kalerkantho


কেউ শুনছে না বিপর্যস্ত হালদার কান্না!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১২ জুলাই, ২০১৮ ১৫:০৯



কেউ শুনছে না বিপর্যস্ত হালদার কান্না!

চট্টগ্রামের হালদা নদী শুধুই একটি নদী নয়, এটি একটি স্বর্ণ প্রসবিনী হাঁসের মতো অনেক মূল্যবান এবং দামী। অতিলোভীর কবলে পড়ে যেমন ডিম একসাথে পাওয়ার আশায় স্বর্ণ প্রসবিনী হাঁসকে জবাই দেয়ার পর দেখা গেলো তাতে কোন ডিমো নেই, ঠিক তেমনি কিছু লোভী, দুর্বৃত্ত, ভূমি দস্যু, মৎস্য শিকারী অবলীলায় হামলে পড়ছে বেচারা হালদার ওপর। তাই এই বেহাল দশা হালদার। দৈন্য দশা আর বিপর্যস্ত হচ্ছে এর অস্থিত্ব। বিপর্যস্ত হচ্ছে হালদার পরিবেশ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র। হুমকীর মুখে বিশ্বের অন্যতম মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদার মা-মাছের বিচরণ ক্ষেত্রেও। এর কান্না শোনার কেউ  নেই। 

সম্প্রতি এই নদীর করুণ অবস্থা আর আহাজারি নিয়ে বেশ কিছু খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাতেও প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের টনক নড়েনি। সরকারের নীতি নির্ধারণী মহলেরও ঘুম ভেঙেছে বলে প্রতিয়মান হয়নি। 
বিশ্বের অনন্য প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র চট্টগ্রামের হালদা নদীর তুলনা আর নেই। মূলত দুর্লভ প্রাকৃতিক সম্পদের হালদা নদীকে বলা হয় দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র। 

জোয়ার-ভাটার এই নদীতে মিঠা পানির মাছের ডিম ছাড়ার ঘটনা পৃথিবীর এক বিস্ময়, মহান সৃষ্টিকর্তার এক অতিমূল্যবান দান। অথচ এই দুর্লভ সম্পদকে আমরা অযত্নে, অবহেলায়, অব্যবস্থাপনায় আমরা নিজেরাই বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছি। আমাদের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর হঠকারিতায় হালদা এখন ক্লান্ত অবসন্ন এবং বিপন্ন। অবৈজ্ঞানিক ও অপরিকল্পিতভাবে নানা গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা, হালদার বুকে আত্মঘাতী রাবার ড্যাম বসানো, নদীর পাড়ে-তীরে অপরিকল্পিতভাবে কলকারখানা স্থাপনের অনুমতি প্রদান, হাঁস-মুরগির খামার গড়তে দেওয়া, পৌরসভার বর্জ্য ফেলা এবং নদীর বুক চিরে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্য বহন ইত্যাদি কারণে হালদার অস্থিত্ব আজ বিপন্ন ও বিপর্যস্ত।

এক পরিসংখ্যানে বলা হয়, হালদায় গত মে মাসে কার্প-জাতীয় মাছ ১০ হতে ১২ বছরের মধ্যে সবচাইতে বেশি ডিম ছেড়েছিল। কেন্দ্রীয়ভাবে নদী সুরক্ষার অংশ হিসেবে চলতি বছরের শুরুতেই সরকারের নির্দেশে নদীর দুই পাড়ের অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদের খবর বড় বড় হরফে প্রকাশিত হয়েছিল। এটা ছিল হালদার জন্য, আমরা যারা নদীপ্রেমী তাদের জন্য সুখবর। অথচ এর অল্পদিনের মধ্যেই শিল্প, আবাসিক এলাকা ও পাহাড় হতে নেমে আসা বর্জ্য ও রাসায়নি পদার্থে হালদা নদীকে আশঙ্কাজনকভাবে দূষিত করে তোলে।
 
