kalerkantho


'কথা না শুনলে অস্ত্র ধরবো, নইলে জেলে পাঠাবো'

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১২ জুন, ২০১৮ ২০:০৯



'কথা না শুনলে অস্ত্র ধরবো, নইলে জেলে পাঠাবো'

কামরাঙ্গীর চর থানার ওসি শাহীন ফকির

রাজধানীর কামরাঙ্গীর চর থানা ছাত্রলীগের একাংশকে একের পর এক হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন কামরাঙ্গীর চর থানার ওসি শাহীন ফকির। কেরানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শাহীন আহমেদের অনুসারী কামরাঙ্গীর চরের নেতাদের মামলা-জেলে পাঠানোসহ অস্ত্রের হুমকি দিচ্ছেন।

উপজেলা চেয়ারম্যান সমর্থক নেতাকর্মীদের হুমকি দিয়ে ওসি শাহীন ফকির বলছেন, শাহীন চেয়ারম্যানের সঙ্গ ছেড়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের পক্ষে থাকতে হবে। তাঁর প্রচারণা চালাতে হবে। নইলে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে তাদের। সোজা কথায় না হলে ওসি শাহীন ফকির ছাত্রলীগ নেতাদের অস্ত্রের হুমকিও দেন বলে অভিযোগ করছেন নেতাকর্মীরা। ইতিমধ্যে ওসি শাহীন ফকিরের কথা না শোনায় অনেকের বাড়িতে পুলিশি অভিযান হয়েছে এবং অনেকেই শাহীন ফকিরের ভয়ে এলাকা ছাড়া হয়ে আছে। 

বেপরোয়া ওসি শাহীন ফকির
এই পরিস্থিতিতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ক্ষুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, 'ওসি শাহীন ফকির তো মনে হচ্ছে পুলিশের ওসি নয়, খাদ্যমন্ত্রীর ওসি। খাদ্যমন্ত্রীর পক্ষে তিনি বেপরোয়া হয়ে মাঠে নেমেছে। যারা উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ সমর্থক, তাদেও কামরাঙ্গীর চর ছেড়ে কেরানীগঞ্জে বিতারিত করার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে। ওসি শাহীনের কারণে শুধু ছাত্রলীগই নয়, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও নিরাপদ নয়। 

থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহবায়ক এম এইচ মাসুদ বলেন,  সম্প্রতি ওসি শাহীন ফকির আমাকে ফোন দিয়ে বলেছেন, খাদ্যমন্ত্রীর পক্ষে থাকতে হবে। তাঁর জন্যই কাজ করতে হবে। আর কেরানীগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদের সঙ্গ ত্যাগ করতেই হবে। ওসি শাহীন ফকির হুমকি দিয়ে আমাকে বলেন, 'তুমি হিসাব নিকাশ করে কাজ কর, তাইলেই তুমি সেভে থাকবা আর বাঁচতে পারবা। নইলে কিন্তু খবর আছে। আমার কথা না শুনলে কারো ওপর বেত ধরবো, কিংবা কারো ওপর ধরবো অস্ত্র। কাউকে জেলে পাঠাবো। ওইসব যেন আমার করতে না হয়। এখানে আমি জানি খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম আছে এবং কামরুলই থাকবে বলে হুমকি দেয় আমাকে। উনার কথার জবাবে আমি বলেছি, আপনি আমাকে মামলা দেন জেল দেন আর গুলি করে মেলে ফেলেন, কিন্তু উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গেই থাকবো ।

কামরাঙ্গীর চর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাইদুর রহমান রতন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমাকে ভয় দেখাচ্ছে। আমার সঙ্গের নেতাকর্মীদের ভয় দেখাচ্ছেন থানা ওসি। শাহীন চেয়ারম্যানের সমর্থন করলে কামরাঙ্গীর চর ছেড়ে কেরানীগঞ্জ যাওয়া জন্য হুমকি দেন। না হলে আমার কপালে নাকি খারাপ আছে। 

ক্ষুদ্ধ কণ্ঠে রতন বলেন, 'ওসি শাহীন ফকির খাদ্যমন্ত্রীর পক্ষে প্রকাশ্যেই মাঠে নেমেছেন। ওনার আচরণ দেখে মনে তিনি মন্ত্রীর ক্যাডারের ভূমিকায়। এমনটি হলে আমরা কীভাবে রাজনীতি করবো?

খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের সমর্থক ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেন, 'ওসি শাহীন ফকিরের কারণে আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকেছে। সাধারণ মানুষের কথা কী বলবো? আমার কলেজপড়ুয়া ছেলেকে ওসি শাহীন ফকিরের নির্দেশে টেনে হেঁচড়ে মারতে মারতে নিয়ে যায়। ছেলের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছাড়াই নির্মমভাবে পিটিয়ে আহত করে পুলিশ। আওয়ামী লীগটা শেষ করে ফেলছে এই শাহীন ফকির।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক  কয়েকজন আওয়ামী লীগের নেতা বলেন, 'বিএনপির সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীর হাত ধরে শাহীন ফকিরের পুলিশে নিয়োগ। এই ওসি পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতির ভাগ্নে জামাই। ওসি শাহীন ফকির নিজের একজন ছাত্রদলের ক্যাডার ছিলেন। এলাকার ২০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ করেছেন। সেই ছাত্রদল নেতা শাহীন ফকির তো আওয়ামী লীগ আর ছাত্রলীগকে পিটিয়ে শেষ করবেই। টাকা ছাড়া কিছুই চেনে না সে। প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের না ধরে ভালো ভালো পরিবারের লোকজনকে গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়ে মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বেশিরভাগ থানার পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান করলেও তাঁর ভয়ে কেউ কিছুবই বলে না।

রাজধানীর কামরাঙ্গীর চর থানার ওসি শাহিন ফকির এভাবেই রাজনীতির ছরি ঘোরাচ্ছেন এলাকায়। রাজনীতিবিদ আর জনপ্রতিনিধি নয়, শাহীন ফকিরের কথাই চলছে কামরাঙ্গীর চর থানা এলাকার তিনটি ওয়ার্ড। যেন এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন তিনি। 

এদিকে, কেরানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা শাহীন আহমেদকে উদ্দেশ করে ওসি বলে বেড়ান, 'সে যদি নমিনেশন পায় আমি ওসিগিরি ছাইরা দিমু। তার হয়ে কেউ যদি এখানে টু টা শব্দ করে, এক্কেবারে গলায় পাড়া দিয়া যা করার করবো।'

তবে ওসি শাহিন ফকিরের এমন আচরণে ফুঁসে উঠেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা হয়ে যেভাবে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন, এভাবে চলতে থাকলে কামরাঙ্গীর চরবাসী যেকোনো সময় বড় ধরনের কিছু ঘটিয়ে দিতে পারে।

জানা গেছে, গত ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে রাজধানীর উপকণ্ঠ হিসেবে পরিচিত কামরাঙ্গীর চর এবং সাভারের ভাকুর্তার সঙ্গে কেরানীগঞ্জের কিছু অংশ মিলিয়ে গঠন করা হয় সংসদীয় আসন ঢাকা-২। বর্তমানে এ আসনে ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত সংসদ সদস্য খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম।

তবে বর্তমান সরকারের শাসনামলে নিজের দপ্তরের বেশকিছু অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় এবং নানা বিষয়ে অতিকথনের কারণে সরকারে এবং দলে বেকায়দায় আছেন তিনি। পাশাপাশি আগামী নির্বাচনে তরুণদের নেতৃত্বকে প্রাধান্য দেওয়ার মনোভাব প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সব পরিস্থিতি বিবেচনায় এই আসনে নৌকার কাণ্ডারি হতে জোরালো প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন কেরানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ।

সম্প্রতি সময়ে কামরাঙ্গীর চর একাধিকবার বাধাগ্রস্থ হয়েছেন শাহীন আহমেদ। অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম সমর্থিতরা শাহীন আহমেদকে প্রতিহত করতে সর্বোচ্চ অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে বলে অভিযোগ। এ কাজে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে কামরাঙ্গীর চর থানার ওসি শাহীন ফকিরকে।


মন্তব্য