kalerkantho


এগিয়ে যাও বাংলাদেশ

মৃত্তিকা তাদের দাঁড়ানোর জায়গা

প্রতিবন্ধীদের জন্য কাজ করে ‘মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন’। এর প্রতিষ্ঠাতা মাহবুবুর রহমান নিজেও একজন প্রতিবন্ধী। এই ফাইন্ডেশন থেকে বিশেষ করে প্রতিবন্ধী মানুষদের কল্যাণে অনেক কার্যক্রম হয়। জানাচ্ছেন নাসরুল আনোয়ার

১৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মৃত্তিকা তাদের দাঁড়ানোর জায়গা

‘একটু দাঁড়াও মায়েরে দেখি...’। গাইছিল ১১ বছরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মাহফুজুর রহমান। একটি অনুষ্ঠানে মাকে দেখতে না পারার বেদনাই যেন প্রকাশ করছিল সে। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের পিরিজপুর ইউনিয়নের হাপানিয়া গ্রামের কামাল মিয়ার ছেলে সাগর। এলাকায় প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য একটি পাঠশালা গড়ে ওঠায় স্কুলে পড়ার সুযোগ পেয়েছে সাগর।

‘মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী শিশু পাঠশালা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র’ নামের এ পাঠশালায় এখন অনেক প্রতিবন্ধী শিশুই লেখাপড়া করছে। প্রতিবন্ধী ছাত্ররা বৃত্তিও পাচ্ছে। প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ ব্যক্তিদের দেওয়া হচ্ছে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা। প্রতিবন্ধীবান্ধব শিক্ষায় অবদানের জন্য দেওয়া হচ্ছে পুরস্কার। আয়োজন করা হচ্ছে প্রতিবন্ধী ও কৃষক মেলা। প্রতিবন্ধী নারীদের প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে প্রতিবন্ধী শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি কার্যক্রম, সফল শিক্ষার্থী সংবর্ধনা, অসহায় ও ভিক্ষুক প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন যাকাত ফান্ড, শিক্ষার্থীদের পত্রিকা পড়ার অভ্যাস গঠনের মতো কাজগুলো করছে এই ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশনের প্রধান নিজেও প্রতিবন্ধী।

প্রতিষ্ঠাতা মাহবুবুর রহমান জানান, ছোটবেলায় লাঠি ভর দিয়ে হাঁটতে হতো। বাবা একদিন স্কুলে নিয়ে গেলে শিক্ষক বলেছিলেন, ‘ও লেখাপড়া করে কী করবে!’ পরে তার বাবা মুছা ভূঁইয়া মাদ্রাসায় নিয়ে যান। ওখানেও বেশিদিন স্থান হয়নি। তিন মাস পরেই হুজুর বলেন, ‘ছেলের তো পায়ের সমস্যা। সে ইমামতিও করাতে পারবে না। তাকে বাড়ি নিয়ে যান।’ পরে বাধ্য হয়ে বাবা তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন।

এরপরও নিজের একান্ত ইচ্ছায় উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মাহবুব জানান, ‘প্রতিবন্ধীদের প্রতি অবজ্ঞা ও অবহেলা দেখে দেখে বড় হয়েছি। তাই প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য কিছু করবার তাগিদ থেকেই ২০১০ সালে গড়ি মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন। এরপর থেকে দেশি-বিদেশি কোনো দাতা বা দাতা সংস্থার কোনোরকম আর্থিক সহযোগিতা ছাড়াই ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার আদায়ের নানা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।’

সাত বছরে তিন হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী, প্রবীণ ও সহায়হীন ব্যক্তি বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন। চিকিৎসাসেবায় পাশে ছিলেন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন দেবনাথ। ২০১৫ সালে মৃত্তিকা প্রতিষ্ঠা করে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষায়িত স্কুল। যেখানে এখন প্রায় দেড় শ দৃষ্টি ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুরা পড়ছে। জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক রবিউল ইসলাম জানান, তিনি স্কুলটি পরিদর্শন করেছেন। স্কুলটির কার্যক্রম মানসম্পন্ন ও ব্যতিক্রমী বলেই মনে হয়েছে তাঁর। তাঁর মতে, স্কুলটির সরকারি স্বীকৃতি এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিশ্চিত করা গেলে আরো গতিশীল হবে।    

এই সংগঠন থেকে বছরে দুই শতাধিক ২০০ দরিদ্র প্রতিবন্ধী ছাত্রকে ইতোমধ্যে এককালীন বৃত্তি ও শিক্ষা উপকরণ দেওয়া হয়েছে। মৃত্তিকার সহায়তা নিয়ে একই পরিবারের পাঁচজন প্রতিবন্ধী ভাইবোন এখন লেখাপড়া করছে। বাজিতপুরের বিলপাড় গজারিয়া গ্রামের এ পরিবারের দুই ছেলেমেয়ে সুজন ও মার্জিয়া গুরুদয়াল সরকারি কলেজ ও বাজিতপুর কলেজে সম্মান দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। সুজন-মার্জিয়ার মা ফুলবানু বলেন, ‘মৃত্তিকা না থাকলে আমার ঝি-পুতাইনতে (ছেলেমেয়ে) ভিক্ষা কইরাও ভাত পাইত না! অহন তো হেরা লেহাফড়া করতাছে। ইলা (মাহবুব) লগে থাকলে আমরার আর চিন্তা নাই।’

অসহায় প্রতিবন্ধী নারীদের স্বাবলম্বী করতে মৃত্তিকা বিউটি পার্লার ও সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে। শতাধিক নারীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ২০১৬ সালের জানুয়াারিতে অস্ট্রেলিয়া ও ব্রিটেনের সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বাজিতপুরে আসে। সে দলের প্রধান ডেব্রা রবিনসন বলেছিলেন, ‘এটি অনন্য উদ্যোগ। সাধারণত এ ধরণের নারীদের জন্য গ্রামের খুব কম লোকই কাজ করে।’

কল্যাণমূলক নানা কাজের সরকারি স্বীকৃতিও পেয়েছে ‘মৃত্তিকা’। অসহায় প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি সহযোগিতার জন্য জেলা ও উপজেলায় দুবার শ্রেষ্ঠ উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা মাহবুবুর রহমান এরই মধ্যে কিশোরগঞ্জ জেলায় সরকারিভাবে ‘সফল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি’ হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন। মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘প্রতিবন্ধীতা আমাকে অক্ষম নয় বরং সকল ক্ষেত্রেই সফল করেছে। স্কুলটি সরকারি স্বীকৃতি পেলে মৃত্তিকা আরো এগিয়ে যাবে।’

কিশোরগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) গোলাম মোহাম্মদ ভূঁইয়া বলেন, ‘অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মাহবুবুর রহমান ও মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী মানুষের কল্যাণে কাজ করে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করছে।’


মন্তব্য