kalerkantho


আম্রময় রাজশাহী

গোপালভোগে প্রতীক্ষার অবসান, আসছে অন্যরাও

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

২৬ মে, ২০১৮ ০০:০০



গোপালভোগে প্রতীক্ষার অবসান, আসছে অন্যরাও

রাজশাহী পুঠিয়ার ঐতিহ্যবাহী আমের হাট বারেনশ্বর। এই হাট থেকে পাইকাররা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আম কিনে নিয়ে যান। আম পাড়ার নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়ায় এখন পরিপক্ব আম বাজারে আসছে। ছবিটি গতকাল দুপুরে তোলা। ছবি : সালাহ উদ্দিন

বৈশাখ শেষ হওয়ার আগে থেকেই গ্রামে কিশোর-কিশোরীদের আলাদা নজর থাকে—কোন গেছে কখন আম পাকে। সে এক অন্য রকম মধুর প্রতীক্ষার সময়। সেই নজর, সেই মধুর প্রতীক্ষা বড়দেরও থাকে। আম চাষি ও ব্যবসায়ীদের তো বটেই। বাণিজ্যিকভাবে আম চাষের প্রাণকেন্দ্র রাজশাহীতে সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়েছে গোপালভোগ। আমের রাজার গোপালভোগের পিছু পিছু আসছে স্বাদে গন্ধে একটা থেকে আরেকটা সেরা লেঙরা, হিমসাগর, লোকনাও। ফলে রাজশাহীর বানেশ্বর আর চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট—দেশের বৃহত্তম দুই আমের মোকামকে কেন্দ্র করে ঘুরতে শুরু করেছে রাজশাহীর অর্থনীতি। ভোর হতে না হতেই আম পাড়া, দুপুরের মধ্যেই আম বেচাকেনা এবং সন্ধ্যার মধ্যেই প্যাকেজিং শেষে আমবাহী গাড়িতে ওঠানো। যেন আম্রময় উঠছে চারদিক।

এবার রাজশাহীর আমকেন্দ্রিক ব্যস্ততা আরো বেড়েছে। কারণ এবার আমের উৎপাদনও বেড়েছে। চলতি মৌসুমের শুরুর দিকে গাছে মুকুল দেখে বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, এবার আমের বাম্পের ফলন হবে। শুধু ফলন বেশি নয়। আম চাষের জমির পরিমাণও বেড়েছে। রাজশাহীর ফল গবেষণা কার্যালয়ের এক হিসাব মতে, গত ছয় বছরে রাজশাহীতে আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে দ্বিগুণ। চলতি বছর রাজশাহীতে আমের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৪২০ হেক্টর জমিতে, যা এর আগে এত পরিমাণ জমিতে আম চাষ কখনোই হয়নি। এর আগের বছর (২০১৭) ১৬ হাজার ৯৬১ হেক্টর জমিতে আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা ২০১৬ সালের বেশি ছিল।

দেশজুড়ে রাজশাহীর আমের চাহিদাই এখানে আম চাষে উৎসাহ বাড়িয়েছে চাষিদের। আশা করা হচ্ছে, এবার রেকর্ড পরিমাণ আম উৎপাদন হবে রাজশাহীতে। ইতিমধ্যে সরকারি নির্দেশনা মেনে রাজশাহীর বাজারগুলোতে জমতে শুরু করেছে আমের বাজার। বাজারে এখন আমের রাজা গোপালভোগসহ আটি আমসহ বিভিন্ন জাতের আমের পশরা বসতে শুরু করেছে। ফলে রাজশাহীর আম যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। গত দুই দিন সরেজমিনে ঘুরে ঘুরে দেখা গেছে এসব দৃশ্য।

গত কয়েক দিন থেকেই রাজশাহীর বানেশ্বর বাজারে প্রতিদিন সকাল থেকে আম ওঠে। বেচাকেনা চলছে বিকেল পর্যন্ত। ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের দুই পাশে বানেশ্বর বাজারের মাঝখানে জমে আমের পশরা। এই আমই এখন বানেশ্বরের বাজারের মূল আকর্ষণ, এমনকি পুরো রাজশাহীরও বটে। প্রতিদিন এই বাজারে এখন অন্তত অর্ধকোটি টাকার আম কেনাবেচা চলছে। কদিন পর ছাড়িয়ে যাবে কোটি টাকা। তখন বাজারে পা ফেলার জায়গা থাকবে না। এই আম যাচ্ছে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রংপুর থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। যাবে বিদেশের মাটিতেও।

ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকারি নির্দেশনা মেনে গত ২০ মে থেকে বানেশ্বর বাজারে আম কেনাবেচা শুরু হয়। এখন দেশের সবচেয়ে বড় আমের হাট বসছে পুঠিয়ার বানেশ্বরে। এই হাটে এখন যেসব আম বেচাকেনা চলছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে গোপালভোগ ও আটি জাতের আম। কদিন পরই আসতে শুরু করবে লোকনা, ল্যাংড়া, দুধসর ও হিমসাগর জাতের আম। এই আমগুলো আসে জেলার পুঠিয়া, বাঘা, বাগমারা, দুর্গাপুর, পবা, মোহনপুর থেকে। এর বাইরেও কিছু আম আসছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর থেকে।

বানেশ্বরে দেখা হওয়া আম চাষি মুনসুর আলী জানান, এবার প্রতিমণ গোপালভোগ আম এখন বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৫০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা এবং গুটি জাতের আম ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা দরে। এবার রাজশাহীতে ঝড় এবং কয়েক দফা শিলার দেখা মিললেও আমের খুব একটা ক্ষতি হয়নি। ফলে গতবারের চেয়ে রাজশাহীতে এবার আমের ফলন অনেক বেশি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আমকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য পাল্টে দিয়েছে এ অঞ্চলের গ্রামীণ জনপদের অর্থনীতি। রাজশাহী অঞ্চলের দুটি বড় আমের মোকাম রাজশাহীর বানেশ্বর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট বাজার মিলে প্রতিদিন বেচাকেনা হচ্ছে অন্তত এক কোটি টাকার আম। আমের কারবার নিয়ে রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ৫০ হাজার মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থানও হয়েছে। গাছের আম নামানোর কামলা থেকে আম পরিবহন, আম চালানের ঝুড়ি বানানো এবং বাজারগুলোয় আমসংশ্লিষ্ট নানা কাজে এসব মানুষ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে।

বানেশ্বর বাজারে আম বিক্রি করতে আসা দুর্গাপুর উপজেলার নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাত সকালে উঠেই গাছ থেকে আম নামানো শুরু হয়। এরপর ঝুড়িতে করে আবার দুপুরের মধ্যেই নিয়ে আসতে হয় বানেশ্বর বাজারে। কারণ দুপুর পার হলে তখন আর আমের তেমন দাম পাওয়া যায় না। দুপুরের মধ্যেই পাইকারি ব্যবসায়ীর আম কেনা শেষ করেন।

এ বাজারের আম ব্যবসায়ী হোসেন আলী বলেন, বানেশ্বরে বিকেল সাড়ে ৩টা নাগাদ আম বেচাকেনা চলে। এর পরই শুরু হয় ঝুড়ি করা ও ট্রাকে ওঠানোর কাজ। তিনি প্রতিদিন অন্তত তিন লাখ টাকার আম ক্রয় করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেন।

ব্যবসায়ী আকবর হোসেন জানান, ভোররাত থেকে আম চাষিরা ভ্যান, ভটভটি, নসিমন, করিমনসহ স্থানীয় বাহনে করে আম নিয়ে বাজারে উপস্থিত হচ্ছে। ফড়িয়ারা এসব আম কিনে জমা করে আড়তে। আড়ত থেকে পাইকার ও চালানি ব্যাপারীরা আম কিনে ট্রাকে নিয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। তিনি আরো বলেন, ‘আম চাষির হাত থেকে পাইকারি ব্যবসায়ী এবং সেখান থেকে আম যায় আড়তে। আড়ত হয়ে পরে ওঠে ট্রাকে। এভাবে ধাপে ধাপে আমের দাম ও খরচও বাড়ে। সবচেয়ে বড় কথা, সর্বত্র যেন আম্রময় এক পরিবেশ।

 


মন্তব্য