kalerkantho


দ্য সেঞ্চুরিয়ান

ইন্দ্রমোহন সুইটস

এক শ পেরিয়ে দেড় শর পথে এখন ইন্দ্রমোহন সুইটস। খুলনার বিখ্যাত মিষ্টির দোকান। এখনো কলাপাতায় মিষ্টি পরিবেশনের চল বজায় রেখেছে ইন্দ্রমোহন। আরেকবার খেতে গিয়েছিলেন মাহবুবর রহমান সুমন

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ইন্দ্রমোহন সুইটস

হেলাতলা রোডের বড়বাজারের প্রবেশমুখে হলুদরঙা পুরনো এক তলা ঘর। কোথাও কোথাও পলেস্তারা খসে পড়েছে। শ্যাওলাও জমেছে এদিক-ওদিক। সদর দরজা সরু। দরজার ওপরে কালোর মধ্যে সাদা রঙে লেখা ইন্দ্রমোহন সুইটস্। পাঁচ রকমের সুস্বাদু মিষ্টি ইন্দ্রমোহনের বিশেষত্ব। সংখ্যাটি শুরুতেও এটাই ছিল। আর বাড়েনি তারপর। বাজারের সঙ্গে পাল্লা লাগায়নি ইন্দ্রমোহন; বরং ধরে রেখেছে গুণ ও মান। আরেকটি ব্যাপারও খেয়াল করার মতো, কেজি দরে মিষ্টি হয় না এখানে। পিস হিসেবে বিক্রি হয়। ইন্দ্রমোহনের ভেতরে টেবিল মোটে একটি। বসার জায়গা বলতে টেবিলের দুই ধারে দুটি টুল।

 

ইন্দ্রমোহন দে থেকে সঞ্জয় দে

ইন্দ্রমোহন সুইটসের প্রতিষ্ঠাতার নাম ইন্দ্রমোহন দে। ১৯৭২ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দোকানের হাল নিজেই ধরে ছিলেন। পরে ছেলে বেনীমাধব গদিতে গিয়ে বসেন। এখন চালায় কিন্তু নাতি। ইন্দ্রমোহনের নাতি মানে বেনীমাধবের ছেলে। নাম সঞ্জয় দে। সঞ্জয় বলছিলেন, ‘আমি নিয়ম-কানুন কিছু বদলাইনি। বাবা যে নিয়মে চালিয়েছেন আমিও তা ফলো করি। আর বাবা ফলো করেছেন দাদুর নিয়ম। এখন চাহিদা অনেক বেশি; কিন্তু গুণ ও মানে আমরা ছাড় দিতে চাই না। তাই আমাদের প্রডাকশন কম। দেখলেন তো এখনো পিস হিসেবে আমরা মিষ্টি বিক্রি করি।’

 

কলার পাতায় মিষ্টি

প্লেট আর স্পুন চলে না ইন্দ্রমোহনে। কলাপাতায় দেওয়া মিষ্টি খেতে হয় হাত দিয়ে। চাইলেও চামচ পাবেন কি না সন্দেহ। সঞ্জয় বললেন, ‘বাবার কাছে শুনেছি, শুরু থেকেই কলাপাতায় দেওয়ার চল। এখানে যাঁরা আসেন তাঁরা এত দিনে ব্যাপারটি জেনে গেছেন। যুগের বদল হলেও আমরা নিয়মের বদল ঘটাইনি। বলতে পারেন, পরিবারের ঐতিহ্য রক্ষা করে চলেছি।’

 

পাঁচ পদের মিষ্টি

রসগোল্লা, দানাদার, পানতুয়া, চমচম ও সন্দেশ—এ পাঁচ পদের মিষ্টি পাওয়া যায় ইন্দ্রমোহনে। লোকে বলে, যাঁরা মিষ্টি আদৌ পছন্দ করেন না, তাঁরাও ইন্দ্রমোহনের চার-পাঁচটি মিষ্টি খেয়ে নিতে পারেন। একবার যে এর স্বাদ পেয়েছে সে ভোলে না কখনো। মিষ্টি খেতে এসেছেন গাজী মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র মাহফিজুর রহমান শুভ। বললেন, ‘আমি অনেক বিখ্যাত মিষ্টি খেয়েছি। তবে কী কারণে যেন ইন্দ্রমোহনেরই প্রেমে পড়ে গেছি। তাই ফাঁক পেলে আসি। বন্ধুবান্ধব নিয়েও আসি।’ জরুরি কাজে সাতক্ষীরা থেকে খুলনায় এসেছেন আরেফিন তামান্না। বললেন, ‘খুলনায় এলেই এখান থেকে বাড়ির জন্য মিষ্টি কিনি। বাড়ির সবাই পছন্দ করে।’

 

একটি পিস মিষ্টির দাম

একটি রসগোল্লার দাম আকারভেদে ১০ থেকে ২০ টাকা। দানাদার, পানতুয়া, চমচম প্রতিটি ১০ টাকা। তবে এখানে সন্দেশ বিক্রি হয় কেজি দরে। এক কেজি সন্দেশের দাম ৪০০ টাকা। সঞ্জয় দে বললেন, ‘আমাদের এখানে ভেজাল পাবেন না। খাঁটি দুধ যেমন, মাপও সঠিক। বাজারের তুলনায় একটু বেশি দাম তাই।’

 

কারিগর তিনজন

ধীরেন, কমল সিং ও কমল চৌধুরী—দোকানের পুরনো কারিগর। ধীরেন আছেন ১৯৭৩ সাল থেকে। বললেন, ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে মানুষ আমাদের মিষ্টি খেতে আসে। খুব ভালো লাগে যে সারা দেশের মানুষ আমাদের প্রশংসা করে।’ কমল সিং কাজ করছেন ১৯৮১ সাল থেকে। বললেন, আমরা ভেজাল দিই না। মানুষ তাই খেয়ে আরাম পায়।’ তাঁদের তুলনায় কমল চৌধুরী নবীন।

 

বেচাকেনা

ভিড় এখানে সারা দিনই থাকে। অনেকে এমনকি বিদেশেও আত্মীয়-স্বজনের কাছে পাঠায়। পূজা আর ঈদের মতো অনুষ্ঠানে বেশি চাপ হয়। সঞ্জয় বললেন, ‘আমি মান ধরে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাব আজীবন। নিয়ম বা স্থান বদলের কোনো পরিকল্পনা নেই আমাদের।’

 

ছবি : খালিদ সাইফুল্লাহ মিম


মন্তব্য