী করুন অথবা বিকল্প হিসেবে সারাদেশে প্রতিদিন যে শত শত শিক্ষক অবসরগ্রহণের ফলে শূন্যপদের সৃষ্টি হচ্ছে সেসব শূন্যপদগুলোও এই ৫ হাজার ২শ জন শিক্ষককে নিয়োগ দিন। 

লেখক: জুবায়ের আল মাহমুদ
সাংবাদিক, সমাজ ও পরিবেশ উন্নয়নকর্মী


মন্তব্য