kalerkantho


আরো জীবন

ছনপাপড়িওয়ালা

বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার পৌরসভার ইয়ার্ড কলোনিতে থাকেন দুই ভাই—রফিকুল ইসলাম ও শফিকুল ইসলাম। তাঁদের কাজ ছনপাপড়ি বানানো। ঘুরে এসেছেন মাসুদ রানা আশিক

১৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ছনপাপড়িওয়ালা

রফিকুল ও শফিকুল

মাটির বাড়ি। ভেতরে অনেক মানুষ। আমাকে দেখেই রফিকুল এগিয়ে এলেন। রফিকুল আর শফিকুলদের আদি বাড়ি ফরিদপুরের বোয়ালমারী। তাঁদের বাবা বেলাল মাতুব্বরকে ছোট রেখেই দাদা আজিজ মাতুব্বর মারা যান। মাকে নিয়ে অকূল পাথারে পড়লেন। তখন ফরিদপুরে কাজকর্ম বেশি কিছু ছিল না। বাধ্য হয়েই মাকে নিয়ে পাড়ি জমান সান্তাহারে। ফেরি করে আইসক্রিম বিক্রি করতেন। কখনোসখনো আচার। বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্লাস্টিক বা লোহার জিনিসপত্র সংগ্রহ করে এনে বিক্রি করতেন ভাঙ্গারির দোকানে। বিয়ে করেন বগুড়া জেলার সোনাতলায়।

 

রফিকুল সবার বড়

বেলাল মাতুব্বরের সংসারে সবার বড় রফিকুল ইসলাম। জন্ম তারিখ মনে করতে পারেন না। বয়স পঁয়ত্রিশের মতো হবে। তাঁর পাঁচ বছরের ছোট শফিকুল। তাঁদের দুটি বোনও আছে। বড়টার বিয়ে হয়ে গেছে, ছোটটি সামনে এসএসসি দেবে। মোট ছয়জনের সংসার ছিল বেলাল মাতুব্বরের। রফিকুল বিয়ে করেছেন আদমদীঘিতে। তাঁর চার বছরের এক ছেলে আছে। শফিকুল বিয়ে করেছেন গাইবান্ধায়। তাঁর একটি আট মাস বয়সী মেয়ে আছে। রফিকুল পড়েছেন ক্লাস নাইন পর্যন্ত, শফিকুল এইট পাস।

 

অভাব ছিল

ছোটবেলায়ই রফিকুল ইসলাম বুঝতে পারেন তাঁদের অভাবের সংসার। বাবা অনেক খেটেও সুবিধা করতে পারেননি বেশি। রফিকুল পথ খুঁজতে লাগলেন। মামা জামাল ছনপাপড়ির ব্যবসা করতেন। রফিকুল তাঁকে গিয়ে ধরলেন। মামা যত্ন করেই তাঁকে ছনপাপড়ি বানানো শেখালেন। রফিকুল পড়ালেখা শিকায় তুলে দোকানে দোকানে ছনপাপড়ি সাপ্লাই করা শুরু করলেন। পুঁজি ছিল কয়েক হাজার টাকা। ব্যবসাটা শুরুতে সহজ ছিল না। বাকি পড়ত অনেক। নিজে গিয়ে দিয়ে আসতেন। বাসি মাল ফেরতও আনতে হতো। পয়সা পেতেন কম। এখন অবশ্য রফিকুলের নাম হয়েছে। দোকানে দোকানে মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে। কল করে বলে দেয় কত মাল লাগবে। দূরের মাল ট্রেনে বুক করে পাঠিয়ে দেন। দোকানিরাই পাওনা টাকা ব্যাংকে জমা দিয়ে দেন। অনেক জেলায়ই যায় রফিকুল-শফিকুলের ছনপাপড়ি। যেমন বগুড়ার ছাতাপট্টিতে নেন ভাই ভাই স্টোরের মালিক শাকিল পাইকার, জয়পুরহাটের বাটার মোড়ের সাজু স্টোর, সৈয়দপুুরের হিরু স্টোর, নাটোরের আশিক স্টোর, ঈশ্বরদীর মানিক স্টোর, টাঙ্গাইলের বল্লা বাজারের সুমন স্টোর বা কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ইউসুফ স্টোর। এ ছাড়া স্থানীয় অনেক পাইকার কেজি দরে ছনপাপড়ি নিয়ে গিয়ে বিক্রি করেন। দুই ভাইয়ের ব্যবসা বলে নাম দিয়েছেন ভাই ভাই ছনপাপড়ি।

