kalerkantho


ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে কঠোর হস্তে দমন করা হবে : প্রধানমন্ত্রী

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ১৭:৪৯



ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে কঠোর হস্তে দমন করা হবে : প্রধানমন্ত্রী

সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে কঠোর হস্তে দমন করা হবে। 

তিনি আরো বলেন, ‘আগুনে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা, সন্ত্রাস, ভাঙচুর কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি হতে পারে না। আমরা কখনোই এ ধরনের কাজ বরদাস্ত করব না।’

এ সময় এই ধরনের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সদা সতর্ক থাকতে পুলিশ সদস্যদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘রাজনীতির নামে এ ধরনের জঘন্য নৃশংস কাজ যারা করবে তাদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা দিতে হবে।’

আজ মঙ্গলবার সকালে জাতীয় পুলিশ সপ্তাহ ২০১৮ উপলক্ষে তাঁর তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।

সরকার প্রধান বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের মানুষ পুড়িয়ে মারা কোনো ধরনের রাজনীতি আমি জানি না।’

স্কুল জীবন থেকে শুরু করা তাঁর দীর্ঘ ৫০ বছরের অধিক রাজনৈতিক জীবনে সাধারণ মানুষকে গায়ে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে মারার এ রকম রাজনীতি কখনো দেখেননি এবং এ ধরনের রাজনীতি কখনো গ্রহণযোগ্য নয় বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, আমরা রাস্তা করি তারা রাস্তা কেটে দেয়, আমরা গাছ লাগাই তারা গাছ কেটে দেয়, রেলের লাইন তৈরি করি তারা উপড়ে ফেলে।

শেখ হাসিনা বলেন, মৃতপ্রায় রেলকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য তাঁর সরকার ইঞ্জিন-বগি সব কিনে আনার পড়ে সেগুলা পোড়াচ্ছে, নতুন নতুন কেনা বাস পোড়াচ্ছে, সাধারণ মানুষ যে ব্যবসা-বাণিজ্য করে খায় তাদের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দিচ্ছে। ট্রাক পোড়াচ্ছে, সিএনজি লককে সিএনজির সঙ্গে বেঁধে রেখে সিএনজি পুড়িয়ে দিচ্ছে বা একজন প্রাইভেট গাড়ির চালককে নামিয়ে আগুন দিয়ে দিচ্ছে, পুলিশ হত্যা করছে।

এ সময় আন্দোলনের নামে ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে মানুষ পুড়িয়ে হত্যার বিএনপি-জামায়াতের কর্মসূচি রুখে দেওয়াতে পুলিশ বাহিনীর প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী।

সরকার প্রধান বলেন, ‘আমাদের পুলিশ বাহিনী সদা তৎপর। তাদের দক্ষতা ও যোগ্যতাতেই তারা এই জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমনে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। এ জন্য আপনাদের মাধ্যমে সকল পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের তিনি ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ দেশে বিএনপি-জামায়াত এসে জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করলেও এটা বাংলাদশের একার সমস্যা নয়, সারা বিশ্বের একটি সমস্যা এবং এ সমস্যা সমাধানে অনেক উন্নত দেশও হিমসিম খাচ্ছে। তারপরও তিনি বাংলাদেশ পুলিশকে কঠোর হস্তে জঙ্গিবাদ দমনে কাজ করে যাওয়ায় ধন্যবাদ জানান।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে জঙ্গিবাদ উচ্ছেদে পুলিশ, গোয়েন্দা এবং অন্যান্য বাহিনীর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, সব কাজ কিন্তু সবসময় এককভাবে করা যায় না। এখানে তথ্য আদান-প্রদান করে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে পরিকল্পিতভাবে যদি কাজ করা যায় তবে ক্যাজুয়ালিটি কম হবে এবং কাজের সাফল্যও বেশি আসবে।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী হলি আর্টিজান বেকারিতে পরিচালিত সশ্রস্ত বাহিনীর এ্যাকশন সম্পর্কে বলেন, তখন রোজার দিনে অনেক রাত পর্যন্ত তিনি সকলকে নিয়ে গণভবনে বসে এর পরিকল্পনা ঠিক করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন বলেই মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে সফলতার সঙ্গে জঙ্গি দমন এবং জিম্মি উদ্ধার সম্ভব হয়।

