kalerkantho


নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণহানি

অশ্রুসজল ভালোবাসায় সমাহিত প্রিয় মুখগুলো

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় নিহতদের বেশ কয়েকজনকে নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। এর আগে সোমবার নেপাল থেকে নিহত ২৩ জনের মরদেহ ঢাকায় আনা হয়। এরপর বনানী আর্মি স্টেডিয়ামে গণজানাজা শেষে শোকার্ত স্বজনের কাছে মরদেহ তুলে দেওয়া হয়। ১২ মে দুর্ঘটনার পর এদিন আবারও প্রিয়জনের কফিন আঁকড়ে কেঁদে বুক ভাসায় শোকার্ত স্বজনরা। এসংক্রান্ত খবর পাঠিয়েছেন আমাদের স্থানীয় ব্যুরো, নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা।

প্রাণহীন শশী বাড়ি ফিরলেন হিমশীতল অ্যাম্বুল্যান্সে : মাঝেমধ্যে শশী যখন বাড়ি আসতেন তিনতলার বারান্দায় মা কামরুন নাহার বেলি দাঁড়িয়ে থাকতেন মেয়ের অপেক্ষায়। শশীর তর সইত না, গেট থেকেই ছুট দিতেন মাকে জড়িয়ে ধরতে। শান্ত নিরিবিলি তিনতলার ফ্ল্যাটটি মুহূর্তে মুখর হয়ে উঠত হাসি-ঠাট্টা আর গল্পে। শশী গতকালও বাড়ি ফিরেছেন। তবে হিমশীতল অ্যাম্বুল্যান্সে শুয়ে। বারান্দায় মা নেই। একমাত্র মেয়ের শোকে তিনি শয্যাশায়ী। তাঁকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে অশ্রুসজল অন্য স্বজনরাও। আর একটি চেয়ারে বসা বাবা ডা. রেজা মহম্মদ যেন শোকে পাথর।

উড়োজাজ দুর্ঘটনায় নিহত তাহিরা তানভিন শশী রেজার মরদেহ গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার ঢাকা সিএমএইচ থেকে মানিকগঞ্জের পশ্চিম দাশড়া এলাকার বাড়িতে আনা হয়। দুপুর ২টায় মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজ মাঠে জানাজা শেষে শশীকে দাফন করা হয় মানিকগঞ্জ পৌরসভার সেওতা কবরস্থানে দাদির কবরের পাশে।

শেষ ঠিকানায় রিমন : বাড়িময় শোকের স্তব্ধতা। কেবল সন্তানহারা এক মা মাঝে মাঝেই ডুকরে কেঁদে উঠছেন। তিনি উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় নিহত এস এম মাহমুদুর রহমান ওরফে রিমনের মা লিলি বেগম। সন্তানহারা মায়ের কান্না থামাতে পারছে না কেউই। পাশেই বসে ছিলেন শোকস্তব্ধ বাবা মশিউর রহমান। পাশের একটি কক্ষে নীরবে বসে ছিলেন স্ত্রী সানজিদা।

গতকাল সকাল সোয়া ১০টার দিকে ফরিদপুরের নগরকান্দার লস্করদিয়া গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে রিমনকে দাফন করা হয়। এর আগে ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ঢাকা থেকে রিমনের কফিন বাড়ির উঠানে এসে থামে। সকাল ১০টার দিকে লস্করদিয়া আতিয়ার রহমান উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় রিমনকে। এর আগে গতকাল সকাল ৯টার দিকে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়া রিমনের বাড়িতে এসে স্বজনদের গভীর সমবেদনা জানান। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিনি এক লাখ টাকা তুলে দেন রিমনের মায়ের হাতে। 

আখতারা বেগম সমাহিত : বিমান দুর্ঘটনায় নিহত আখতারা বেগমের দ্বিতীয় দফা জানাজা গতকাল চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে ভোরে তাঁর মরদেহ ঢাকা থেকে বাঙ্গাবাড়ী ইউনিয়নের বেগুনবাড়ী গ্রামে আনা হয়। পরে তাঁর শ্বশুরবাড়ির সামনে অনুষ্ঠিত জানাজায় আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসী অংশ নেয়। জানাজা শেষে তাঁর লাশ রাজশাহী নেওয়া হয়। সেখানে তৃতীয় দফা জানাজা শেষে কবরস্থানে দাফন করা হয়। জানাজায় রাজশাহী সিটি মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, রাজশাহী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী সরকার, মহানগর ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি লিয়াকত আলী লিকুসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ শরিক হয়।

