kalerkantho


বৃষ্টি পাহাড়ি ঢল বাঁধে ভাঙন

লাখ মানুষ পানিবন্দি

প্রিয় দেশ ডেস্ক   

১৫ জুন, ২০১৮ ০০:০০



লাখ মানুষ পানিবন্দি

ধলাই নদের বাঁধ ভাঙা পানি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ-আদমপুর সড়কের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সড়কটির প্রায় দুই কিলোমিটার স্থান দুই থেকে তিন ফুট পানিতে তলিয়ে আছে। ছবিটি বৃহস্পতিবার সকালে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

৯ উপজেলায় বন্যা

►   সিলেটে মনু ও ধলাই নদের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ১৩টি স্থানে ভাঙন

►   মৌলভীবাজারের একটি পৌর এলাকা ও আটটি ইউনিয়নের ব্যাপক অঞ্চল প্লাবিত

►   সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বিছট গ্রাম প্লাবিত

►   হবিগঞ্জে বিপদমুক্ত খোয়াই

 

কয়েক দিনের ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটের সীমান্তবর্তী পাঁচ উপজেলায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। একই কারণে মনু ও ধলাই নদের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ১৩টি স্থানে ভেঙে মৌলভীবাজারের তিন উপজেলার একটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়নের ব্যাপক অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে ফসলের মাঠ, রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি। অন্তত ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রবল জোয়ারের তোড়ে খেলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বিছট গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর পানি কমতে থাকায় বিপদ কেটে গেছে। কালের কণ্ঠ’র ব্যুরো অফিস, নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

সিলেট : কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও বিয়ানীবাজার উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে পানির নিচে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত ২০ হাজার মানুষ। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি সব পয়েন্টে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কানাইঘাট-দরবস্তত সড়ক পানির নিচের থাকায় সিলেটের সঙ্গে কানাইঘাটের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

সুরমা ও কুশিয়ারার পানি বেড়ে কানাইঘাট (সদরসহ) ও জকিগঞ্জে অন্তত ৫০টি গ্রামে পানি ঢুকেছে। আর পাহাড়ি ঢলে সিলেটের সারি ও পিয়াইন নদীর পানি বাড়ায় গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গোয়াইনঘাটের পূর্ব জাফলং, আলীরগাঁও, রুস্তমপুর, ডৌবাড়ী, লেঙ্গুড়া, তোয়াকুল ও নন্দীরগাঁও ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামের রাস্তাঘাট ও বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী আরিফুর রহমান জানান, সীমান্তের ওপারে টানা বৃষ্টিপাতের কারণে ঢলে এই প্লাবন।

এদিকে প্রবল বৃষ্টিতে সিলেট নগরের নিচু এলাকায়ও জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। নগরের সোবহানীঘাট, মেন্দিবাগ, মাছিমপুর এলাকায় বেশ কিছু বাসাবাড়িতে পানি উঠেছে।

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে সুরমা নদীর পানি সিলেট পয়েন্টে বিপত্সীমার ২৭ সেন্টিমিটার, কানাইঘাট পয়েন্টে ১ দশমিক ৯৮ মিটার, কুশিয়ারার শেওলা পয়েন্টে ১ দশমিক ০১ সেন্টিমিটার, ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ৪০ সেন্টিমিটার, শেরপুর পয়েন্টে ১৭ সেন্টিমিটার বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

মৌলভীবাজার : কুলাউড়া উপজেলার টিলাগাঁও, শরীফপুর ও হাজীপুর ইউনিয়ন এবং রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নে মনু নদের প্রতিরক্ষা বাঁধে পাঁচটি ভাঙন ও কমলগঞ্জ উপজেলার পৌর এলাকা, মুন্সীবাজার, রহিমপুর, আদমপুর ও মাধবপুর ইউনিয়নে ধলাই নদের আটটি ভাঙন দিয়ে জনপদে বন্যার পানি ঢুকছে। বাড়িঘর তলিয়ে যাওয়ায় অনেকেই নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।

