kalerkantho


বাবরির প্রায়শ্চিত্ত!

মসজিদ সারাচ্ছেন বলবীর

২৫ বছর আগে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের মাথায় উঠে শাবলের ঘা মেরেছিলেন তিনি। এখন লম্বা দাড়ি রেখে মৌলভি। ভেঙে পড়া মসজিদ সারাতে চান তিনি। একসময় শিবসেনার সক্রিয় কর্মী বলবীর সিংহ এখন হয়ে গেছেন মহম্মদ আমির। তাঁর এমন পরিবর্তন নিয়ে লিখেছে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা

১৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মসজিদ সারাচ্ছেন বলবীর

বাবরির মাথায় শাবলের ঘা দেওয়ার পর সব খুইয়েছিলেন বলবীর। বাবা বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। না, স্ত্রীও সে সময় তাঁর হাত ধরে বেরিয়ে আসেননি। বাবার মৃত্যুর পর বাড়ি ফিরে শুনেছিলেন, বাবা নাকি বলে গিয়েছিলেন, তাঁর দ্বিতীয় সন্তানের (বলবীর) মুখ যেন বাড়ির কেউ আর না দেখে। এমনকি বলবীরকে যেন তাঁর বাবার মুখাগ্নিও করতে দেওয়া না হয়।

বদলের আরেক নাম যোগেন্দ্র পাল। বলবীরের বন্ধু, ২৫ বছর আগে যিনি বলবীরের সঙ্গেই উঠেছিলেন বাবরির মাথায়। শাবলের ঘায়ে ভেঙেছিলেন মসজিদ। বহুদিন আগেই যিনি হয়ে গেছেন পুরোদস্তুর মুসলমান। এই বদলে যাওয়া নিয়ে বলবীর বলছেন, সেটাই স্বাভাবিক ছিল। কারণ তাঁর পরিবার কোনো দিনই উগ্র হিন্দু ছিল না। ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান আর ইংরেজি—এই তিনটি বিষয়ে এমএ ডিগ্রি পাওয়া বলবীর তাঁর মা-বাবা, ভাই-বোনদের নিয়ে ছোটবেলায় থাকতেন পানিপথের কাছে খুব ছোট্ট একটা গ্রামে। বলবীরের বয়স যখন ১০, তখন তিনি ও তাঁর ভাইদের পড়াশোনার জন্য বলবীরের বাবা দৌলতরাম তাঁদের নিয়ে চলে যান পানিপথে।

বলবীর মুম্বাই মিররকে বলেছেন, ‘আমার বাবা বরাবরই গান্ধীবাদে (মহাত্মা গান্ধী) বিশ্বাসী। তিনি দেশভাগ দেখেছিলেন। তার যন্ত্রণা বুঝেছিলেন। তাই আমাদের আশপাশে যে মুসলমানরা থাকতেন, তিনি তাঁদের আগলে রাখতেন সব সময়। কিন্তু পানিপথের পরিবেশটা ছিল অন্য রকম। হরিয়ানার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা লোকজন তেমন মর্যাদা পেত না পানিপথে।’

ফলে একটা গভীর দুঃখবোধ সব সময় তাড়িয়ে বেড়াত বলবীরকে। সেই পানিপথেই একেবারে অচেনা-অজানা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) একটি শাখার কর্মীরা বলবীরকে দেখা হলেই ‘আপ আপ’ (আপনি আপনি) বলে সম্বোধন করত।

বলবীর বলছেন, ‘সেটাই আমার খুব ভালো লেগেছিল। সেই থেকেই ওদের (আরএসএস) সঙ্গে আমার ওঠাবসা শুরু। শিবসেনা করতে করতেই বিয়ে করি। এমএ করি রোহতকের মহর্ষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ওই সময় প্রতিবেশীরা ভাবত আমি কট্টর হিন্দু। পানিপথে কেউ বাঁ হাতে রুটি খেলেও তখন তাঁকে মুসলিম বলে হেয় করা হয়।’

শিবসেনার লোকজনের কাছ থেকে ‘সম্মান’ পেয়ে তাদের ভালো লেগে যায় বলবীরের। শিবসেনাই তাঁকে অযোধ্যায় পাঠিয়েছিল বাবরি ভাঙতে। পাঠিয়েছিল বলবীরের বন্ধু যোগেন্দ্র পালকেও। তাঁরা হয়ে যান করসেবক।

বলবীর জানিয়েছেন, বাবরি ভেঙে পানিপথে ফিরে যাওয়ার পর সেখানে তাঁকে ও যোগেন্দ্রকে তুমুল সংবর্ধনা জানানো হয়। তাঁরা যে দুটি ইট এনেছিলেন বাবরির মাথায় শাবল চালিয়ে, সেগুলো পানিপথে শিবসেনার স্থানীয় অফিসে সাজিয়ে রাখা হয়।

কিন্তু বাড়িতে ঢুকতেই রে রে করে ওঠেন বলবীরের বাবা দৌলতরাম। বলবীরের কথায়, ‘বাবা আমাকে বললেন, হয় তুমি এই বাড়িতে থাকবে, না হলে আমি। তো আমিই বেরিয়ে গেলাম বাড়ি থেকে। আমার স্ত্রীও বেরিয়ে এলো না। থেকে গেল বাড়িতেই।’

ওই সময় ভবঘুরের মতো জীবন কাটিয়েছেন বলবীর। জানিয়েছেন, লম্বা দাড়িওয়ালা লোক দেখলেই ভয়ে আঁতকে উঠতেন তখন। বেশ কিছুদিন পর বাড়িতে ফিরে জানতে পারেন, বাবা মারা গেছেন। তিনি বাবরি ভাঙায় যে দুঃখ পেয়েছিলেন বাবা, তাতেই নাকি তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

এরপর পুরনো বন্ধু যোগেন্দ্রর খোঁজখবর নিতে গিয়ে আরো মুষড়ে পড়েন বলবীর। জানতে পারেন, যোগেন্দ্র মুসলমান হয়ে গেছেন। যোগেন্দ্র নাকি তখন বলবীরকে বলেছিলেন, বাবরি ভাঙার পর থেকেই তাঁর মাথা বিগড়ে গিয়েছিল। যোগেন্দ্রর মনে হয়েছিল, পাপ করেছিলেন বলেই সেটা হয়েছে। প্রায়শ্চিত্ত করতে গিয়ে তাই মুসলমান হয়ে যান যোগেন্দ্র।

এর পরই আর দেরি না করে সোনেপতে গিয়ে মাওলানা কালিম সিদ্দিকির কাছে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নেন বলবীর। হয়ে যান মহম্মদ আমির।

‘প্রায়শ্চিত্ত’ করতে কী কী করতে চান বলবীর সিংহ ওরফে মহম্মদ আমির?

বলবীরের কথায়, ‘কম করে হলেও ভেঙে পড়া শখানেক মসজিদ মেরামত করতে চাই।’

মালেগাঁওয়ে একটি জনসমাবেশে এসে নিজের গল্প শোনালেন আজকের ‘বাল্মীকি’ আমির। জানালেন, ১৯৯৩ থেকে ২০১৭—এই ২৪ বছরে উত্তর ভারতের মেওয়াতসহ বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু ভেঙে পড়া মসজিদ খুঁজে বের করে সেগুলো মেরামত করেছেন তিনি। উত্তর প্রদেশের হাথরাসের কাছে ভেঙে পড়া মেণ্ডুর মসজিদও সারাই করেন তিনি। সেই কাজে তাঁর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন তাঁর মুসলমান ভাইয়েরাই।



মন্তব্য