kalerkantho


আবহমান বাংলা

বিবেক ও স্মারক

সাহেব আলী যাত্রার বিবেক আর মিলন স্মারক। যাত্রা তাঁদের বেশি কিছু দেয়নি; কিন্তু যাত্রার টান তাঁরা অগ্রাহ্য করতে পারেন না। দুই যাত্রাপ্রেমীকে নিয়ে লিখেছেন ফখরে আলম

২০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বিবেক ও স্মারক

সাহেব আলী

সাহেব আলী বিবেক

ওরে পথিক এই তো বেলা শেষে

হলো না তোর পারে যাওয়া

চলে গেছে পারের ভেলা।

শূন্য ঘাটে একা একা কাদবিরে তুই বসে

এই তো বেলা শেষে।

শীতের গভীর রাত। হঠাৎই মঞ্চে ছুটে এসে খালি গলায় বিবেক ধরে এ গান, জেগে ওঠে রাত। যাত্রার দর্শক-শ্রোতার মনে কান্নার ঢেউ ওঠে। বিবেকের কাজ পথহারাকে পথ দেখানো। অত্যাচারীকে সতর্ক করার কাজও করে বিবেক। শত শত বছর ধরে যাত্রাপালায় রাজা, রানি বা ভিলেনের বিবেক জাগিয়ে তুলছে বিবেক।

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার মানিক আলী গ্রামের সাহেব আলী (৭২) যাত্রার একজন বিবেক। বিবেক হিসেবে তাঁর বয়স ৪৭।  হাজারবার তিনি মঞ্চে উঠেছেন। গেয়েছেন—অনেক ব্যথা বুকে জলভরা আঁখি, খাঁচা ভেঙে উড়ে গেল পাখি কিংবা যেদিন আমার গিয়েছে হারিয়ে, পাব না আর ফিরে, আমার বাঁশিতে সেদিনের সুর, বাজিবে না আর তেমনই মধুর।

 পেশায় সাহেব আলী একজন কৃষক। জানালেন, তিনি পাকিস্তান আমলের আন্ডার ম্যাট্রিক। তাঁর তিন ছেলে, এক মেয়ে। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় যাত্রা দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রথম বিবেকের পাট করছেন। বললেন, ‘স্কুলের ফাংশনে আমি গান গাইতাম। সাতভাই চম্পা সিনেমার গান বা শচীনকর্তার গান। আমাদের গ্রামের পাশের গ্রাম নিযামপুরে যাত্রা প্যান্ডেলে গান গাওয়ার জন্য আমাকে তুলে দেওয়া হয়। আমি খালি গলায় গান ধরি। সাতক্ষীরার রঞ্জন অপেরার ম্যানেজার আমার গান শুনে আমাকে তাঁর দলে রিক্রুট করেন। শুরু হয় আমার বিবেকের জীবন। তারপর কুষ্টিয়ার গীতাঞ্জলি, ঢাকার রাজধানী, খুলনার পূরবী, যশোরের সিজার, নার্গিস, মৌসুমী, চণ্ডি, আনন্দ অপেরাসহ আরো কয়েকটি যাত্রাদলে বিবেকের পাট করেছি। ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে বিবেকের অভিনয় করে পুরস্কার পেয়েছি। এখনো এই ৭২ বছর বয়সে বিবেক হওয়ার জন্য আমি বিনিদ্র থাকি। খবর পেলেই দূর-দূরান্তের যাত্রামঞ্চে ছুটে যাই। তবে ছেলেদের কাউকে বিবেক হতে দিইনি। কারণ এর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ’

 

মিলন হালদার

মিলন স্মারক

মিলন হালদার (৫৭) একজন স্মারক। ইংরেজিতে বলে প্রম্পটার। পর্দার আড়ালে থেকে নট-নটীকে সংলাপ স্মরণ করিয়ে দেওয়ার কাজ করেন স্মারক। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে স্মারক মিলন যাত্রায় আছেন। যশোরের অভয়নগর উপজেলার সড়াডাঙ্গা গ্রামে মিলনের বাড়ি। বললেন, ‘যাত্রায় অভিনয়ের খুব ইচ্ছা ছিল, কিন্তু চেহারা খারাপ বলে সুযোগ হয়নি। স্মারক হিসেবেই জীবন কাটিয়ে দিলাম। পেছনেই থাকলাম সব সময়।’

আরো বললেন, “তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। একদিন মনিরামপুর যাত্রা শুনতে যাই। ‘পাঁচ পয়সার পৃথিবী’ কী সুন্দর যাত্রা! অমলেন্দু বিশ্বাসের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হই। মাথার মধ্যে অভিনয়ের ভূত চেপে বসে। যাত্রার মালিকের সঙ্গে দেখা করে নিজের ইচ্ছার কথা বলি। কিন্তু নায়ক হতে গেলে নায়কের মতো চেহারা হতে হবে। তাই অন্য দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলেন। সেই থেকে আমি স্মারক। ১০০-২০০ পাতার ‘মরমি বধূ’, ‘নৌকাডুবি’, ‘দিল্লি অনেক দূর’, ‘লাইলি মজনু’ বা ‘বিনয়-বাদল-দিনেশ’ অপেরার বই পড়েই যাচ্ছি। প্রথম দল ছিল ঝিনাইদহের নবযুগ নাট্য সংস্থা। বেতন ছিল ১০০ টাকা। এরপর যশোরের প্রতীমা অপেরা, ঢাকার রাজধানী অপেরা, বরগুনার পদ্মা অপেরা, মনিরামপুরের সংগীতা অপেরা, যশোরের সিজার যাত্রা ইউনিটসহ আরো কয়েকটি যাত্রা দলে কাজ করেছি। খেয়াল রেখেছি, আমার প্লেয়ার (অভিনেতা-অভিনেত্রী) যেন মার না খায়। পড়তে পড়তে গলা শুকিয়ে গেছে; কিন্তু বই পড়া থামাইনি। প্লেয়ারকে উৎসাহ দিয়েছি।”

মিলন এখন ঠিকমতো দেখতে পান না। কিন্তু তার পরও বই পড়া থামাননি। তবে জীবিকার জন্য ভ্যানও চালান। প্রতিদিন তিন শ থেকে চার শ টাকা আয় হয় তাঁর। এ দিয়েই সংসার চলে। মিলনের দুই ছেলে। তারা স্নাতক পর্যায়ের ছাত্র। মিলন বললেন, “আমি  স্বপ্নেও  ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘আনারকলি’, ‘দুই টুকরো মা’ যাত্রার বই পড়ি।’


মন্তব্য