kalerkantho


রাঙামাটির সড়ক সংস্কার প্রশ্নবিদ্ধ

১৪ কোটিতে পকেট ভারী, ফের আসছে ২০০ কোটি টাকা

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি   

১৪ জুন, ২০১৮ ০০:০০



‘সড়ক বিভাগের কর্তারা নিজেদের পকেট ভারী করার চিন্তায় মশগুল ছিল, আমাদের স্বার্থ ভাবেনি। তারা যে ব্রিজটা করেছে সেটা তো আমাদের কোনো কাজেই আসেনি, আমরা পাহাড়ের পাশের আগের সড়ক দিয়েই গাড়ি চালাচ্ছি, তবে এত খরচায় ব্রিজটি করা হলো কেন? এই ব্রিজ দিয়ে তো আমরা গাড়ি চালাতে পারি না। আর তারা বিভিন্ন স্থানে গাছ গেড়ে যে সড়কের সংস্কারকাজ করল, এটা তো এখন আর কোথাও হয় না। তারা প্রতিরক্ষা দেয়াল না করে বেহুদাই টাকা পানিতে ফেলেছে আর নিজেদের পকেটে ভরেছে।’ ২০১৭ সালের দুর্যোগের পর রাঙামাটির সড়ক সংস্কারের কাজ নিয়ে নিজের ক্ষোভ এভাবেই ঝাড়লেন রাঙামাটি বাস মালিক সমিতির সভাপতি মঈনুদ্দিন সেলিম।

২০১৭ সালের ১২ জুন থেকে ভারি বর্ষণের পর রাতেই বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে রাঙামাটিতে নিহত হয় ১২০ জন, আহত হয় ১৯২ জন। এ সময় জেলার সাতটি সড়ক ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সাত সড়কের ১৪৫টি স্থানে পাহাড়ধস এবং তিনটি স্থানে রাস্তা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ১১৩ স্থানে সড়কের পাশের অংশ ভেঙে যায়। এসব সড়ক সংস্কার করতে তাত্ক্ষণিক বরাদ্দ মেলে ১৪ কোটি টাকা, যা এক বছর ধরে কাজ করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এবার ওই সড়ক সংস্কারে ফের ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের আয়োজন চলছে।

এ সংস্কারকাজ শুরুর পর থেকেই কাজের মান নিয়ে দেখা দেয় নানা প্রশ্ন। তাড়াহুড়ো করে দরপত্র ডাকা ছাড়াই এই কাজের বেশির ভাগই করেছেন জেলার প্রভাবশালী ঠিকাদারই। শহরের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট গাছের ডালপালা কেটে বল্লি মারা (মাটিতে গাছ পোঁতা) আর মাটির বস্তা ফেলেই শেষ করা হয় এসব কাজ।

রাঙামাটি-বান্দরবান, রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের অস্থায়ী প্রতিরক্ষার জন্য ১০ থেকে ১১ জন ঠিকাদার কাজ করেন, যাঁদের বেশির ভাগই প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ঠিকাদার বলেন, ‘এ কাজের স্থায়িত্বকাল ছিল ছয় মাসের। সড়ক বিভাগ পরিকল্পনা করতে করতে দিন পার করেছে, এ জন্য সড়কের করুণ অবস্থা।’ তিনি দাবি করেন, ঠিকাদারদের চেয়ে সড়ক বিভাগের গাফিলতিই বেশি।

গতবার পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শালবল এলাকা। সেখানে বিশাল ধসের কারণে সারা দেশের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় রাঙামাটি। সেই ধসে যাওয়া রাস্তা সংযোগ কাজের সেতু নির্মাণ কাজের ঠিকাদার নিজাম উদ্দিন মিশু বলেন, ‘বেইলি ব্রিজের পিলারের কাজ এবং নিচে প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণের কাজ আমি করেছি। আমার কাজের বরাদ্দ ছিল দুই কোটি ৩৩ লাখ টাকা। কিন্তু অফিস আমাকে দিয়েছে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা। বাকি টাকা ঢাকা ও রাঙামাটির অফিস খরচ বলে কেটে নেওয়া হয়েছে। আমার বরাদ্দ থেকে যদি টাকা কেটে নেয় তবে কাজে তো কিছু সমস্যা থাকবেই। আর সেতুটি তো করা হয়েছিল ছয় মাসের জন্য। ছয় মাসে তো কিছু হয়নি।’