কিছুদিন আগে প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে রাউজান, ফটিকছড়ি, হাটহাজারীতে বন্যা হয়েছে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর কয়েক দিন ধরে হালদা নদীর বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, ডলফিনসহ জলজ প্রাণী মরে ভেসে ওঠে। অবশ্য পাহাড়ি ঢল, ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা ঝটিকা বন্যা হালদা নদীর জন্য নুতন কিছু নয়। কিন্তু অতীতে কখনো মাছ, ডলফিনসহ জলজপ্রাণীর এ রকম মুত্যু হয়নি। এইবার কেন মরলো? কারণ,  হচ্ছে হালদা নদীতে প্রতি লিটার পানিতে স্বাভাবিকভাবে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ থাকে অন্তত পাঁচ মিলিগ্রাম। অথচ সংগৃহীত পানির নমুনায় অক্সিজেনের মাত্রা পাওয়া গিয়েছে শূন্য দশমিক ২১ হতে এক মিলিগ্রাম মাত্র! আর হালদার পাশের খন্দকিয়া খালে দ্রবীভূত অ্যামোনিয়ার পরিমাণ স্বাভাবিকের চাইতে ১০০ গুণ বেশি। দ্রবীভূত অক্সিজেন কম থাকার পাশাপাশি অ্যামোনিয়ার বিষক্রিয়ায় মাছ, ডলফিনের মড়কের অন্যতম কারণ। একই কারণে সম্প্রতি উদ্বেগজনকহারে বিপন্ন প্রজাতির ডলফিন মারা যাবার ঘটনাও ঘটছে। গত জুন মাসের শেষ দিক থেকে জুলাইর প্রথম সপ্তাহের প্রায় দুই সপ্তাহের বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে হালদা নদীতে উজান এলাকার কলকারখানা, পোলট্রি খামারসহ বিভিন্ন শিল্পের বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকর বর্জ্য প্রায় ২০টি খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে হালদাতে মিশে যায়।
 
অবশ্য, নদী-পরিবেশ-প্রকৃতিপ্রেমী, সুশীল সমাজ নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে হালদা রক্ষায় সরকারি মহলের দৃষ্টিতে বিষয়টি আনার নিরন্তর চেষ্টায় রত। এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন  অনুষ্ঠিত হয়। হালদা নদী রক্ষা কমিটি সাম্প্রতিক ভয়াবহ দূষণজনিত বিপুল সংখ্যক বিভিন্ন প্রজাতির মাছের মৃত্যুর কারণ চিহ্নিত করতে এবং নদীকে ভবিষ্যতে এই ধরনের দূষণ হতে রক্ষা করতে ১১ দফা সুপারিশ উপস্থাপন করেছে। তারা আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেছেন, তাদের উত্থাপিত সুপারিশগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়ন না করলে হালদার মূল্যবান মৎস্য সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাবে। 

তাদের দাবিগুলো আমার কাছে যৌক্তিক বলে প্রতিয়মান হয়েছে। তাদের দাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-  হালদাকে পরিবেশগতভাবে বিপন্ন এলাকা (ইসিএ) ও ‘জাতীয় নদী’ ঘোষণা এবং হালদা নদী ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের জন্য ‘হালদা নদী কমিশন’ গঠন করতে হবে। এমতাবস্থায় হালদাকে ইসিএ ঘোষণা করে এর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণে সরকার বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের বিষয় ভেবে দেখতে পারেন। একই সাথে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় হালদার নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়েও কূটনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন।

