kalerkantho


রাঙ্গাটুঙ্গির ফোগাট

সোহাগী, সাগরিকা আর মুন্নীকে এখন সারা দেশ চেনে। অনূর্ধ্ব-১৫ সাফ ফুটবলজয়ী বাংলাদেশ নারী জাতীয় দলের খেলোয়াড় তাঁরা। ঠাকুরগাঁওয়ের রাঙ্গাটুঙ্গিতে তাঁদের নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন তাজুল ইসলাম। অনেকটা দঙ্গলের মহাবীর সিং ফোগাটের মতো। রাহেনুর ইসলাম জানিয়েছেন আরো অনেক কথা

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রাঙ্গাটুঙ্গির ফোগাট

বলিউডের দঙ্গল ছবির পোস্টার অবলম্বনে গ্রাফিকস

সোহাগী কিসকু জঙ্গলে শিকার ধরতে যায়। রান্নাঘর আর গোয়ালঘরেও সময় দেয়। সাগরিকা বেগম আর মুন্নী আক্তার আদুরীকেও অনেক সময় দিতে হয় জমিতে। বাবাকে কৃষিকাজে সাহায্য করে। মায়ের জন্য খড়কুটো কুড়িয়ে আনে। আদুরীদের আবার জমিজিরাত কিছু নেই। থাকে অন্যের জমিতে ঘর তুলে। ওদিকে তাজুল ইসলাম রানীশংকৈল ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। ভারতের হরিয়ানার বালালি গ্রামের মহাবীর সিং ফোগাটের কথা তাঁর জানা। ফোগাট সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজের মেয়েদের কুস্তিগীর বানিয়েছেন (ফোগাটের ঘটনা নিয়ে ২০১৬ সালে বলিউডে দঙ্গল নামে ছবি হয়েছে। আমির খান ফোগাট চরিত্রে অভিনয় করেছেন)। তাজুল ইসলামও সোহাগী, সাগরিকা, আদুরীদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতে থাকেন।

শুরুর দিনগুলো

রাঙ্গাটুঙ্গি গ্রামে তাজুল ইসলামের পরিবারের ৫০ বিঘার বিশাল মাঠ। এখানে ছেলেরা আগে থেকেই ফুটবল খেলত। প্রায়ই দেখতে যেতেন তাজুল ইসলাম। আরো দেখতেন মেয়েরা ছেলেদের খেলা দেখছে। তাজুল ইসলাম ভাবতেন, মেয়েরাও তো খেলতে পারে! ফোগাট তো জেদ করে দুই মেয়ে গীতা ও ববিতাকে রেসলার বানিয়েছেন। ২০১০ সালের কমনওয়েলথ গেমসে গীতা প্রথম ভারতীয় রেসলার হিসেবে ৫৫ কেজি ফ্রি-স্টাইলে দেশকে স্বর্ণপদক এনে দেয়। আরেক মেয়ে ববিতাও ২০১৪ সালে কমনওয়েলথ গেমসে স্বর্ণ জিতেছে। তাজুল ইসলাম স্বপ্ন দেখলেন, রাঙ্গাটুঙ্গির মেয়েরাও পারবে।

 

লোকে তাঁকে বিশ্বাস করে

সেতাউর রহমান নামে বাফুফে (বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন) তালিকাভুক্ত রেফারি আছে রানীশংকৈলে। ২০১৪ সালের ১ জুলাই তাজুল ইসলাম গিয়েছিলেন সেতাউরের কাছে। সেতাউর রাজি হতে দেরি করেননি। তবে ঝামেলা বাধে খেলোয়াড় জোগাড় করতে গিয়ে। তাঁরা দুজনে মিলে গ্রামে ঘুরতে লাগলেন। লোকেরা ভাবছিল, এটা কিভাবে হয়? মেয়েদের বিয়েশাদি আছে না! ফুটবল খেলা মেয়েকে কারা ঘরে তুলে নেবে? তবে তাজুল আর সেতাউর দমে যাননি। বিশেষ করে তাজুলের এলাকায় প্রতিপত্তি আছে। উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন ১০০ বিঘা জমি। সেখানে অনেক আদিবাসী বর্গাচাষ করে। সেই সঙ্গে লোকে তাঁকে বিশ্বাসও করে। ভালো মানুষ হিসেবে সুনামও আছে তাঁর। তাঁর অনুরোধে শেষ পর্যন্ত কয়েকজন রাজি হয়ে যান মেয়েদের মাঠে পাঠাতে।

