kalerkantho


রাষ্ট্র, বুর্জোয়া রাষ্ট্র এবং গণতন্ত্র

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৩ মে, ২০১৮ ২১:৩৭



রাষ্ট্র, বুর্জোয়া রাষ্ট্র এবং গণতন্ত্র

রাষ্ট্রের প্রকৃতি, রাষ্ট্রের কাজ, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা এবং সার্বভৌমত্বের ধারণা নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন দার্শনিক তাদের সমসাময়িক অবস্থা, অভিজ্ঞতা এবং বহুবিধ প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে তাদের মতামত দিয়ে থাকেন। 

স্বায়ত্বশাসন ও অধিকারের আপেক্ষিক সংজ্ঞা সমাজ বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্তৃত্ব প্রয়োগের ক্ষেত্রে বদলে যায়। কর্তৃত্ব প্রকৃত অর্থে কার অধীনে এবং এর প্রয়োগ স্বাধীনতার ধরন নিয়ে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং অন্যান্য সরকার পদ্ধতিতে বিতর্কের অন্ত নেই। এসব বিতর্কের মধ্যে দিয়েও আমরা আধুনিক সভ্য পৃথিবীতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সদস্য পরিচয়ে আনন্দ লাভ করি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর সম্প্রসারণে ‘বুর্জোয়া’ শব্দটি অতোপ্রোতভাবে জড়িত। সমাজতন্ত্রের আদর্শবাদীরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর সমালোচনায় একে বুর্জোয়া আধিপত্যবাদী বলে নিন্দা করেন। সাধারণ নাগরিকও বুর্জোয়া শব্দটির সম্পূর্ণ ব্যাখা না জেনেও সেটিকে নেতিবাচক অর্থেই সম্বোধন করে থাকেন। দরিদ্র্য দেশগুলো আর্থিক অস্বচ্ছলতার জন্য উন্নত রাষ্ট্র, দাতাগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরশীল। আর্থিক সাহায্যের পশ্চাতে বিশ্বব্যাংক, আই এম এফ এর মতো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নির্ধারিত নিয়মনীতি অনুসারে আর্থিক লেনদেন পরিচালিত হয়। সাধারণ দৃষ্টিতে নিজ রাষ্ট্রের পুঁজিপতি, উচ্চবিত্ত শ্রেণি বুর্জোয়া হিসেবে আখ্যায়িত হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শক্তিধর রাষ্ট্র এবং এ ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সংকীর্ণবাদীদের দৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক বুর্জোয়া সম্প্রদায়।

স্বায়ত্ত্বশাসনপন্থী অথবা কর্তৃত্ব বিরোধীদের বিপক্ষে মার্কস ও এঙ্গেলস ইটালির সমাজতান্ত্রিক সংকলন প্রবন্ধে মতামত প্রকাশ করেন ১৮৭৪ সালে। ১৯১৩ সালে প্রবন্ধগুলো 'Die neul Ziet' পত্রিকায় জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হয়। যেখানে এঙ্গেলস বলেন, যন্ত্র প্রয়োগ ও বৃহৎ উৎদন ক্ষেত্র ক্রমাগত বাড়ছে। এখানে তিনি কর্তৃত্বের প্রশ্নে সাধারণ বক্তব্য থেকে এসেছেন রাষ্ট্রের প্রশ্নে। অর্থাৎ তার মতে রাষ্ট্র বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে। মার্কসবাদীরা  বিশ্বাস করেন যে, বুর্জোয়া শ্রেণির যা লক্ষণ সেরূপ রাষ্ট্র ক্ষমতার উদয় হয় স্বৈরতন্ত্র পতনের যুগে। বুর্জোয়া রাষ্ট্রের প্রকৃত সংজ্ঞায় দেখা যায়, যখন একটি দেশে অনেক গ্রুপ একসঙ্গে শাসন করে এবং সফলতা আসে, রাষ্ট্রের সার্বিক অবকাঠামোতে তখন তা 'Over developed State'-এ রূপান্তরিত হয়। উন্নত বিশ্বে সরকারি সেবার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিটি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমরা ভারতের টাটা, ডালমিয়া কিংবা বিশ্ববিখ্যাত সফটওয়্যার ডেভলপমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলতে পারি। এই যথার্থ বুর্জোয়ারা নিজেদের বাণিজ্যিক উন্নয়নের আলোকে রাষ্ট্রের সেবা খাত থেকে শুরু করে বিভিন্ন দিক উন্নয়নের সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখে। নেতিবাচক অর্থে আমরা যাদের বুর্জোয়া বলি তারা প্রকৃতপক্ষে পেটি বুর্জোয়া।

