kalerkantho


ফেসবুক থেকে পাওয়া

মা, তুমি কবে আসবা?

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মা, তুমি কবে আসবা?

একবার খুলনা থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে কেন জানি ট্রেন লেট ছিল।

যেনতেন লেট নয়, একেবারে ১৪ ঘণ্টার লেট।

সন্ধ্যা ৬টা থেকে স্টেশনে। ট্রেন আর আসে না। রাত ১২টা বেজে গেল।

ঘুমে অস্থির আমি আব্বার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে গেলাম। সারা রাত আব্বা আমাকে নিয়ে জেগে বসে থাকলেন। ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠে ওয়াশরুমে যাচ্ছিলাম। দেখি আগের রাতের বৃষ্টিতে পথ কাদা হয়ে আছে। আমি বললাম, আব্বা, আমি যাব না, পথে অনেক কাদা। আব্বা উঠে চলে গেলেন। দুই বোতল পানি কিনে আনলেন। আমি তখনো বুঝিনি পানি কিনে আনার কারণ। আরো কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বললেন, মা, আমি পানি ঢেলে পথ পরিষ্কার করে দিয়ে এসেছি। এখন তুমি যেতে পারো। আমি স্তব্ধ হয়ে গেছিলাম সেদিন।

আমার বাবার তুলনা আমার বাবাই শুধু।

বিকেলে ঘুম থেকে উঠে প্রায়ই অবাক হয়ে দেখতাম, আমার মাথার ওপর মশারি। আমাকে মশা কামড়ানোর ভয়ে আব্বা কোনো ফাঁকে এসে মশারি টানিয়ে গেছে।

ছুটিতে যখন বাসায় যাই, ঘুম থেকে উঠে আব্বার প্রথম কথা, মা, কী আনব আজকে?

শাওয়ার নিয়ে বের হলেই আব্বা বিরাট এক টাওয়েল নিয়ে আমার চুল মোছা শুরু করেন। আব্বার ধারণা, আমি চুল মুছতে পারি না। সে কিছুতেই আমার ঠাণ্ডা লাগতে দেবে না! দরকার হলে চুল মুছতে মুছতে ছিঁড়ে ফেলবে। 

কখন কোন ফাঁকে যে আব্বা আমার জামা-কাপড় ধুয়ে শুকাতে দেয়, টেরও পাই না আমি। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই আব্বা অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে আমার জামাগুলো ভাঁজ করে রাখে। যতই নিষেধ করি, আব্বা শোনে না।

নিষেধ করলে উল্টো আব্বা মন খারাপ করে।

আমার অবাক লাগে, আব্বা এখনো আম্মার শাড়ি ঠিকমতো চেনে না। সেই মানুষটা কিভাবে আমার জামা-কাপড় এত যত্ন করে রাখে! আমি কবে কোন জামা পরি, আমি ভুলে গেলেও আমার বাবা ঠিকই মনে রাখে। আমি যখন বাইরে থেকে ফিরে এসে বলি, আমি যেন কোন জামাটা পরেছিলাম? আমার বাবা তখন হাসি হাসি মুখ করে বলে, মা, তুমি এই জামাটা পরছিলা। 

কতটা ভালোবাসলে তার বহিঃপ্রকাশ এমন হতে পারে আমার জানা নেই।

হোস্টেলে থাকার সময় এমন খুব কম দিনই যায়, যেদিন আব্বা ফোন করে বলে না, মা, তুমি কিন্তু দেরি করে গোসল করবা না।

ছুটিতে যখন বাসায় যাই, আব্বা এখনো আমাকে ছোটবেলার মতো হাত ধরে সবখানে নিয়ে যায়। হোক সেটা কাঁচাবাজার বা মাছের বাজার। সবখানেই আব্বার হাত ধরে আমার বিচরণ।

আব্বা আমাকে ছোটবেলার মতো জিজ্ঞেস করে, মা, একটা চিপস কিনে দিই?

প্রতি সন্ধ্যায় আব্বা আমাকে নিয়ে হাঁটতে বের হয়। হাঁটার সময় আব্বা আমার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখে। যেন হাত ছুটলেই আমি হারিয়ে যাব।

প্রতিবার আমি ঢাকা আসার তিন-চার দিন আগে থেকে আব্বা খুব চুপচাপ হয়ে যায়। চলে আসার সময় প্রতিবার জানালা থেকে দেখি আব্বার চোখে পানি। আব্বার নীরবে চোখ মোছা দেখে আমি মোবাইল নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে যাই। আব্বার দিকে আর তাকাই-ই না। আব্বা দেখুক আমি কাঁদিনি...!

আমি যখন খুলনায় যাই, নিউ মার্কেটের পর আমি আর আগাই না।

যেই আমি সারা পথ একা আসছি, সেই আমি খুলনা নিউ মার্কেটের পর আর একা যাই না।

আমি জানি, আমার বাবা ইস্ত্রি করা নতুন শার্ট-প্যান্ট পরে রেডি হয়ে থাকবে আমাকে এগিয়ে নিতে আসার জন্য।

আব্বার এই আনন্দ আমি নষ্ট করতে চাই না কখনো। আব্বা আমাকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলবে, আমার মা আসছে! মা, তোমার ব্যাগগুলো দাও। আমি নিই, তুমি পারবা না।

ব্যাগ নিয়ে আমাদের মধ্যে কাড়াকাড়ি দেখে রাস্তার সবাই অবাক হয়ে যাবে।

পাঁচ মাস হয়ে গেল বাসায় যাই না।

এখনো প্রতিদিন রাত ৯টায় ফোন আসে। রিসিভ করার পর ওপাশ থেকে বলে—

: মা, তুমি কি ব্যস্ত? কেমন আছ মা? কী খাইছ রাতে?

কিছুক্ষণ নীরবতা।

মা, তুমি কবে আসবা? কত দিন হয়ে গেল তোমাকে দেখি না!

নাহ, আর লেখা যাবে না! চোখ ভিজে আসে।

রোগী যদি রুমে ঢুকে দেখে ডাক্তারের চোখে পানি। এটা মোটেও ভালো হবে না!

ডা. মোশাররাত জাহান কণা


মন্তব্য