kalerkantho


বৈঠকখানা

আজ তবে চায়ের কথা হোক

একে তো শীত, তার ওপর চা-চক্র। ভারি একটা ভাব হয়। আলিয়ঁসে ফায়হাম শরীফের প্রদর্শনীর নাম ‘চা-চক্র : বাংলাদেশের চায়ের গল্প’। আড়াই বছর হবিগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল ও সিলেটের চা-বাগানে ঘুরে ঘুরে ছবিগুলো তুলেছেন। গল্প শুনে এসেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

২০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আজ তবে চায়ের কথা হোক

চা-বাগান শ্রমিক দম্পতির স্মৃতিচারণা। তেলিয়াপাড়া চা-বাগান, হবিগঞ্জ

শুধু ছবি নয়, চায়ের ইতিহাস, চা-শ্রমিকদের জীবনসংগ্রামসহ অনেক কিছুই ধরতে চেষ্টা করেছি। খুলে বললে এমন—চা কিভাবে উত্পন্ন হয়, কারা উৎপাদন করে, কারা নিয়ন্ত্রণ করে, মালিক কারা, কিভাবে নিলাম হয়, কারা কেনে, কারা খায়—মানে উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত পুরো চক্র নিয়েই আমার ভাবনা।

 

সিলেটে বড় হয়েছি

চায়ের সঙ্গে আমার ছোটবেলার যোগ। বাবা সরকারি চাকুরে ছিলেন। সে সূত্রে সিলেটে থেকেছি। ছাত্রও ছিলাম সিলেট ক্যাডেট কলেজের। চা-বাগানের কয়েকজন আমাদের কলেজেও কাজ করতেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। তখন ফটোগ্রাফি করেছি। চলচ্চিত্রেও আগ্রহী ছিলাম। আর ক্যারিয়ার শুরু করেছি সাংবাদিকতা দিয়ে। লিখতাম যেমন, ছবিও তুলতাম। এর মধ্যে ২০১৫ সালে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের চাঁদপুর ও বেগমখান বাগানে শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়। বাগানের কিছু জমি লিজ নিয়ে আবাদ করত শ্রমিকরা। সরকার সেখানে ইজেড করতে চাইল। সে কারণেই আন্দোলন।  খবর জোগাড়ের কাজে চুনারুঘাট গেলাম। সব দেখে মনে হলো, এখানে আরো অনেক কাজের সুযোগ আছে। সিদ্ধান্ত নিলাম চা-শ্রমিকদের জীবন নিয়ে ডকুমেন্টারি করব।

কাজে নেমে পড়লাম

চা-শ্রমিকরা পড়ালেখার সুযোগ পায় না। থাকার জায়গাও সে রকম নয়। মজুরি পায় খুব কম। তারা গুটিয়ে থাকে। সবাই তাদের সঙ্গে মেশেও না। বলা যায়, তাদের চলাচলের ওপরও বিধিনিষেধ আছে। কারণ খুঁজতে চেয়ে ইতিহাসের বই খুললাম। জানলাম, ইংরেজরা ভারতের চা-বাগানগুলোতে অনেক নিয়মকানুন করেছিল। সেগুলো শুধু মালিকের স্বার্থই দেখে। পরে যখন মালিকানা বদলাল তখনো নিয়মগুলো বহাল থেকে গেল। মালিক-শ্রমিক সম্পর্কটা এখানে যেন প্রভু আর দাসের। ২০১৮ সালে এসে চায়ের ইতিহাসের বয়স হয়েছে ১৬৪ বছর। বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। অথচ শ্রমিকের বেতন সেই ৮৫ টাকা। গেল আড়াই বছরে অনেকবার গেছি হবিগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল আর সিলেটের চা-বাগানে। প্রতিবারই থেকেছি সাত থেকে ১৪ দিন। শ্রমিকরা যেখানে থাকে সেটাকে বলে লেবার লাইন বা লেবার কলোনি। শ্রমিকদের মতোই থেকেছি, খেয়েছি। অনেকের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। এই সময়ের মধ্যে আমার চেনা ছয় বা সাতজন শ্রমিক মারা গেছেন। তাঁদের মধ্যে হীরামণি সাঁওতাল নামে একজন বীরাঙ্গনাও আছেন।

 

একটি বিশেষ কষ্ট

হবিগঞ্জের রেমা চা-বাগানে ময়নার বিল নামে একটা জায়গা আছে। একদিন ময়নার বিলে গেলাম। একটা বাচ্চাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটা ক্লিক করলাম। মাটিতে বসে ছিল ছেলেটা। আমাদের দেখে খালি হাসছিল! শরীরের তুলনায় ওর পেটটা বেশ বড়সড়। হাত দুটি ছোট। সোজা হয়ে হাঁটতে পারছিল না। কিছু বললে বুঝতেও পারছিল না। আশপাশে কথা বলে জানলাম, ওর মা-বাবা দুজনেই চা-বাগানে কাজ করে। ওর কী রোগ হয়েছে কেউ জানে না। বয়সও ভালোই। প্রচুর খায়। আমরা থাকতে থাকতেই ওর মা আসেন। বলেন, ডাক্তার-কবিরাজ দেখিয়েছি। কাজ হয়নি। আমার মনে এত দাগ কেটেছিল ঘটনাটি যে সেদিন আর ছবি তুলতে পারিনি। এখনো মানুষ এমন থাকে? এই প্রশ্নটাই বারবার মনে ঘুরছিল। আরো অনেক স্মৃতি আছে। অনেক ভালো স্মৃতিও আছে। ওদের বিয়েতে গিয়ে খুশি হয়েছিলাম। গত বছর কয়েকজন শ্রমিক নিয়ে ঢাকায় চিত্র-কাব্য-কনসার্ট করেছি। হবিগঞ্জে করেছি প্রাণের পরব নামে একটি অনুষ্ঠান। এসব অনুষ্ঠান আয়োজনে অনেকেই নানাভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। ফটোগ্রাফির ভাষায় আমার কাজটিকে বলে ফটোগ্রাফি ডকুমেন্টারি। আরো অনেক দিন কাজ করব। গত বছর ম্যাগনাম ফাউন্ডেশন ফান্ড ও দি ডকুমেন্টারি প্রজেক্ট ফান্ড থেকে গ্রান্ড প্রাইজ পেয়েছি। ভিজিটিং আর্টিস্ট হিসেবে আমন্ত্রণ পেয়েছি আমেরিকার হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটে। আশা করি ব্রিটেনে চা নিয়ে কাজ করারও সুযোগ হয়ে যাব। চা নিয়ে সেখানে দলিলপত্র আছে। 

ফায়হাম ইবনে শরীফ। ছবি: মাশরুক আহমেদ

প্রদর্শনী

প্রদর্শনী চলবে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত। সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রদর্শনী উন্মুক্ত থাকবে। আর শুক্র ও শনিবার ছবি দেখার সুযোগ হবে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা এবং বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। প্রদর্শনীতে মোট ছবির সংখ্যা ৪৮টি। রবিবার সাপ্তাহিক বন্ধ।


মন্তব্য