হালদার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে,‘বাংলাদেশের হালদা নদীর ডলফিনগুলো মরে যাচ্ছে কেন?’ এরকম শিরোনামে প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে একটি বিদেশি সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলা। তাতেও ফুটে ওঠে হালদার বিপর্য এবং করুণ চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়, নদীতে অনেক সময় ডুব সাতারের খেলা খেলতে দেখা যায় ডলফিনকে। বাংলাদেশে যেটি শুশুক নামে পরিচিত। বাংলাদেশের চট্টগ্রামে হালদা নদীতে যে প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র রয়েছে, সেখানে সম্প্রতি উদ্বেগজনকহারে বিপন্ন প্রজাতির গাঙ্গেয় ডলফিন মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। গত তিন মাসে শুধু হালদা নদী ও সংলগ্ন খালগুলোতে অন্তত ষোলোটি ডলফিনের দেহ ভেসে উঠেছে। কিন্তু কেন হালদা নদীতে ডলফিন এই চরম বিপদের মুখে? পৃথিবীতে যত প্রাণী ঝুঁকির মুখে এই ডলফিন তাদের অন্যতম। অথচ হালদা ছিলো তাদের অন্যতম আবাসস্থল। এতদিন তারা নিরাপদেই ছিলো, সংখ্যাও ভালো ছিলো। কিন্তু হালদা নদীর দূষণ হচ্ছে। পানি প্রবাহ থেমে যাচ্ছে। উজানে রাবার ড্যাম দেয়ায় এটি হচ্ছে। ফলে পানির লেভেল কমে যাচ্ছে। 

পত্রিকার খবর অনুযায়ী, ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হয়।  একইভাবে ড্রেজার চলাচলের সময় ডলফিনগুলো আঘাত পেয়ে মারা যাচ্ছে। এটা বিশ্বের অতি বিপন্ন প্রাণী।  এমনি অবস্থায় হালদায়ও বিপর্যয়ের স্বীকার হচ্ছে ডলফিন। আর একটি কথা প্রাসঙ্গিক যে, কেবল জীবন্ত নদীতেই ডলফিনের বিচরণ এবং আস্তানা। কাজেই হালদায় যখন ডলফিন মরছে তখন এই অশনিসংকেত বহন করছে যে, হালদা তার জীবনীশক্তি ক্রমাগত হারিয়ে ফেলছে। এটা কারো জন্যই প্রত্যাশিত হতে পারে না। তাই ডলফিন চলে যাওয়া বা মরে গেলে তাতে মাছেরও ক্ষতি হবে।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ থেকে সভাপতি মাহবুবুল আলম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রেরিত এক জরুরি বার্তায় বলেন, দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে স্মরণাতীতকাল থেকে চট্টগ্রামের হালদা নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। রুই, কাতলা, মৃগেল ইত্যাদি ইন্ডিয়ান কার্প জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক এই উৎস শত শত বছর ধরে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আমিষের যোগান দিয়ে আসছে। কয়েক হাজার মৎস্যজীবী হালদা থেকে ডিম ও পোনা সংগ্রহ করে তা বিক্রির মাধ্যমে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে। এই পোনা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে বাঙালির মাছ-ভাতের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য লালনের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। হালদার কল্যাণে শত শত কোটি টাকার মৎস্য সম্পদ উৎপাদিত হয়। জাতীয় অর্থনীতিতে বছরে হালদার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে অবদান প্রায় ১২ শো কোটি টাকা যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

সম্প্রতি পরিচালিত এক গবেষণায় হালদার প্রাকৃতিক প্রজনন পরিবেশের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। বিভিন্ন কল কারখানার নিষ্কাশিত বর্জ্য, বালি উত্তোলন, নদী দখল, নালা-নর্দমার দূষিত পানির সংমিশ্রণ এবং মনুষ্য সৃষ্ট দূষণের কারণে হালদার পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবে মাছের জীবনধারণ দুরূহ হয়ে পড়ছে। এ কারণে মা-মাছ মরে ভেসে উঠার দৃশ্য এখন নিত্য ঘটনা। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে অচিরেই প্রকৃতিপ্রদত্ত এ সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার দেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, ঠিক অনুরুপ দ্রুত হালদা রক্ষায় এবং জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। 

লেখক: মোতাহার হোসেন, সাংবাদিক ও কলামিস্ট 

(এই বিভাগে প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নয়)



মন্তব্য