কাল মার্কস বলেন, ঐতিহাসিক ভাবে বুর্জোয়ারা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। আঠারো শতকে বুর্জোয়া শক্তি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়। ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের দ্রুত প্রসার লাভ করে ফ্রান্সে। ইউরোপের অনেক স্থানে বণিক শ্রেণির হাতে অর্থ থাকলেও রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল না। উপরন্তু উচ্চ কর আরোপ করে রাজারা বণিক শ্রেণির পরিশ্রমের পুঁজিতে ভাগ বসাতো। অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ ও বিলাসিতায় রাষ্ট্রের অস্তিত্ব যখন ভঙুর ও নিঃশেষিত হলো, তখন তৃতীয় অ্যাস্টেটের (কৃষক, শ্রমজীবী) সকল মানুষ অভিজাতদের বিরুদ্ধে বুর্জোয়াদের পাশে এসে দাঁড়ায়। বুর্জোয়ারা  রাজনৈতিক পদের স্বৈরাচারী রাজার বিরুদ্ধে অন্য সকলের সাথে বিদ্রোহ পরিচালনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। সুতরাং ইউরোপে বুর্জোয়া বিপ্লব কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। তাই অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বুর্জোয়া শক্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই বুর্জোয়ারা পেটি বুর্জোয়া নয়। বুর্জোয়ার চূড়ান্ত রূপটি পেটি বুর্জোয়ার পরবর্তী অবস্থা। পঞ্চদশ শতাব্দীর বণিক শ্রেণি সেদিন নিজেদের স্বার্থের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকের স্বার্থকে রক্ষা করতে চেয়েছিল। এই কর্মসূচিগুলো পাশ্চাত্যে রেঁনেসার সূচনা করেছিল। প্রকৃত বুর্জোয়া রাষ্ট্রে রাজনৈতিক কৃষ্টি অনেক উন্নত। তারা  বিরোধী অথবা সরকারি দলকে সর্বদা নিয়ন্ত্রণ করে না। কিন্তু পেটিবুর্জোয়া-সর্বস্ব অবিকশিত গণতন্ত্রের দেশে রাজনৈতিক দলগুলোকে বাণিজ্যিক স্বার্থে পেটিবুর্জোয়ারা নিজেদের দখলে রাখতে চায়। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরবিরোধী আপসহীন প্রতিযোগিতা পেটিবুর্জেয়াদের স্বার্থ হাসিলে নিজেরাও ব্যবহার করে। এ পর্যায়টি একটি মিথস্ক্রিয়ার মতো। গণতন্ত্রের মূল বক্তব্য যেখানে প্রজাতন্ত্র তথা জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের শাসনব্যবস্থা হওয়ার কথা, সেখানে সকল জনগণের স্থানে ক্ষমতাধর কিছু ব্যক্তি অথবা অভিজাত শ্রেণির হাতে রাষ্ট্রের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হতে দেখা যায়। এই নিয়ন্ত্রণ ইতিবাচক তথা সকলের কল্যাণে এবং রাষ্ট্রের প্রকৃত স্বার্থ সংরক্ষণ করলে অ্যারিস্টটল একে উত্তম শাসন ব্যাবস্থা ‘পলিটি’ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হিসেবে তিনি সকলের কল্যাণ সাধনকে বুঝিয়েছেন। পলিটির উল্টো আচরণ তথা রাষ্ট্র যদি প্রকৃত স্বার্থ সংরক্ষণ করতে না পারে, বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধিতে ব্যস্ত থাকে, তবে সেই অবস্থাটি অ্যারিস্টটলের দৃষ্টিতে গণতন্ত্র।
 
স্বার্থ সংরক্ষণ কারা, কীভাবে এবং কাদের জন্য করবে সেটাই সম্ভবত গণতন্ত্রের সাফল্য-ব্যর্থতার বিশ্লেষণে সাধারণ সমালোচনগুলোকে স্পষ্ট করতে সাহায্য করে। এই প্রেক্ষাপটে জেমস মিলের (১৭৭৩) কথা বলা যেতে পারে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের কাজ অধিক সংখ্যক মানুষকে সুখ প্রদান করা। তাহলে সকলের মঙ্গল হবে। গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্রের তত্ত্বগত সংজ্ঞা এই তত্ত্বকেই সমর্থন করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো কল্যাণ হবে কিভাবে? রাষ্ট্রের কল্যণে পুঁজিপতি ও বুর্জোয়াদের ভূমিকা কী?