প্যাকেট করা ছনপাপড়ি

ছনপাপড়ি যেভাবে

চিনি, ময়দা, ডালডা ও ঘি প্রয়োজন হয়। প্রথমে তিন কেজি ময়দা নিয়ে কড়াইয়ে ভাজা হয়। তারপর ভাজা ময়দা আলাদা করে রাখা হয়। ময়দা নামানো হলে পাঁচ কেজি চিনি কড়াইয়ে জ্বাল দিতে হয়। কমপক্ষে ৩০ মিনিট জ্বাল দেওয়ার পর চিনি গলে। আলাদা পাত্রে নামিয়ে হালকা ঠাণ্ডা করা হয়। তখন চিনিগুলো মিছরিদানার মতো হয়ে যাবে। লাল বর্ণ হয়ে যাওয়া চিনির পিণ্ডকে বড় একটা পিঁড়িতে গোলাকার করে রাখা হয়। তারপর চার-পাঁচজন মিলে চারদিক থেকে সেটি টানতে থাকে। এটিকে ফেটি বলা হয়। ১৫-২০ মিনিট টানার পর একটা পিঁড়িতে রাখা হয়। এরপর যে ময়দা ভাজা হয়েছিল সেই ময়দা আবার ডালডা অথবা ঘি দিয়ে ভাজা হয়। মিনিট পাঁচেক এই ময়দা ভাজার পর সেই ময়দা ফেটি করা চিনির ওপর রাখা হয়। কিছুক্ষণ পর ময়দা হালকা ঠাণ্ডা হলে চারদিক থেকে আট-নয়জন বসে পিণ্ডটা টানতে থাকে। একসময় সব ময়দা চিনির সঙ্গে মিশে যায়। যত বেশি টানা হবে তত ছনপাপড়ি চিকন হবে। পাটের আঁশের মতো হলেই বোঝা যাবে যে ছনপাপড়ি হয়ে গেছে।

 

দামদস্তর

রফিকুলের ছনপাপড়ি প্যাকেট হয় দুইভাবে। একটির দাম পাঁচ টাকা। আরেকটি দুই টাকা। পাঁচ টাকারটা এক বস্তায় থাকে ৭২০ পিস। পাইকারি দাম দুই হাজার ১০০ টাকা। তৈরির খরচ এক হাজার ৯২০ টাকা। খুচরা বিক্রি তিন হাজার ৬০০ টাকা। আর দুই টাকারটা এক বস্তায় থাকে এক হাজার ৪০০ পিস। পাইকারি দাম পড়ে এক হাজার ৮২০ টাকা। খরচ হয় এক হাজার ৬০০ টাকা। খুচরা বিক্রি দুই হাজার ৮০০ টাকা।

চিনি টানা

কর্মসংস্থান

রফিকুল আর শফিকুলের ছনপাপড়ির কারখানায় ১১ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন ছেলে আর ১১ জন মেয়ে। প্রত্যেককে ফেটিপ্রতি ১২ টাকা করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ প্রতিবার চিনি জ্বাল দেওয়া থেকে শুরু করে চিনির পিণ্ড টানা, ময়দা জ্বাল দেওয়া এবং প্যাকেট করা পর্যন্ত ১২ টাকা। প্রতিদিন কম করে হলেও প্রত্যেকে ১৮০ টাকা করে পান। রোজ সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কাজ করেন তাঁরা।


মন্তব্য