নেপালে উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় তাঁর স্বামী মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলামও নিহত হন। আজ বুধবার তাঁর মরদেহ দেশে আনার কথা রয়েছে বলে জানায় স্বজনরা। এই দম্পতি বসবাস করতেন রাজশাহী উপশহরে।

বাড়ির আঙিনায় শেষশয্যা ফয়সালের : বিমান দুর্ঘটনায় নিহত আহম্মেদ ফয়সালের মরদেহ সোমবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে জন্মস্থান ডামুড্যার নিজ বাড়িতে আনা হয়। এ সময় স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়ে। গতকাল সকাল ১০টায় পূর্ব মাদারীপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ মাঠে জানাজা শেষে তাঁকে নিজ বাড়ির আঙিনায় দাফন করা হয়। কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং শোকার্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে প্রশাসন, রাজনীতিবিদ, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ভিড় জমায়।

নোয়াখালীর তিনজনের দাফন : উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় নিহত নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার একই পরিবারের তিনজনকে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। গতকাল সকালে উপজেলার কেশারখিল গ্রামের সাতানি ভূঁইয়া বাড়ির সামনে তাঁদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয়রা অংশগ্রহণ করে।

এর আগে ভোর ৫টায় মরদেহ ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি আনা হয়। নিহতরা হলেন রফিক জামান রিমু, তাঁর স্ত্রী ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সমন্বয়ক সানজিদা হক বিপাশা এবং তাঁদের সাত বছরের ছেলে অনিরুদ্ধ।

অশ্রুসজল ভালোবাসায় সমাহিত পলাশ : সোনাগাজীর আউরারখিল গ্রামের মতিউর রহমান পলাশের মরদেহ গতকাল সকালে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে গতকাল ভোর সাড়ে ৪টায় তাঁর কফিনবাহী অ্যাম্বুল্যান্স বাড়ি এসে পৌঁছে। এ সময় স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়ে। মায়ের ইচ্ছামতো শুধু তিনিই শেষবারের মতো দেখলেন নিজের নাড়িছেঁড়া ধনকে। আর কাউকে তাঁর লাশ দেখতে দেওয়া হয়নি।

পিয়াসের অপেক্ষায় পরিবার : উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় নিহত বরিশালের পিয়াস রায়ের বাবা নেপাল থেকে ফিরে এসেছেন খালি হাতে। মরদেহ শনাক্ত না হওয়ায় সোমবার বিকেলে ইউএস-বাংলার একটি ফ্লাইটে তিনি নেপাল থেকে ঢাকায় ফিরেছেন।

ঢাকায় অবস্থানরত পিয়াসের বোন জামাই কালের কণ্ঠকে জানান, পিয়াসের বাবা সুখেন্দু বিকাশ রায় ১৫ মে কাঠমাণ্ডুতে পৌঁছেন। সেই থেকে পিয়াসের মরদেহ শনাক্ত করতে তিনি সেখানেই অবস্থান করছিলেন। কিন্তু সুখেন্দু বিকাশ রায় নেপালে পৌঁছতে বিলম্ব হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মেডিক্যাল টিম ও সিআইডি কর্মকর্তারা পিয়াসের মরদেহের নমুনা সংগ্রহ করতে পারেননি। সিআইডি ও চিকিৎসক প্রতিনিধিদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘পিয়াস এমনভাবে দগ্ধ হয়েছে যে সাধারণ চোখে মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব নয়। তাই পিয়াসের মরদেহের সংগৃহীত বিভিন্ন টিস্যুর সঙ্গে বাবার (শ্বশুর) রক্ত টিস্যু মিলিয়ে লাশ শনাক্ত করা হবে। এ জন্য এক থেকে দেড় সপ্তাহ সময় লাগবে।’

 

 



মন্তব্য