জেমস মিলের কনিষ্ট পুত্র জন স্টুয়ার্ট মিল ছিলেন বাবার মতোই উপযোগবাদের একজন জোড়ালো সমর্থক। তিনি পিতার বিরোধিতা করে বলেন, রাষ্ট্রের কাজ গুণসম্পন্ন কিছু সংখ্যক ব্যক্তিকে সুখ প্রদান করা। ওপরে ২০% (Nobel Man)-কে সুখ প্রদান করলে তাদের মাধ্যম নিচের স্তরের ৮০% মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত সম্ভব। আমরা ধরে নিতে পারি গুণসম্পন্ন ওপরের এই ২০ শতাংশ মানুষ বলতে সরকারি ক্ষমতার কাছাকাছি রাজনৈতিক (সংসদ সদস্য, মন্ত্রী), অরাজনৈতিক অংশ (আমলা, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী) সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়েছে। কারণ এই সম্প্রদায়গুলো একটি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের সাথে সম্পৃক্ত। জেমস স্টুয়ার্ট মিলের দর্শন অনুযায়ী এই গুণসম্পন্ন শ্রেণির মেধা, সততা এবং প্রচেষ্টার ফল অবশিষ্ট সকল জনগণের ভাগ্যর পরিবর্তনে সহায়ক হতে পারে। একইভাবে ওপরের স্তরের এই মানুষগুলোর অসততা, দুর্নীতি এবং নেতিবাচক ভূমিকা সামগ্রিক রাষ্ট্রের ও জনগণের ভবিষ্যত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এজন্যই জেমস স্টুয়ার্ট মিল ওপরের ২০ শতাংশ মানুষকে পর্যাপ্ত সুখ প্রদানে মতামত দিয়েছেন যাতে তাদের সন্তুষ্টি রাষ্ট্রের কল্যাণে নিজেদের পরিশ্রমকে উৎসাহিত করে। এ সমস্ত কারণে সরকারি প্রশাসনে বেতন ভাতার সুযোগ, চাকুরির নিশ্চয়তা, সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদানসহ ব্যবসায়ী শ্রেণিকে ব্যবসা করার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন রাষ্ট্রকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে দেখা যায়। 

পুঁজিবাদী সমাজে- রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিতে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে কিংবা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে ক্রমশ ব্যবসায়ী শ্রেণির প্রতক্ষ্য অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেতে থাকলে গণতন্ত্রের সংজ্ঞাগত ধারণায় প্রাচীন মূল্যবোধগুলো ধাক্কা খায়। আগে নির্বাচনে বিভিন্ন দলের জন্য অর্থের যোগানদাতা হিসাবে যে ব্যবসায়ী শ্রেণিকে পরোক্ষভাবে রাজনীতেতে দেখা যেত, সেটি পরিবর্তিত হয়ে প্রতক্ষ্যভাবে রাজনীতিতে অংশ নিতে দেখা যায়। অথচ রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী শ্রেণির ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ সংরক্ষণের কথা। রাজনীতিবিদ যদি বাণিজ্যিক বুদ্ধিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করে অথবা রাজনীতিকে ব্যবহার করে নব্য বণিক হবার স্বপ্নে বিভোর হয়, তবে রাজনীতি বাণিজ্য নীতি দ্বারা প্রভাবিত হতে বাধ্য। অন্যদিকে ব্যবসায়ী শ্রেণির রাষ্ট্রের নির্বাচনে সরাসরি অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় আর্থিক সঙ্গতিতে নির্বাচনী বৈতরণী পারি দেওয়া যেমন সহজ হয়, তেমনি পরবর্তিতে রাজনীতিতে ব্যবসায়ী স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ব্যবহারের সুযোগ ও বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে বিগত নির্বাচনগুলোতে এই চিত্র স্পষ্ট। এ ধরনের গণতন্ত্রের প্রপঞ্চগুলো পূর্ণমাত্রায় বিকশিত নয়। রাষ্ট্রে যখনই নাগরিক নিরাপত্তাহীনতা, দুর্নীতি, আস্থাহীনতা বৃদ্ধি পায় তখন নাগরিক অসন্তোষ, রাজনীতি, অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন ও বাহ্যিক সার্বভৌমত্বের সমালোচনা বৃদ্ধি পায়। বুর্জোয়া শ্রেণিকে অন্যসকল ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের সাথে সমালোচিত হতে হয়। উন্নত রাষ্ট্রে প্রকৃত বুর্জোয়ারা পুঁজির অন্বেষণের চেষ্টা করে। কিন্তু নিজ রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী কিছু করে না। রাষ্ট্রও সেরূপ কোনো সুযোগের অপব্যবহারকে প্রতিহত করার সামর্থ্য রাখে। এই সক্ষমতার মাধ্যমে রাষ্ট্র-বুর্জোয়া রাষ্ট্র-সার্বভৌম শক্তির প্রকৃতি নির্ধারণ করা যায়। সুতরাং প্রকৃত বুর্জোয়ারা সুযোগ ও স্বাধীনতার সদ্ব্যব্যবহার করে শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রের সকলস্তরের উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম। 

লেখক: নিবেদিতা রায়
সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

(প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এর জন্যে কোনোভাবেই দায়ী নয়)


মন্তব্য