kalerkantho


জীবন্ত লাশ দেখতে চাই না আর, ভুলতে পারি না সেই মায়ের আর্তনাদ

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৭ মে, ২০১৮ ১২:০৪



জীবন্ত লাশ দেখতে চাই না আর, ভুলতে পারি না সেই মায়ের আর্তনাদ

নেশাগ্রস্তরা এভাবেই পড়ে থাকে রাস্তায়

মাদকের ভয়ংকর ছোবলে পাড়া-মহল্লার আনাচ-কানাচে আর এভাবে জীবন্ত লাশ পড়ে থাকুক তা কোনভাবেই দেখতে চাই না। মানুষরূপী হায়েনাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলুক এবং চলতে থাকুক যতক্ষণ না পর্যন্ত মাদক কারবারীদের শেকড় উপড়ে ফেলা না যায়। 

মনটা খারাপ হয়ে যায় শনিবার সকালে। বাসা থেকে বেরিয়ে অফিসে যাওয়ার পথে রাজধানীর পশ্চিম আগারগাঁওয়ের ৬০ ফিট রাস্তার এক পাশে এভাবেই পড়ে থাকতে দেখা যায় এক মাদকাসক্ত ব্যাক্তিকে। কোথায় বাড়ি? আর কোথায় তার পরিবার কেউ বলেত পারে না। রাস্তার এভাবে পড়ে থাকা এই মানুষটির দিকে তাকাতেই শান্ত মনটা অশান্ত হয়ে উঠে। মনের অজান্তেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠি মাদক কারবারীদের ওপর। কাদের জন্য এই মানুষটি আজ এভাবে রাস্তায় পড়ে আছেন।  

নিজেকে যে সামলাতে পারছিলাম না, মনের অজান্তেই চোখ দুটো ছলছল করে উঠে। অনিচ্ছায় সমর্থন করি সেই ক্রসফায়ারের মতো নিষ্ঠুর অভিযানকে! কারণ দেশের শহর আর গ্রাম নয় নিরবে হাজার হাজার মায়ের বুক খালি করে দিচ্ছে মাদক কারবারীরা। লাখ লাখ পরিবারের সুখের সংসার তছনছ করে দিছে শত শত মাদক কারবারী আর  সেই বদি-সাইফুল গংরা। মাদকের ছোবলে ছন্নছাড়া পরিবারের করুণ দৃশ্য দেখতে দেখতে চোখের জল শুকিয়ে গেছে আমার। ক্রসফায়ারে নিহত সেই মাদক কারবারীদের জন্য এখন আর সহানুভূতি আসে না! 

আমি যেন পাষাণ হয়ে গেছি সেই মায়ের আর্তনাদ দেখে। যে মমতাময়ী মা জননী হওয়ার আশায় আশায় ছুটেছেন দেশের বিভিন্ন পীর দরবেশের মাজারে। কত-শত ডাক্তার দেখিয়েছেন ঘুরে ঘুরে। অনেক সাধনার পর কোলজুড়ে আসে ফুটফুটে একমাত্র পুত্র সন্তান। যেন পরিবার আকাশের চাঁদটি হাতে পায় মা। ভূমিষ্ট হওয়ার পর ছেলের একটু জ্বর হলেই মা ছুটতো ডাক্তার আর কবিরাজের কাছে। প্রচণ্ড জ্বরে ছেলে যন্ত্রণায় কাতরায়, মা ছটফট করে, কেঁদে বুক ভাসায়। মায়ের চোখে জল শুকিয়ে আসে। সারারাত ঘুম নেই মায়ের। কত রাত এভাবে না ঘুমিয়ে কাটিয়েছে সন্তানের জন্য, জানে না সেই পুত্র সন্তান। কত আদর সোহাগ করে লেখাপড়া করিয়ে ছেলেকে বড় করতে থাকেন মা। নাড়িছেঁড়া ধনকে নিয়ে মা স্বপ্ন দেখেন ছেলে বড় হবে, মানুষের মতো মানুষ হবে। তবেই বুঝি জীবনের স্বার্থকতা খুঁজে পাবে, মরেও শান্তি পাবে মা।

কিন্তু না সেই সুখের স্বপ্ন যেন ধুলিসাৎ করে দেয় ভয়ংকর মাদক। একমাত্র পুত্র এসএসসি পাশ করেই ধীরে ধীরে কিছু অসাধু বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। মাদকের টাকার জন্য প্রতিদিনই চলে উৎপাত। ছেলের জন্য এতো কিছু করেছেন যেই মা সেই মাকেই মাদকের টাকার জন্য বকাঝকা আর চড় থাপ্পরও চালায় সন্তান। একটু জ্বর হলে অস্থির হয়ে ছটফট করতেন যিনি সেই মমতাময়ী মাকেই মাদকের টাকার জন্য বেল্ট আর লাঠি দিয়ে প্রায় দিনই চালাতো ভয়ংকর নির্যাতন। ছেলের এমন নির্যাতন আর সইতে পারেনি মা। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে সেই আদরের ধনকেই হত্যার পরিকল্পনা করেন। ভাড়াটিয়া ঘাতকদের সঙ্গে মিলে নিজের ছেলেকেই হত্যা করেন মা। পুলিশ গ্রেপ্তার করে মাকে, কারাগারে কাটে মায়ের সময়।

এটা কোনো সিনেমার কাহিনী কিংবা গল্প নয়- এটা রাজধানীর শ্যামলী ২ নম্বর রোডে ঘটে যাওয়া বাস্তব চিত্র।  সেই ঘটনার কথা মনে হলেই এখনো শিউরে উঠি। মায়ের ওপর অত্যাচার আর যন্ত্রণার কোন পর্যায় পৌঁছালে একজন মা তাঁর মাদকাসক্ত সন্তানকে ভাড়াটিয়া দিয়ে হত্যা করতে পারে? আপনারাই উত্তর দিন এবং মাদক কারবারীদের জন্য কী উপহার দিতে চান?

হায়দার আলী: গণমাধ্যম কর্মী


মন্তব্য