রাঙামাটি শহরের বিভিন্ন স্থানে সড়কের পাশে গাছ গেড়ে অস্থায়ী রক্ষার কাজ করেছিল নিউ রোজ, রাঙামাটি ট্রেডার্স, লিটন এন্টারপ্রাইজ, মাওরুম এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স বিআলম, ব্যাজিও এন্টারপ্রাইজসহ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে লাইসেন্স হলেও কাজ করেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক ঠিকাদাররাই। এসব ঠিকাদারদেরই একজন লিটন মাঝি। তিনি বলেন, ‘চারটি প্যাকেজে মোট দুই কোটি টাকার কাজ ছিল। এর মধ্যে আমরা এক কোটি টাকার করেছিলাম। এখন সেই কাজের যদি কোনোটি ভেঙে যায়, তাহলে সেগুলো বর্ষা শেষ হলে ঠিক করে দেব।’

তবে ঠিকাদাররা যা-ই বলুক না কেন, ২০১৭ সালের পাহাড়ধসের পর জোড়াতালি দিয়েই চালু রাখা হয়েছে রাঙামাটির যোগাযোগব্যবস্থা। রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের দূরত্ব ৭৪ কিলোমিটার। এ সড়কের ৬০টি স্থানে পাহাড়ধস হয়ে সড়কের ওপর মাটি পড়ে। ২০টির বেশি জায়গায় বড় বড় ফাটল ধরে। দুটি স্থানে সড়কের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গিয়েছিল। ধসের পর বড় বড় ফাটলের অংশে খুঁটি দিয়ে সড়ক ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়। সে সময় আট দিন পর হালকা যান চলাচলের ব্যবস্থা করা হলেও তার প্রায় দুই মাস পার ভারী যান চলাচল শুরু হয়। এবার কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণে বিভিন্ন জায়গায় সংস্কার করা সড়ক আবারও ভাঙনের কবলে পড়েছে। সড়ক বিভাগের এ কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে এলাকার মানুষ।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য ও সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) রাঙামাটির সহসভাপতি বাঞ্ছিতা চাকমা বলেন, ‘রাঙামাটি সড়ক বিভাগের সুনাম ভালো না। ১৪ কোটি টাকা খরচ করে সড়কের কাজ করার পরও টানা দুই দিনের বর্ষণে অনেক জায়গায় ভেঙে গেল, এর দায় কে নেবে?’

রাঙামাটি প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি সুনীল কান্তি দে বলেন, ‘আমার মনে হয় না রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক সংস্কারে ১৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। গত এক বছরে রাস্তাঘাটের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। পার্বত্য অঞ্চলের যোগাযোগে এটাই মূল সড়ক। আর এ সড়কের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে ভবিষ্যতে কঠিন পরিস্থিতি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।’

রাঙামাটি সড়ক বিভাগের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, স্থায়ীভাবে সড়ক সংস্কার করতে এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে ১৭০ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, যা ২০১৫ সালের শিডিউল রেট অনুসারে ছিল। নতুন রেট শিডিউলে সেটা দাঁড়াবে ন্যূনতম ২০০ কোটি টাকা। গত জানুয়ারিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন শেষে একটি নকশা দিয়েছে সড়ক বিভাগের বিশেষজ্ঞ দল। এপ্রিলে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তা যাচাই-বাছাই শেষে মে মাসের শেষ দিকে অভ্যন্তরীণ যাচাই কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে এটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা রয়েছে।

রাঙামাটি সড়ক বিভাগের দায়িত্বরত নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদ হোসেন বলেন, ‘পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অনুমোদন হলে স্থায়ীভাবে সড়কগুলো টেকসই করার জন্য আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে আমরা কাজ শুরু করতে পারব। তখন আমাদের সব সড়ক ঝুঁকিমুক্ত করা যাবে।’

১৪ কোটি টাকার কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, ‘তখন জরুরি ভিত্তিতে সড়ক মেরামত করে চলাচল উপযোগী করার স্বার্থেই দ্রুত কাজ করা হয়েছে।’

রাঙামাটি বাস মালিক সমিতির সভাপতি মঈন উদ্দিন সেলিম বলেন, ‘দীর্ঘ এক বছর ধরে সড়কে যেটুকু কাজ হয়েছে তার সবই অস্থায়ী, স্থায়ী কোনো কাজ হয়নি। গত বছরের মতো যদি এবারও বৃষ্টি হয় তাহলে এ রাস্তা টিকবে না। এখানে কাজের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। সড়ক বিভাগ সব সময় নিজের মতো কাজ করে। আমরা মনে করি, জেলা প্রশাসনসহ অন্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করলে তা আরো সহজভাবে করা যেত।’

 


মন্তব্য