kalerkantho


অপবাদ ঘোচাতে চায় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

মাদক নিয়ন্ত্রণে 'ঠুঁটো জগন্নাথ'

এস এম আজাদ   

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০৯:৩৮



মাদক নিয়ন্ত্রণে 'ঠুঁটো জগন্নাথ'

'ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সর্দার' বা 'ঠুঁটো জগন্নাথ'- এমন প্রবাদ ব্যবহার করে নিয়ে অনেক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সরকার ও অধিদপ্তর 'অপবাদ' ঘুচিয়ে 'কাজের কাজি' হওয়ার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে।

তবে দেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দেখা দেওয়া মাদকের নিয়ন্ত্রক অধিদপ্তরটি দীর্ঘদিনেও অন্য সংস্থাগুলোর মতো সামর্থ্য অর্জন করতে পারেনি। এখনো মাত্র এক হাজার জনবল। নেই গাড়িসহ প্রয়োজনীয় যানবাহন। মাদকদ্রব্য শনাক্তকারী ও আলামত সংরক্ষণের যন্ত্রসহ নেই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। নেই অস্ত্র। প্রতিনিয়ত নতুন ধরনের মাদকদ্রব্য ছড়িয়ে পড়লেও অধিদপ্তর চলছে পুরনো আইনে। নেই প্রশিক্ষণ একাডেমি। সারা দেশে অর্ধকোটি মাদকসেবী থাকলেও অধিদপ্তরের আছে মাত্র চারটি নিরাময়কেন্দ্র। এসব সীমাবদ্ধতার কারণে মাদকসেবী, মাদক কারবারিদের নির্ভরযোগ্য তালিকা তৈরিসহ গবেষণামূলক কার্যক্রমও চালাতে পারছে না ডিএনসি।

অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলছেন, ২৮ বছরে ৩২ জন মহাপরিচালক (ডিজি) পেয়েছেন তাঁরা। গড়ে প্রতি ১০ মাসে বদল এসেছে পদটিতে। অধিদপ্তরের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা অর্থাৎ যাঁরা ডিএনসিতেই চাকরি করে অভিজ্ঞ হয়েছেন, তাঁদের কেউই এখনো শীর্ষ পদে যেতে পারেননি। অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি), পরিচালক পদেও অল্প সময়ের জন্য চাকরিতে আসছেন অতিরিক্ত ও যুগ্ম সচিবরা। তাঁরা আসছেন, বসছেন, যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং চলে গেছেন। কেউ কেউ কাজ বুঝে অভিজ্ঞ হয়ে উঠলেও কাজ করার আগেই বদলি হয়ে গেছেন। ফলে অনেকেই প্রতিষ্ঠানটিকে আন্তরিকভাবে নিতে পারেননি। বিদায়ী কয়েকজন ডিজির বিরুদ্ধে ঘুষগ্রহণসহ দুর্নীতির অভিযোগও ওঠে। এসব কারণেই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হয়েও পিছিয়ে আছে ডিএনসি।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে সংস্থাটির ২৮ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ মঙ্গলবার। দ্বিতীয়বারের মতো দিবসটি পালন করছে ডিএনসি। এর আগে মাত্র একবার, ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেছিল এই অধিদপ্তর। এ ছাড়া শক্ত ভিত দেওয়ার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে অনেক বড় উদ্যোগ।

ডিএনসির কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে মঞ্জুরি পদসংখ্যা এক হাজার ৭০৬। এর মধ্যে শূন্যপদই আছে ৭৪৭টি। কর্মরত আছেন ৯৫৯ জন। এই জনবলের বড় অংশ মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে কর্মরত। জেলাগুলোতে মাদকবিরোধী অভিযানের জন্য জনবল মঞ্জুরি আছে মাত্র ছয়জন। এই স্বল্প জনবল ও অপ্রতুল লজিস্টিক দিয়ে মাদক অপরাধ দমনে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। নেই গাড়ি, অফিস সরঞ্জামসহ প্রয়োজনীয় অনেক উপাদান।

এ কারণে নতুন ছয় হাজার ১০৭টি পদ সৃষ্টি, যানবাহন, অফিস সরঞ্জাম ও লজিস্টিক বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়ে গত ১৬ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠান ডিজি মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন আহমেদ। ওই কাঠামোতে ডিএনসির মাঠপর্যায়ের কার্যালয়গুলো মাদকপ্রবণতার ভিত্তিতে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। 'ক' ক্যাটাগরির জনবল ৭৮ জন, 'খ' ক্যাটাগরির জনবল ৬২ জন এবং 'গ' ক্যাটাগরির জনবল ৪৬ জন। ঢাকা মহানগর এলাকাকে চারটি এবং চট্টগ্রাম মহানগর এলাকাকে দুটি ভাগে বিভক্ত করে 'ক' ক্যাটাগরি জেলার সমমানের জনবলের প্রস্তাব করা হয়েছে। ইয়াবা পাচার রোধে টেকনাফে একটি বিশেষ জোন স্থাপনের জন্য ৮২ জন জনবল প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া বন্দরগুলো যেন মাদকপাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হতে না পারে সে জন্য চারটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, তিনটি সমুদ্রবন্দর ও আটটি স্থলবন্দরের লোকবল দেওয়ার প্রস্তাব আছে। জেলা ও মহানগর আদালতে চারজনের সমন্বয়ে অধিদপ্তরের প্রসিকিউশন ইউনিট গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। ছয়টি বিভাগীয় শহরে ছয়টি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নতুন বিভাগ ময়মনসিংহ ও রংপুরে বিভাগীয় কার্যালয় ও নিরাময় কেন্দ্র স্থাপনের জন্য জনবলের প্রস্তাবও করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, ডিএনসির উদ্যোগে তিনটি জাতীয় কমিটি সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে তৈরি করা কোর কমিটির অধীনে সব সংস্থা একত্রে কাজ করছে। গত আগস্ট মাসে কোর কমিটির বৈঠকের পর সব সংস্থা নিয়ে রাজধানী ও টেকনাফে অভিযানে নামে ডিএনসি। এখন সব কটি সংস্থার তৈরি করা মাদক কারবারিদের তালিকা সমন্বয়ের কাজ চলছে। এরপর শীর্ষ মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চালানো হবে বলেও জানায় সূত্র।

দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিভক্ত হওয়ার সুবাদে ডিএনসি সুরক্ষা সেবা বিভাগের আওতায় যাওয়ায় এবং বর্তমান ডিজির আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকায় অধিদপ্তরটির উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ডিএনসির পরিবর্তন সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।  

ডিএনসির মহাপরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন আহমেদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, 'অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। মাদকের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবেলায় এই অধিদপ্তরকে কার্যকর করতে আমরা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছি। আইনের সংশোধন, নতুন অর্গানোগ্রাম তৈরি, লজিস্টিক সাপোর্ট, অস্ত্রসহ অনেক বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আজকের এই দিনে আমি বলতে পারি, বিগত যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক সক্ষম সংস্থা হিসেবে আমাদের গড়ে ওঠাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।'

মহাপরিচালক জানান, ইয়াবা দেশের তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সিসাবারে বিপদগ্রস্ত হচ্ছে তরুণরা। কম পরিমাণে মাদকসহ আসামি ধরলে জামিনে ছাড়া পেয়ে যায়। এমন অনেক সীমাবদ্ধতা কাটাতে আইনের সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা এখন মন্ত্রণালয়ে আছে। তিনি বলেন, ‘মাদক ও অস্ত্রের সঙ্গে যোগসূত্র আছে। খালি হাতে মাদক কারবারিদের ধরা কঠিন। তাই অস্ত্রও চাইছি আমরা। কোনোভাবে অভিযান চালাতে গেলেও যা জনবল আছে তার সাত গুণ প্রয়োজনীয়। ’ নিজস্ব প্রশিক্ষণ একাডেমি, কার্যালয়, প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগারসহ অনেক কিছুই নেই। এসব ব্যাপারেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাদকদ্রব্য শনাক্ত করতে ‘ড্রাগ ডিটেক্টর’ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান ডিজি।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ডিএনসির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এই অধিদপ্তর নিয়ে অতীতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেননি কোনো ডিজি। কারণ কাজ বুঝে ওঠার আগেই বদলি হয়ে গেছেন। যাঁরা এসেছেন তাঁরা এই সংস্থাকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারেননি। কয়েকজন ঘুষ খেয়ে যা পেরেছেন কামিয়ে চলে গেছেন। একজন ডিজি ছিলেন, যাঁকে মদ আমদানিকারকরা সরিয়ে দিয়েছেন সরকারকে হাত করে। এমনটা দুঃখজনক। ’ তিনি আরো বলেন, ‘এডিজি ও পরিচালক পদেও কেউ বেশিদিন থাকেন না। অধিদপ্তরে চাকরি করা কর্মকর্তারা পদমর্যাদায় এখনো পিছিয়ে। সর্বোচ্চ অতিরিক্ত পরিচালক হয়েছেন। তবে সব ধরনের পরিকল্পনা ও কাজে পরিচালক থেকে ওপরের কর্মকর্তারা কাজ করেন। তাঁরা ডিএনসি সম্পর্কে ভালোভাবে জানেনই না। এ কারণেই অবস্থার উন্নতি হয় না। তবে বর্তমান ডিজি সমস্যার মূলে হাত দিয়েছেন। ’ গঠনমূলক পরিবর্তন করতে চাইছেন বলেও মন্তব্য করেন ওই কর্মকর্তা।

সূত্র জানায়, ১৯৭৬ সালে এক্সাইজ অ্যান্ড ট্যাক্সেশন ডিপার্টমেন্ট পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে নারকটিস অ্যান্ড লিকার পরিদপ্তর গঠন করা হয়। আশির দশকে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় ১৯৮৯ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। এরপর ১৯৯০ সালের ২ জানুয়ারি ওই আইন প্রণয়নের মাধ্যমে অধিদপ্তর গঠন করা হয়। প্রথম ডিজি আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী এক বছর ছিলেন। দ্বিতীয় ডিজি এম এনামুল হক ছিলেন ছয় মাস। তৃতীয় ডিজি এ কে এম মাহবুবুল হক ছিলেন ৯ মাস। সর্বশেষ চলে যাওয়া ডিজি সালাউদ্দিন মাহমুদ ছিলেন তিন মাস। সরকারের অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা এই পদে আসছেন। সালাউদ্দিন, খন্দকার রাকিবুর রহমান, মোহাম্মদ ইকবাল, আলী হোসেনসহ কয়েকজন ডিজির বিরুদ্ধে ঘুষগ্রহণের অভিযোগও ওঠে।


মন্তব্য