kalerkantho


সৌদিতে অগ্নিকাণ্ডে ছয় বাংলাদেশির মৃত্যু

মাকে সুস্থ করা হলো না কালীগঞ্জের হিমেলের

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর ও নরসিংদী প্রতিনিধি   

১৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



মেরুদণ্ডের হাড় ভাঙা মায়ের চিকিৎসার খরচ চালাতে বিদেশ গিয়েছিলেন গাজীপুরের কালীগঞ্জের হিমেল ভুঁইয়া (২৪)। আর টানাপড়েনের সংসারে একটু স্বস্তি আনার জন্য এনজিও ও বিভিন্নজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিলেন নরসিংদীর মাধবদীর তরুণ রবিন। কিন্তু সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুড়ল তাঁদের স্বপ্নও। বিদেশ যাওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যেই তাঁদের ফিরতে হচ্ছে লাশ হয়ে।

গত শুক্রবার সৌদি আরবের রিয়াদে একটি ভবনে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ছয়জনের মধ্যে দুজন হলেন হিমেল ভুঁইয়া ও রবিন। বাকিরা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও সিলেটের।

গাজীপুরের কালীগঞ্জের নিহত হিমেল ভুঁইয়া উপজেলার তুমলিয়া ইউনিয়নের উত্তরসোম (মিরাপাড়া) গ্রামের মো. মোজাম্মেল হক ভুঁইয়ার ছেলে। অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে বিদেশ গিয়ে তাঁর মৃত্যুর খবরে পরিবারে চলছে এখন শোকের মাতম।

গতকাল রবিবার সকালে হিমেলের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে পুত্র শোকে বাবা মোজাম্মেল হক ও মা খালেদা আক্তার বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। দুই ছোট ভাই মাহিন (৯) ও লামিম (৬) বাক্রুদ্ধ। বাবা-মাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে হিমেলের দাদা-দাদি, চাচা-ফুফুসহ আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীরা সবাই কাঁদছে।

মা খালেদা আক্তার জানান, তাঁর মেরুদণ্ডের হাড় ভাঙা। হিমেলের বাবা একার রোজগারে সংসার ও চিকিৎসা খরচ সামলাতে হিমসিম খাচ্ছিলেন। তাই তাঁর চিকিৎসার খরচ জোগাতে বিদেশ পাড়ি দেন ছেলে। গত ১২ এপ্রিল শেষবার হিমেলের সঙ্গে বাড়ির সবার সঙ্গে কথা হয়। সেখানে অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছিলেন বলেও ফোনে হিমেল তাঁদের জানিয়েছিলেন। এমন করুণ পরিণতি হবে জানলে কিছুতেই ছেলেকে বিদেশে পাঠাতেন না জানিয়ে অঝরে কাঁদতে থাকেন তিনি।

বাবা মোজাম্মেল হক ভুঁইয়া জানান, তিনি উপজেলা সাবরেজেস্ট্রি অফিসের অধীন দলিল লেখক। তাঁর তিন ছেলের মধ্যে হিমেল ছিলেন বড়। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি হিমেল সৌদি আরবে যান। সেখানে নূরাহ বিনতে আব্দুল রহমান ইউনিভার্সিটিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে যোগদান করেন। রাতের শিফটে ডিউটি শেষ করে ওই ইউনিভার্সিটির আবাসিক ভবনে ঘুমন্ত অবস্থায় হিমেল দুর্ঘটনার শিকার হন। ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় সৌদিতে অবস্থানকারী মোতালেব নামের এক বাংলাদেশি সহকর্মীর মাধ্যমে প্রথম সংবাদ পান তাঁরা।

তিনি আরো জানান, ঢাকার বাড্ডার শাহজাদপুর এলাকার কোকিল ট্রাভেলসের মাধ্যমে চার লক্ষাধিক টাকা খরচ করে হিমেল সৌদি আরব যান। ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী রাসেল আহমেদ ও তুহিন হোসেন হিমেলকে ওই দেশের মাজিন আর্কিটেকচারাল কম্পানিতে কাজ দেওয়ার কথা বলে টাকা নেয়। কিন্তু সেখানে নিয়ে তাঁকে প্রায় তিন মাস বসিয়ে রাখা হয় এবং ওই সময় খেয়ে না খেয়ে অনেক কষ্টে দিন অতিবাহিত করেন। হিমেল ফোনে বাড়িতে ওই সব ঘটনার কথা প্রায়ই জানাত। তিন মাস বসে থাকার পর চলতি মাসের ২ তারিখে নূরাহ ইউনিভার্সিটিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজে যোগ দেন।

মৃত্যুর খবর জেনে শনিবার রাতে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার খন্দকার মু. মুশফিকুর রহমান নিহত হিমেল ভুঁইয়ার বাড়িতে যান। ইউএনও শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জানান এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এ সময় হিমেলের পরিবার তাঁর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতা কামনা করেন।

হিমেলের সঙ্গে একই দুর্ঘটনায় মারা যান নরসিংদীর মাধবদীর রবিন। এই খবরে তাঁর পরিবার এখন শোকে স্তব্ধ। রবিন মাধবদী থানার কাঁঠালিয়া ইউনিয়নের আবুল হোসেনের ছেলে। ছয় লাখ টাকা ধারদেনা করে বিদেশে পাড়ি জমানো রবিনের স্বপ্ন ছিল ঋণ পরিশোধ করে সংসারের অভাব দূর করা। একদিকে ছেলে হারানো, অন্যদিকে ঋণ পরিশোধের চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে পরিবারের সদস্যরা।

গত শুক্রবার বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ১০টায় রিয়াদের একটি ভবনে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আরো পাঁচ বাংলাদেশিসহ রবিনের মারা যাওয়ার খবর পায় পরিবার। এরপর থেকে বিলাপ করতে করতে এখন শোকে স্তব্ধ হয়ে আছে পরিবারের সদস্যরা।


মন্তব্য