kalerkantho


সফল অভিবাসনে প্রয়োজনীয় দক্ষতা (শেষ পর্ব)

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ১১:৪৮



সফল অভিবাসনে প্রয়োজনীয় দক্ষতা (শেষ পর্ব)

আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা (আইওএম) প্রকাশিত ‘বিশ্ব অভিবাসী প্রতিবেদন ২০১৮’-তে উল্লেখ করা হয়েছে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় ৭৫ লাখ। সে হিসাবে বাংলাদেশি অভিবাসীরা বিশ্বে পঞ্চম শীর্ষ স্থানে আছে। প্রতিবছর অভিবাসী হতে অসংখ্য মানুষ স্বপ্ন নিয়ে ছোটেন। অনেকেই সফল হন। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। এটাকে ঠিক দুর্ভাগ্য বলতে চাই না। এটা অভিবাসন প্রক্রিয়া দক্ষভাবে চালিয়ে নিতে আপনার ব্যর্থতার ফলাফল। এখানে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সফল অভিবাসনে জরুরি দক্ষতার বিষয়ে কিছু লিখছি। কোনো নির্দিষ্ট দেশের কথা বলছি না, পৃথিবীর যে দেশেই যেতে চান না কেন, এই দক্ষতাগুলো মৌলিক যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হবে।  

অভিবাসন নিয়ে লেখা এটি তৃতীয় ও শেষ পর্ব। প্রথম দুইটি পর্বে লিখেছিলাম অভিবাসনের যোগ্যতা মূল্যায়ন ও আয়ত্ত করার বিষয় এবং অভিবাসনের জন্য ভাষার দক্ষতা ও বিবেচ্য বিষয়গুলো নিয়ে। শেষ পর্বে আমরা জানার চেষ্টা করব অভিবাসিত হবার পরের পদক্ষেপগুলো নিয়ে।

আরো পড়ুন: সফল অভিবাসনে প্রয়োজনীয় দক্ষতা (পর্ব-১)

প্রথমেই বলেছিলাম স্বপ্নের বীজ যত তাড়াতাড়ি বপন করতে পারবেন তত তাড়াতাড়ি স্বপ্ন আপনার কাছে ধরা দেবে। অনুন্নত দেশের বাসিন্দা হিসেবে আমরা অনেকেই ভাবি, উন্নত দেশগুলো আপনাকে আমাকে অভিবাসনের অনুমতি দিয়ে বুঝি আমাদের কৃতার্থ করেছে। আসলে বিষয়টা একপাক্ষিক নয়, বিষয়টা দ্বিপাক্ষিক। উন্নত দেশে দক্ষ লোকবলের অভাব বলেই তাদের যেমন আমাদের প্রয়োজন, তেমনি সেখানে গিয়ে আমরাও নিজেকে ভাল অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি। বিদেশে গিয়ে দেশের জন্য কিছু করতে চাই আমরা। কিন্তু আমাদের বেশিরভাগ মানুষই মনে করেন, একবার উন্নত দেশে অভিবাসিত হতে পারলেই বুঝি জীবনের অধরা সব কিছু হাতের মুঠোয় চলে আসবে। মনে হয়, সুখের সাগরে ভাসা সময় হলো বুঝি। 

বিষয়টা এতটা সহজ হলে সবাই সবকিছু ফেলে হয়তো এটার পেছনে সবাই ছুটত। তবে হ্যাঁ, আপনি যদি সঠিকভাবে পরিকল্পনা করতে পারেন অনেক স্বপ্নই আপনার কাছে ধরা দেবে। মনে রাখবেন পরিকল্পিত বলেই ওরা উন্নত দেশ আর আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে আছি শুধু সঠিক পরিকল্পনার অভাবে। শুধু দেশ নয় ব্যক্তি জীবনেও পরিকল্পনা আপনাকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করে রাখবে। আপনি অনেক পরিকল্পনা করে যখন অভিবাসনের মত স্বপ্নকে ছুঁতে পারলেন আপনার সেই স্বপ্নকে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্যও আপনার সঠিক পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

আরো পড়ুন: সফল অভিবাসনে প্রয়োজনীয় দক্ষতা (পর্ব-২)

ধরুন আপনার একজন আত্মীয় মফস্বলে বেড়ে ওঠা এক মানুষ। তিনি জীবনে কখনও ঢাকায় আসেননি। কিন্তু মফস্বলে তিনি একজন শিক্ষিত এবং সফল ব্যক্তি। উনি মফস্বলে যতই সফল হোন না কেন, ঢাকায় তিনি নতুন এবং তাকে ঢাকার হালচাল নতুন করে শিখতে হবে, জানতে হবে। তাই আপনি যে দেশে অভিবাসিত হচ্ছেন, যাবার আগে সেই দেশে সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিন। এখন গুগল করলেই সব কিছু জানা যায়। 

