kalerkantho


শাবাশ বাংলাদেশ

একটি প্রতিজ্ঞা পূরণের গল্প

ড. জোবায়ের চিশতী প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য একটা কিছু করবেন। তাঁর দুই দশকের গবেষণা বিরাট ফল বয়ে এনেছে। গত ২৬ ডিসেম্বর ইনভেন্টরস সিরিজে ড. চিশতীকে নিয়ে বিবিসি একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করেছে। খবর পেয়েছিলেন আহনাফ সালেহীন

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



একটি প্রতিজ্ঞা পূরণের গল্প

‘ইন্টার্ন হিসেবে সেটা আমার প্রথম রাত ছিল। আমার চোখের সামনেই তিনটি শিশু মারা গেল। আমি খুব অসহায় বোধ করলাম। কান্নাও পেল।’ ওই দিনই ড. জোবায়ের চিশতী প্রতিজ্ঞা করেন, নিউমোনিয়াজনিত শিশুমৃত্যু রোধে কিছু একটা করবেন। ১৯৯৬ সালের কথা। ড. চিশতী সিলেট মেডিক্যাল কলেজের শিশু বিভাগে কাজ করতেন। তারপর তিনি প্রায় ২০ বছর গবেষণা চালিয়েছেন। শেষে খুব অল্প খরচের একটি উপকরণ তৈরি করেছেন, যা হাজার শিশুর জীবন বাঁচাবে। 

দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকায় প্রতিবছর ৯ লাখ ২০ হাজার শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায়। স্ট্রেপটোকক্কাস নামের ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে নিউমোনিয়া হয়। আরএসভি নামের এক প্রকার ভাইরাসকেও এর জন্য দায়ী করা হয়। এতে ফুসফুসে তরল জমে এর কর্মক্ষমতা কমে যায়, ফুসফুস অক্সিজেন গ্রহণের ক্ষমতা হারায়। সাধারণত ভেন্টিলেটর দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয় নিউমোনিয়ার রোগীদের। এ রকম একটি যন্ত্রের দাম পড়ে ১৫ হাজার ডলার। এটা চালাতেও প্রশিক্ষিত লোক দরকার হয়। এ কারণে খরচ পড়ে অত্যধিক। আর চিকিৎসাটা হাসপাতালে গিয়ে নিতে হয়।

 

চিশতী অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে একটি যন্ত্র (কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ার প্রেসার বা সিপিএপি) দেখতে পান ড. চিশতী। যারা নিজ থেকে নিঃশ্বাস নিতে পারে না তাদের জন্য এ যন্ত্র। এটি গলায় বায়ুচাপ বৃদ্ধি করে, তাই শ্বাসনালি বুজে যায় না। কিন্তু যন্ত্রটির খরচ খুব কম নয়। তাই যখন ড. চিশতী ঢাকায় আবার আইসিডিডিআরবিতে (ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ বাংলাদেশ) গবেষণা কাজে যুক্ত হলেন, তখন একটি কম খরচের সিপিএপি তৈরিতে মনোযোগী হলেন। গবেষণার একপর্যায়ে তিনি একদিন একটি ফেলে দেওয়া শ্যাম্পুর বোতল নিলেন। সেটাকে পানিতে পূর্ণ করলেন। মুখের দিকটায় একটা প্লাস্টিকের নল লাগালেন। চিশতী তাঁর সহকর্মীকে ব্যাখ্যা করলেন, ‘দ্যাখো, এর মাধ্যমে শিশু একটি ট্যাংক থেকে অক্সিজেন টানবে আর নলের মাধ্যমে পানিপূর্ণ এই বোতলে ছাড়বে। এটা বোতলে বুদ্বুদ্ তৈরি করবে। আর বুদ্বুদ্ যে চাপ তৈরি করে তা ফুসফুসের বায়ুথলিগুলো খোলা রাখতে সাহায্য করবে।’ চিশতী বলছিলেন, ‘আমরা দ্রুতই যন্ত্রটি আমাদের হাসপাতালের চার বা পাঁচটি শিশুর জন্য ব্যবহার করলাম। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখলাম।’ আদ-দ্বীন মহিলা মেডিক্যাল কলেজের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ড. এ আর এম লুত্ফুল কবীর জানিয়েছেন, এখনো পরীক্ষা বাকি রয়ে গেছে। তবে যতটা ফল পাওয়া গেছে তা আশাব্যঞ্জক। বললেন, ‘আমি আশাবাদী, ড. চিশতীর আবিষ্কার শিশুমৃত্যুর হার কমাবে।’ এ পর্যন্ত প্রায় ৬০০ শিশু চিশতীর যন্ত্র দিয়ে উপকৃত হয়েছে। যন্ত্রটির খরচ বড়জোর সোয়া ডলার। ২০১৩ সালে যন্ত্রটির প্রাথমিক অনুশীলন শেষ হয়। আইসিডিডিআরবি এরপর থেকে এটি ব্যবহার করে চিকিৎসা দিয়ে চলেছে।  

 

চিশতী ভাষা হারিয়েছেন

২০১৫ সালে নামি চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যান্সেটে ‘জীবন রক্ষাকারী শ্যাম্পু বোতল’ নামে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। কাছাকাছি সময়ে গ্লোবাল নিউমোনিয়া নেটওয়ার্ক একে সেরা প্রতিশ্রুতিশীল আবিষ্কারের পুরস্কার দেয়। ড. চিশতী চান যন্ত্রটির ব্যবহার প্রত্যন্ত গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ুক। এরই মধ্যে ইথিওপিয়া, মিয়ানমার ও নেপাল যন্ত্রটি ব্যবহারে আগ্রহ দেখিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও আমলে নিয়ে তাদের নিউমোনিয়া-চিকিৎসাসংক্রান্ত ভাবনা পর্যালোচনা করার কথা ভাবছে। বিবিসি ড. চিশতীর কাছে জানতে চেয়েছিল, স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় কেমন লাগছে?

আমি বলার ভাষা হারিয়েছি। তবে সেদিনই আমি সবচেয়ে খুশি হব, যেদিন নিউমোনিয়ায় আর কোনো শিশু মারা যাবে না।

একজন জোবায়ের চিশতী

১৯৮৪ সালে তেজগাঁও পলিটেকনিক সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। ১৯৯৫ সালে এমবিবিএস হন। ১৯৯৮ সালে প্রথম আইসিডিডিআরবিতে যোগ দেন। ২০০৯ সালে মাস্টার ডিগ্রি নিতে ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নে যান। পরে রয়্যাল চিলড্রেন হাসপাতালে পেডিয়াট্রিক রেসপিরেটরি মেডিসিনে পিএইচডি ডিগ্রি কোর্সে ভর্তি হন। ২০১২ সালে দেশে ফিরে তিনি আবার আইসিডিডিআরবিতে যোগ দেন।

 

সূত্র : বিবিসিডটকম, নিয়ন আলোয় ও ঢাকা ট্রিবিউন


মন্তব্য