পারস্পরিক তথ্য আদান-প্রদানে সকল গোয়েন্দা সংস্থাকে নিয়ে একটি টিম করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে যখন যে তথ্য আসে তিনি তা অন্যদের জানানোরও নির্দেশ প্রদান করেছেন। সেই সঙ্গে এই টিমের নিয়মিত বৈঠক আয়োজনে স্বরাষ্ট্র সচিব এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ প্রদান করেন।

তিনি তথ্য বিনিময় ও পরিকল্পনা না করে এককভাবে শুধু ক্রেডিটের জন্য অপারেশন পরিচালনা করা থেকে বিরত থাকার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এখানে একক ক্রেডিট নেয়ার কোনো ব্যাপর নয়, কাজের ঝুঁকির কথাও চিন্তা করতে হবে। কারণ, যেখানে জীবন-মরণের প্রশ্ন সেখানে অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে তথ্য এবং সাহায্য নিতে হবে।

এ সময় সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ নির্মূলে গণমানুষকে সরকারের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘জনগণই কিন্তু ক্ষমতার মূল উৎস। তাই আমরা যদি এসব কাজে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারি তাহলে কাজগুলো আরো সহজ হয়ে যায়।’

সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ উচ্ছেদে তাঁর সরকারের সারা দেশের মসজিদের ইমাম, শিক্ষক, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধিসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে গণসচেতনতা গড়ে তোলার উদ্যোগকে স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে পারার কারণেই আমরা এই সামাজিক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছি। কারণ, মানুষই কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় খবর সরবরাহ করছে। যে কারণে, বিশ্বের অনেক দেশ আজকে অবাকই হয়ে যায় যে এতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে আমরা কিভাবে এটাতে সফল হতে পারছি।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের সময় দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, বিশ্ব মন্দার মধ্যেও ৭ দশমিক ২৮ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মাথাপিছু আয় ১৬১০ ডলারে পৌঁছানো, একই সঙ্গে দারিদ্র্য হ্রাসের সাফল্যে বিশ্বের উন্নত দেশও বিস্মিত হয়েছে।

এ সময় তিনি তাঁর সরকারের আমলে বিনামূল্যে বই এবং শিক্ষাবৃত্তি, উপবৃত্তি প্রদান এবং খেলাধুলায় অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে সমসাময়িক কালের আরেকটি ভয়ানক সামাজিক ব্যাধি মাদক সমস্যা সমাধানে পুলিশ বাহিনীকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, সমাজে একটা সমস্যা এখন দেখা দিচ্ছে সেটাও ব্যাপক, জঙ্গিবাদের মতোই আরেকটা সমস্যা, সেটা হলো মাদকের সমস্যা- এই মাদকাশক্তি আজকে সমাজ ধ্বংস করছে। এটার নিরসনে আমাদের আরো কঠোর হতে হবে।

এ ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীকে আরো তৎপর হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সরকার প্রধান বলেন, এই মাদক কোথা থেকে আসে, কারা এই মাদকের ব্যবসা করে, কারা গ্রহণ করে তাদের বিষয়ে আপনাদের আরো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই কারণে যে বহু মেধাবী ছাত্র এতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তাদের পরিবারের ওপর রীতিমত জুলুম-অত্যাচার হচ্ছে।

পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঠিক যেভাবে জঙ্গিবাদ দমন করেছেন, সেভাবেই এখন মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে।