সেসব দিন

তাজুল ইসলাম আর সেতাউরের ঘুম উড়ে গিয়েছিল। মেয়েদের মধ্যে দু-একজন ছাড়া কেউ পায়ে বল লাগাতেও পারত না, বিশেষ করে যেদিন তারা প্রথম জার্সি আর হাফ প্যান্ট পরে, সেদিনটা ছিল অন্য রকম। প্রথম তাজুল স্যারের মেয়েরা খেলে বনগাঁও আবু জাহিদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সঙ্গে। সেতাউর বলছিলেন, ‘২০১৫ সালটা ছিল কঠিন। তখন ওরা গড়ে উঠছিল মাত্র। ২০১৬ সালে এসে দলটা দাঁড়ায়।’ রাঙ্গাটুঙ্গির মেয়েরা উপজেলা শেষ করে জেলা চ্যাম্পিয়ন হয়। বিভাগীয় পর্যায়ে ওদের একটা বড় সাফল্য ছিল দিনাজপুর স্টেডিয়ামে দিনাজপুর জেলা দলকে হারানো। খেলাটায় তারা ১-০ গোলে জয়লাভ করে। আদুরী সেবার অসাধারণ খেলেছিল। সবাই তাকে মেসি মেসি বলে বাহবা দিচ্ছিল। তবে গোলটি করেছিল হান্না। বল বানিয়ে দিয়েছিল শিল্পী। তিন দফা তাদের বুট, জার্সি আর ট্রাউজার কিনে দিয়েছেন তাজুল স্যার। যা-ই হোক, ২০১৬ সালের জেএফএ অনূর্ধ্ব-১৪ টুর্নামেন্টে ঠাকুরগাঁও জেলা দল গড়া হয় রাঙ্গাটুঙ্গির মেয়েদের নিয়েই। সেমিফাইনালে উঠে গিয়েছিল মেয়েরা। শেষে ঢাকার কমলাপুর স্টেডিয়ামে ভালো খেলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে রংপুরের সঙ্গে হেরে যায়। সেতাউর ছিলেন আবেগাপ্লুত, ‘এই মেয়েরা গ্রাম থেকে উপজেলা সদরেই এসেছে কম। সেখানে ঢাকা তো বহু দূর। ভয় আর লজ্জায় অনেকে সংকুচিত ছিল। নইলে হয়তো চাম্পিয়নও হয়ে যেতাম আমরা।’ তাজুল ইসলামের স্বপ্ন পূরণে দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন কোচ সেতাউর রহমান। বলছিলেন, ‘তাজুল স্যারসহ আমরা সবাই পরিশ্রম করে গেছি, বাকিটা হয়েছে মেয়েদের জেদ আর প্রচেষ্টায়।’

সাফল্য ভরা ২০১৭

২০১৬ সালে ঢাকায় খেলতে এসে ধানমণ্ডি মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে থেকেছে রাঙ্গাটুঙ্গির মেয়েরা। যাতায়াতের জন্য তাদের ২৫ হাজার টাকা দিয়েছিল জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। কিন্তু খাওয়া আর আনুষঙ্গিক অন্য সব কাজে তাজুল ইসলাম নিজের পকেট থেকে খরচ করেন প্রায় ৭৫ হাজার টাকা। গ্রামে তাদের পড়ালেখার খরচও চালান তাজুল ইসলাম। বাফুফের তালিকাভুক্ত আরেক রেফারি গোপাল মুর্মু সুগা ও স্থানীয় সাবেক ফুটবলার জয়নুল আবেদিনকেও তিনি কোচ হিসেবে নিয়োগ দেন। তাতে ২০১৭ সালে জেএফএ কাপের শুরুটা আরো দুর্দান্ত হয়েছিল ঠাকুরগাঁও জেলা দলের। গাইবান্ধায় হওয়া প্রথম দুই ম্যাচে লালমনিরহাটকে ১৬-০ আর দিনাজপুর জেলা দলকে হারায় ৮-০ গোলে। ফাইনালে গাইবান্ধা জেলা দলকে ৪-১ গোলে হারিয়ে ঢাকায় আসার টিকিট নিশ্চিত করে ফেলে তারা। মূল পর্বে ঢাকায় এসেও সফল রাঙ্গাটুঙ্গির মেয়েরা। গ্রুপে টানা তিন ম্যাচ জিতে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে পৌঁছে যায় সেমিফাইনালে। সেমিফাইনাল গড়িয়েছিল টাইব্রেকারে। পোস্টের নিচে চীনের প্রাচীর হয়ে প্রতিরোধ গড়েন সাগরিকা। প্রতিপক্ষ দল মাত্র একবারই বল পাঠাতে পারে তাকে ফাঁকি দিয়ে! ফাইনালে অবশ্য কলসিন্দুরের খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া ময়মনসিংহ জেলা দলের সঙ্গে পারেনি। সুগা মুর্মু বলছিলেন, ‘চ্যাম্পিয়ন হলেই বেশি ভালো লাগত। তবে রানার্স-আপ হয়েও ভালো লাগছে। বেশি ভালো লাগছে তাজুল স্যারের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে কিছুটা অবদান রাখতে পেরে।’ টুর্নামেন্টে রানার্স-আপ হওয়ায় ঠাকুরগাঁও জেলা ক্রীড়া সংস্থা, জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন সংবর্ধনা দিয়েছে দলের সবাইকে।

