kalerkantho


ঈদ যাত্রার যন্ত্রণা শুরু ঢাকায়ই আশপাশেও চাপ বাড়ছে

পার্থ সারথি দাস   

১৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



ঈদ যাত্রার যন্ত্রণা শুরু ঢাকায়ই আশপাশেও চাপ বাড়ছে

মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরিঘাটে যানবাহনের প্রচণ্ড চাপ। দীর্ঘ সময় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকায় ভোগান্তিও বাড়ছে।গতকাল বিকেল ৪টার ছবি। ছবি : কালের কণ্ঠ

স্থানে স্থানে জলকাদা জমে আছে। কোথাও হাঁ করে আছে ছোট-বড় গর্ত। কোথাও আবার নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা হয়েছে।চলতে চলতে আটকে আছে দূরপাল্লার বাস, ছোট বাহন। গতকাল মঙ্গলবার মেয়র হানিফ উড়াল সেতুর নিচের সড়কের ৫০০ মিটার পার হতেই ৪০ মিনিট লাগল তুরাগ পরিবহনের বাসটির। ঈদে বাস, ট্রেন ও লঞ্চে বাড়ি ফেরা শুরু হয়েছে রাজধানী থেকে। আজ বুধবার থেকে যাত্রীদের চাপ আরো বাড়বে। তবে বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও মহাসড়কে ওঠার আগেই প্রবেশপথে যাত্রীদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে। তুরাগের যাত্রী ইউসুফ আলী বললেন, ‘বাসএমন দোলে যে বসে থাকা যায় না। শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়েই যাচ্ছি।’ তুরাগ পরিবহনের বাস থেকে নেমে যাত্রাবাড়ী থেকে অন্য একটি বাসে কুমিল্লা যাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি।

গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে বেরিয়ে আমিনবাজার, মহাখালী বাস টার্মিনাল ছেড়ে আবদুল্লাহপুর, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে যাত্রাবাড়ী হয়ে কাঁচপুর, ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল থেকে যাত্রাবাড়ী হয়ে মহাসড়কে উঠতে গিয়েই যাত্রীদের পড়তে হচ্ছে যানজটে। ভুক্তভোগীরা জানায়, যাত্রাবাড়ী থেকে কাঁচপুর পার হতেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দুই ঘণ্টা লেগেছে। অন্যান্য প্রান্তেওএকই ভোগান্তি। ঢাকা-টাঙ্গাইল রুটের বাসচালক বাবুল মিয়া বলেন, মহাখালী থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে মহাখালী মোড়ে আসতে ২৫ মিনিট, মহাখালী ফ্লাইওভার থেকে কাকলী অংশে ডান দিকে মোড় নেওয়া বন্ধ করার সাইনবোর্ড রাখা হয়েছে। তার পরও অন্যান্য গাড়ির ডান দিকে মোড় নেওয়ার জন্য এ অংশে ২৫ মিনিট, জসীমউদ্দীন মোড়ে ২০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে।যাত্রাবাড়ী-সায়েদাবাদ সড়কে গতকাল দুপুরে যাত্রীদের বিপাকে পড়তে দেখা গেছে গাড়িজটে পড়ে। এদিকে মালিবাগ-মগবাজার উড়াল সেতুর হলি ফ্যামিলি অংশ থেকে সাতরাস্তা পর্যন্ত গাড়ির তীব্র চাপ গিয়ে ঠেকছে মহাখালী মোড় পর্যন্ত। তার আগে মহাখালী বাস টার্মিনাল অংশ পার হতেই যাত্রীদের অবস্থা করুণ।গতকাল সকালে তেজগাঁওয়ে গাড়ির জটে দাঁড়িয়ে অটোরিকশার যাত্রী শবনম আলম বললেন, ‘মিরপুর-১ নম্বর থেকে রওনা দিয়ে দুই ঘণ্টায়ও টার্মিনাল পৌঁছতে পারব না।’ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ইবনে আলম হাসান গত রবিবার মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য ১১ নির্দেশনা জারি করেন। তার মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে প্রবেশ ও বহির্গমনের মূল সড়কগুলোয় যানবাহনের চাপ কমানোর লক্ষ্যে ছোট যানবাহনকে বিকল্প মহাসড়ক ব্যবহারের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিতে বলা হয়েছে।  রাজধানী থেকে চট্টগ্রামসহ পূর্বাঞ্চলের ১৬ জেলায় যাতায়াত করতে হয় সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে। গতকাল সেখানে সড়কের ওপর গড়ে ওঠা শতাধিক কাউন্টারে ছিল ভিড়। মূল টার্মিনাল থেকে জনপথ মোড়, গোলাপবাগসহ সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় সড়কে গাড়ি পার্ক করা এবং গাড়ি ঘোরানোর ফলে সায়েদাবাদ থেকেই যানজট শুরু হয়। এই টার্মিনাল দিয়ে ৮৭টি রুটে দিনে ৭৯০টি বাস চলাচল করে থাকে স্বাভাবিক সময়ে।তখন গড়ে দিনে ৩৫ হাজার যাত্রী চলাচল করে থাকে। ঈদ যাত্রার শুরু থেকেই যোগ হয়েছে নতুন বাস। গাবতলী থেকে আমিনবাজার হয়ে ঢাকার প্রবেশপথটি অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে যানজটমুক্ত হতে পারছে না। ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল দিয়ে বিভিন্ন রুটে স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৩২ হাজার যাত্রী পরিবহন করা হয়। দিনে চলাচল করে এক হাজার বাস। এই টার্মিনালে যানজট প্রকট রূপ নিয়েছে।

মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে বেরোনোর সময় কমপক্ষে ছয়টিএবং ঢুকতে ৯টি স্থানে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে গাজীপুর চৌরাস্তা, টঙ্গীর চেরাগ আলী, স্টেশন রোড, আবদুল্লাহপুর মোড়, কুড়িল বিশ্বরোড, স্টাফ রোড, বনানী, কাকলী ও মহাখালী লেভেলক্রসিং।

গাজীপুর : দুই দিন বৃষ্টি না হওয়ায় গাজীপুরের ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক এবং ঢাকা বাইপাস ও টঙ্গী-সিলেট আঞ্চলিক সড়কে তেমন যানজট ছিল না। গতকাল ঘরমুখী যাত্রীদের গাড়ির চাপ বাড়া এবং বৃষ্টির পানিতে সড়ক তলিয়ে বিকেলে দেখা দেয় দীর্ঘ যানজট। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাজীপুর মহানগরীর সালনা থেকে চান্দনা চৌরাস্তা, চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ভোগড়া বাইপাস পর্যন্ত সড়কের উভয় প্রান্ত, বোর্ডবাজার, গাজীপুরা ও টঙ্গী বাজার, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কড্ডা, বাইমাইল ও কোনাবাড়ী, ঢাকা বাইপাস সড়কের ইটাহাটা থেকে ধীরাশ্রম পর্যন্তএবং টঙ্গী-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের টঙ্গী স্টেশন রোড থেকে পুবাইলের মীরের বাজার পর্যন্ত থেমে থেমে যানজট ছিল।

দুপুরের পর সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। দুপুর আড়াইটার দিকে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে ভোগড়া বাইপাস, বাসন, গাজীপুরা ও হোসেন মার্কেট এলাকায় ঢাকা-ময়সনসিংহ মহাসড়ক তলিয়ে যায়। ফলে যানবাহনের চাপ ও জলাবদ্ধতায় বিকেল থেকে ওই মহাসড়কে যানজট দেখা দেয়। সন্ধ্যার পর যানজট দীর্ঘ হতে থাকে। গাজীপুরের সালনা হাইওয়ে থানার ওসি বাসুদেব সিনহা জানান, ময়মনসিংহ মহাসড়কের প্রভাবে ঢাকা বাইপাস সড়কের ইটাহাটা থেকে ধীরাশ্রম পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার যানজট ছিল।

টাঙ্গাইল : গতকাল বিকেল থেকে টাঙ্গাইল বরাবরৎ মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাসের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। কর্তৃপক্ষও তৎপরএবার। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হয়েছে আইপি ক্যামেরা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রেকারের সংখ্যাও গত বছরের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে।

পাটুরিয়া : গতকাল বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। বিকেল ৪টা নাগাদ ঘাট থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ যানবাহনের সারি দেখা গেছে।বিআইডাব্লিউটিসির উপমহাব্যবস্থাপক জিল্লুর রহমান বলেন, এবার ঈদের ছুটি কম থাকায় হঠাৎ করে চাপ পড়বে। তিনি জানান, আটটি বড় আকারের রোরো, চারটি ‘কে’ টাইপ, ছয়টি ইউটিলিটি ফেরি দিয়ে যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। আগামীকালের মধ্যে আরো একটি রোরো ফেরি যোগ দেবে। মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার রিফাত রহমান শামিম জানান, ঈদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী তিন দিন পর্যন্ত ট্রাক পারাপার বন্ধ থাকবে। এ কয়েক দিন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকেই পাটুরিয়া ফেরিঘাটগামী সব ধরনের ট্রাক ফিরতি পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হবে।এ ছাড়া আরসিএল মোড় থেকে পাটুরিয়া ও আরিচা পর্যন্ত রোড ডিভাইডার স্থাপন করা হবে।

মাদারীপুর : শিবচরের কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌ রুটের লৌহজং চ্যানেলমুখে নাব্যতা সংকট দেখা দেওয়ায় বিকল্প চ্যানেলে ড্রেজিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে সংকট নিরসন না হলে ঈদে ঘরমুখো মানুষের বিড়ম্বনায় পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কালিয়াকৈর : ঈদে ঘরমুখো মানুষের জন্য উদ্বোধনের আগেই চন্দ্রা থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত ৫৩ কিলোমিটার চার লেন সড়ক গতকাল খুলে দেওয়া হয়।

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ও এশিয়ান হাইওয়ে (বাইপাস) সড়কে দুটি গাড়ি বিকল হয়ে ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ৪টি স্পটে দিনভর থেমে থেমে যানজটের সৃষ্টি হয়।

[প্রতিবেদনের জন্য আরো তথ্য পাঠিয়েছেন আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি শরীফ আহমেদ শামীম, মাদারীপুর প্রতিনিধি আয়শা সিদ্দিকা আকাশী, মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি সাব্বিরুল ইসলাম সাবু, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি অরণ্য ইমতিয়াজ ও কালিয়াকৈর প্রতিনিধি মাহবুব হাসান মেহেদী]


মন্তব্য