তাঁর সরকারের সময়ে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি স্থিতিশীলতা বজায় থাকায় বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। তাতে মানুষের মধ্যে আরো কর্মচাঞ্চল্য বৃদ্ধি পাবে, আমাদের অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে, উন্নত হবে।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সারা দেশে ১০০ নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ তুলে ধরে বলেন, ইতিমধ্যে দেশে প্রায় ৪৪ ভাগ বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় হয়েছে এবং রপ্তানি ক্ষেত্রে নতুন নতুন পণ্য সংযোজনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

যিনি যে কাজটি করবেন তাতে যেন উপযুক্ত পারদর্শিতা অর্জন করতে পারেন এবং দক্ষতার সঙ্গে যেন দায়িত্ব পালন করতে পারেন তা নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য-এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারণ, প্রশিক্ষণ ছাড়া কোন উৎকর্ষ সাধন হয় না।

দেশে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজমান থাকলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিটা ত্বরান্বিত হয় উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর কাছে কিছু চাইতে হয় না। তাঁর সরকার নিজ থেকেই প্রয়োজনগুলো দেখে তা সমাধানের উদ্যোগ নেয়।
আর দেশের উন্নয়ন করতে হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনীরও উন্নয়ন প্রয়োজন এবং তারা যেন নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালন করতে পারে সে সুযোগটাও সৃষ্টি করা দরকার, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শীতের জন্য ড্রেসের সঙ্গে হাফস্লিভ সোয়েটার প্রদান এবং পুলিশের গ্রেড সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে সিনিয়র পুলিশ সদস্যদের দাবির প্রেক্ষিতে সমস্যা সমাধানের আশ্বান প্রদান করেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা যতটা বাড়বে আমরা আপনাদের চাহিদাগুলোও ততটাই পূরণ করতে পারব এবং আমরা যে এটা বাড়াচ্ছি তা আপনারা নিজেরাই টের পাচ্ছেন।

পুলিশকে আরো জনবান্ধব হওয়ার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশের একটি পুরাতন প্রবাদ ‘বাঘে ছুঁলে এক ঘা, আর পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা’ যেন মিথ্যা প্রমাণ হয়। জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে তিনি পুলিশ সদস্যদের সচেষ্ট থাকার আহ্বানও জানান।

তিনি বলেন, মানুষ যেন মনে করে, এই পুলিশ আমাকে সাহায্য করবে বা আমার পাশে আছে। সেই ভরসা ও বিশ্বাসের জায়গাটা পুলিশ ধীরে ধীরে অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছে। 

দেশে মানবিক কারণে আশ্রয় দেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে গতকাল পর্যন্ত ৯ লাখ পরিচয়পত্র বিতরণ করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদানে পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, এপিবিএন, প্রশাসন- প্রত্যেকেই সুষ্ঠুভাবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে চলেছে এবং তাদের দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের খোঁজ-খবর নিতে দেশে ভিআইপিদের আগমন বেড়ে যাওয়াতেও পুলিশকে তাদের নিরাপত্তা প্রদান এবং অতিরিক্ত প্রটোকলের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী ‘আইপিইউ’ এবং ‘সিপিইউ’ সম্মেলনে পুলিশ সদস্যদের ভূমিকার প্রশংসা করেন।

দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধী, জাতির পিতার খুনিদের দোসর এবং বিএনপি-জামায়াত চক্রের অপপ্রচার অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এরা অযথা বিভিন্ন দেশে দেশে আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু যারা বাংলাদেশে আসছে তারা এসে দেশের প্রকৃত অবস্থা দেখে বিস্মিত হচ্ছে।

এ সময় তিনি সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরো তৎপর ও কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রযুক্তি যেমন আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজ করে দিচ্ছে, আবার প্রযুক্তিই ক্ষেত্র বিশেষে সমস্যারও সৃষ্টি করছে। কাজেই এই সমস্যা সমাধানে আমাদের আরো উদ্যোগী হতে হবে।


মন্তব্য