ভাষাগত ভিন্ন আমাদের নিজের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই রয়েছে। আমরা সবাই বাংলা বলছি ঠিকই, কিন্তু এক অঞ্চলের বুলি অন্য অঞ্চলের হয়তো গালি হয়ে যায়। ঠিক এমনভাবেই আপনি আমি হয়তো অন্য ভাষায় দক্ষ। তবুও যে দেশে আপনি যাচ্ছেন তাদের উচ্চারণ আর আমাদের উচ্চারণের অনেক ব্যবধান রয়েছে। তাই ওই নিৰ্দিষ্ট দেশের উচ্চারণ কেমন সেটা শুরু থেকেই জেনে নিতে পারেন, সেই অনুযায়ী তাদের কথোপকথন শুনতে পারেন, মুভি দেখতে পারেন, গান শুনতে পারেন।

প্রথমেই বলেছিলাম, যদি নিজের দেশ থেকেই যে দেশে অভিবাসিত হচ্ছেন সেই দেশে চাকরি জোগাড় করতে পারেন তাহলে আপনার অভিবাসন সহজ হয়ে যাবে। তার সাথে সাথে আপনার অধরা স্বপ্নগুলো অনেক তাড়াতাড়ি ধরা দেবে। এটা যেমন সত্যি, তেমনি সেই চাকরি টিকিয়ে রাখাটাও অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ। আমাদের দেশের অফিস পরিবেশ আর অন্য দেশের অফিস পরিবেশ ভিন্ন হবে এটাই স্বাভাবিক। তাই অফিস শুরু করার পূর্বেই জেনে নেওয়া উচিত তাদের অফিস সংস্কৃতিটা কেমন। নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার উপায় শিখতে হবে। আপনার পরিচিত কেউ সেই দেশে অভিবাসিত হলে অবশ্যই তার সাথে যোগাযোগ করে জেনে নিতে পারেন খুঁটিনাটি বিষয়গুলো। বেশিরভাগ মানুষই অভিবাসিত হয়ে চাকরির খোঁজ করেন। এটা সবচেয়ে বড় ভুল। আপনি যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অভিবাসিত হবেন, সাথে সাথেই ওই দেশে পরিচিত কেউ থাকলে তার সাথে যোগাযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করুন। আপনার আকাঙ্ক্ষিত পেশায় যারা আছেন তাদের সাথে যোগাযোগ করুন।  প্রফেশনালদের সবচেয়ে বড় যোগাযোগমাধ্যম হল LinkedIN। পৃথিবীর সব দেশের পেশাদার এটা ব্যবহার করেন। যদি একাউন্ট না থাকে আজকেই একাউন্ট খুলুন এবং নিজের প্রফেশন এর মানুষদেরকে সংযুক্ত করার চেষ্টা করুন। অনেক মানুষ আছেন এখানে যারা স্বপ্রণোদিত হয়ে অনেককেই সাহায্য করেন । তাদের সাহায্য নিয়ে সেই দেশের চাহিদা অনুযায়ী আপনার Resume তৈরি করুন। আর আপনার ভাগ্য ভাল থাকলে হয়তো এখান থেকেই চাকরি মিলে যেতে পারে। 

আমাদের অনেকেই নিজ দেশে অনেক সফল। তবুও ভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে অভিবাসিত হতে চান। ভাবেন, এখানে যে চাকরি পেয়েছি বা যতটা ভালো আছি, সেখানেও তাই হবে। এরকম ধারণার জন্য বেশিরভাগ মানুষের অভিবাসন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয় এবং ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান থেকে অনেক দূরে সরে এক অজানা অতৃপ্তি নিয়ে জীবনের হিসেব মেলাতে শুরু করেন। শুধুমাত্র সামান্য পরিকল্পনার অভাবে অনেক প্রতিভার মানুষগুলো ধীরে ধীরে হতাশার অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে থাকেন। এসব ক্ষেত্রে আপনাকে অনেক কৌশলী হতে হবে, আপনি যেহেতু নতুন দেশে এসেছেন, আপনার লক্ষ্য থাকবে আপনার প্রফেশন এ চাকরি খুঁজে পাওয়া আর সেটা যেই অবস্থানেই হোক না কেন। 

আপনার দক্ষতা ও প্রতিভা প্রমানের একটা প্লাটফর্ম দরকার আগে। সেই প্লাটফরমটা নিশ্চিত করুন। তারপর নিজেকে প্রমাণ করে সময়ের সাথে সাথে সফলতার উচ্চশিখরে পৌঁছে যান। চাকরির পাশাপাশি সেই দেশের কোনো সার্টিফিকেশন কোর্স করুন। 

যে দেশগুলো অভিবাসনের আমন্ত্রণ জানায়, তাদের আলাদা মন্ত্রণালয় থেকে ইচ্ছুকদের সব ধরণের তথ্য ও পরামর্শ দেওয়া হয়। বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানও এসব বিষয়ে তথ্য ও পরামর্শ দিয়ে থাকে। অভিবাসিত হবার আগে ও পরে তাদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করুন, আপনার যেকোন প্রশ্ন থাকলে করুন, প্রশ্ন করলে কখনই আপনার যোগ্যতা কমে যাবেনা। আপনার অভিবাসন স্বপ্ন সফল হোক। 

লেখক : মাইনুল বাশার, কানাডা


মন্তব্য