 

দারিদ্র্য জয়

তীর, ধনুক, বর্শা আছে সোহাগী কিসকুদের বাড়িতে। এখনো নিয়মিত তার পরিবার শিকারে যায়। অনূর্ধ্ব-১৫ সাফ টুর্নামেন্টের শিরোপা জিতে রাঙ্গাটুঙ্গি ফিরেছে। হাসতে হাসতে বলল, ‘তীর, ধনুক, বর্শা দেখে ভয় পাবেন না। এগুলোর মাধ্যমেই আমাদের জীবিকা।’ ফুটবল সোহাগীর ভালোবাসা। বলছিল, ‘১৪-১৫ বছর বয়সেই আমাদের এখানকার মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। এখন এখানে ফুটবল বাল্যবিয়ে ঠেকিয়েছে। আমার জীবন যেমন অনেকটাই বদলে দিয়েছে। আমার ছোট বোন কোহাতি কিসকুও ভালো খেলে। হিন্দু আর মুসলমান ঘরেরও অনেক মেয়ে খেলছে এখন রাঙ্গাটুঙ্গিতে।’

 

বড় হয়ে যাওয়ায়

সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ দলে সুযোগ হয়নি রাঙাটুঙ্গি একাডেমির অধিনায়ক হান্না হেব্রমের। কারণ সে কিছু বড়। হান্না বলছিলেন, ‘তাজুল স্যার আমাদের দঙ্গলের গীতা, ববিতাদের গল্প শুনিয়েছেন। সিনেমাটাও দেখেছি আমরা। ওরা রেসলিংয়ে ভারতকে সোনা এনে দিয়েছে। আমার দলের তিনজনও সাফ গেমসে স্বর্ণ এনে দিয়েছে দেশকে। আমি এখন অনূর্ধ্ব-১৬ বা আঠারোয় জায়গা পাওয়ার স্বপ্ন দেখছি।’ সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ দলের আদুরীর বাবা নুরুল ইসলাম। মেয়ের এমন সাফল্য তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য, ‘আমাদের দিন এনে দিন খাওয়া অবস্থা। এমন ঘরের মেয়ে জাতীয় দলে খেলবে—এটা রূপকথার চেয়েও বেশি। তাজুল স্যারকে মন থেকে ধন্যবাদ দিচ্ছি।’

জয় বাংলা অ্যাওয়ার্ড

২০১৭ সালে ১০টি সামাজিক সংগঠন পেয়েছে ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’। ফুটবল দিয়ে সামাজিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ‘রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড মহিলা ফুটবল একাডেমি’ও পেয়েছে এই পুরস্কার। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় পুরস্কারটি তুলে দিয়েছিলেন একাডেমির অধিনায়ক হান্না হেমব্রমের হাতে।

 

তাজুল স্যারের পাঠশালা

রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমি মানে তাজুল স্যারের পাঠশালায় ছাত্রী সংখ্যা ২৩। স্যার বললেন, ‘বাংলাদেশে মেয়েদের ফুটবল বদলে দিয়েছে কলসিন্দুরের মেয়েরা। রাঙ্গাটুঙ্গির মেয়েদেরও আছে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। আশা করছি আগামী কয়েক বছরে জাতীয় দলে আরো ফুটবলার উপহার দিতে পারব আমরা। এলাকার দুই সংসদ সদস্য সেলিনা জাহান লিটা ও ইয়াসিন আলী সাহায্য করছেন আমাদের।’ নিজের প্রসঙ্গে বললেন, ‘স্কুলে অনেক খেলাধুলা করতাম। বিশ্বাস করি, সুস্থ সমাজ গড়তে পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলাও প্রয়োজন। ভালো দেশ গড়তে প্রয়োজন মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ। ভালো খেলোয়াড় মানে সুস্থ শরীর ও মনের মানুষ। ফুটবল দিয়ে শুরু করেছি। কারণ এটা দলবদ্ধ খেলা। অনেকে একসঙ্গে এতে অংশ নিতে পারে।’

 

একজন সেতাউর রহমান

রাঙ্গাটুঙ্গির মেয়েদের নিয়ে ১৯ মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন সেতাউর রহমান। বছরের সব দিনই মাঠে যেতেন। ঝড়-বৃষ্টি, শীত-গ্রীষ্ম কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। মেয়েরা যখন ঠিকমতো বল মারতে পারত না, তখন তাদের পায়ে ধরে বল মারা শিখিয়েছেন তিনি। এখন একাডেমির দায়িত্বে আছেন সুগা মুর্মু ও জয়নুল আবেদিন। এই তিন কোচের প্রতি তাজুল ইসলামের কৃতজ্ঞতা, ‘তাঁরা না থাকলে একাডেমি এত দূর আসতে পারত না। ওদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।’             

 

ছবি: পার্থ সারথী দাস


মন্তব্য