বন্যার পানিতে ডুবে থাকায় শমসেরনগর-চাতলাপুর ইমগ্রেশন চেকপোস্ট সড়ক, মুন্সীবাজার-কমলগঞ্জ-কুরমা সড়ক ও শমসেরনগর-কুলাউড়া সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। মনু নদের পানি বেড়ে মঙ্গলবার রাতে থেকে কুলাউড়ার শরীফপুর ইউনিয়নের বাঘজুর ও তেলিবিল গ্রামে ও বুধবার চাতলাপুর সেতুর উত্তর পাশে ও হাজীপুরের মিঞার পাড়ায় নদীভাঙন দেখা দেয়। এতে ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। শরীফপুরের বটতলা থেকে চানপুর পর্যন্ত দুই কিলোমিটার সড়ক এবং কুলাউড়া-শমসেরনগর সড়কে টিলাগাঁও এলাকা ও কুলাউড়া-শমসেরনগর-চাতলাপুর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। চাতলাপুর চেকপোস্টের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় শরীফপুর ইউনিয়নের ৯টি গ্রামের মানুষ ঈদের কেনাকানটায় হাট-বাজারে আসতে পারছে না। লোকজন ভারত-বাংলাদেশে যাতায়াত করতে পারছে না দুই দিন ধরে।

কমলগঞ্জ উপজেলায় ধলাই নদের ভাঙনে মুন্সীবাজার ইউনিয়ন ও কমলগঞ্জ পৌর এলাকায় শতাধিক কাঁচা ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। সহস্রাধিক হেক্টর আউশ ফসল পানিতে ডুবে গেছে। ভানুগাছ বাজারসংলগ্ন, রামপাশা, আলেপুর এলাকায় আরো তিনটি স্থানে নদের বাঁধ ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

গত সোম ও মঙ্গলবার ভারি ও মাঝারি বৃষ্টিপাতে ধলাই নদের কমলগঞ্জ পৌর এলাকার করিমপুর, মুন্সীবাজার ইউনিয়নের সুরানন্দপুর, বাদে করিমপুর, রহিমপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর, আদমপুর ইউনিয়নের কেওয়ালীঘাট, ঘোড়ামারা, মাধবপুর ইউনিয়নের কাটাবিল, ইসলামপুর ইউনিয়নের শ্রীপুরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পুরনো ও নতুন ভাঙন দিয়ে ছয়টি ইউনিয়নের ৫০টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়।

কমলগঞ্জের ইউএনও মোহাম্মদ মাহমুদুল হক বলেন, ‘বুধ ও বৃহস্পতিবার বন্যাকবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছি। আপাতত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।’ জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য চাল বরাদ্দের প্রক্রিয়া চলছে। কুলাউড়া ও কমলগঞ্জে টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

পাউবো মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রণেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী মনু ও ধলাই নদের প্রতিরক্ষা বাঁধের ১৩টি স্থানের ভাঙনের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘উজানে (ভারতের ত্রিপুরা) বৃষ্টিপাত বন্ধ হয়েছে। মনু নদের পানি মনু রেলওয়ে ব্রিজের কাছে ৬০ সেন্টিমিটার কমে বিপত্সীমার ১২০ সেন্টিমিটার, জেলা শহরের চাঁদনীঘাটে বিপত্সীমার ৭৫ সেন্টিমিটার, কমলগঞ্জের ধলাই নদের পানি ৫৩ সেন্টিমিটার ও কুশিয়ারা নদের পানি বিপত্সীমার ৭৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুশিয়ারায় পানি বাড়ায় মনু ও ধলাই নদের পানি হ্রাস পেয়েছে।’

সাতক্ষীরা : বৃহস্পতিবার দুপুরে সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-২-এর ৭/২ নম্বর পোল্ডারে বিছট গ্রামের সরদার বাড়ির সামনে ১৫০ ফুট এলাকাজুড়ে বেড়িবাঁধ নদীতে মিশে যায়। স্থানীয় এলাকার জেলা পরিষদের সদস্য মো. আব্দুল হাকিম ও আনুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান শেখ আলমগীর আলম জানান, বাঁধটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। বিষয়টি পাউবোকে জানানোর পরও তারা তেমন গুরুত্ব দেয়নি। আশাশুনির ইউএনও মাফফারা তাসনীন জানান, সংশ্লিষ্টদের দ্রুত রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে। বাঁধ সংস্কারেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাউবোর এসও মশিউল আবেদীন জানান, ভাঙনকবলিত এলাকা সংস্কারে রিং বাঁধের কাজ শুরু হয়েছে।

হবিগঞ্জ : হবিগঞ্জের পাশ দিয়ে প্রবাহিত  খোয়াই নদীতে বুধবার রাতে পানি বিপত্সীমার ২৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে কমতে থাকে পানি। সর্বশেষ পানি বিপত্সীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। হবিগঞ্জ পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এম এল সৈকত জানান, শেষ মূহুর্তে পানি কমতে থাকায় বিপদ কেটে গেছে।



মন্তব্য