kalerkantho


সেতুবন্ধন

৫২ বছর পর আবার

১৯৬০ সালে প্রথমবার ট্রেনে খুলনা থেকে কলকাতা যান কাজী জালালউদ্দিন। ১৯৬৫ সাল অবধি এভাবে যাতায়াত করেছেন। তারপর সরাসরি ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আবার নতুন করে খুলনা-কলকাতা ট্রেন বন্ধন এক্সপ্রেস চলাচলের শুরুর দিনেও যাত্রী হয়েছিলেন তিনি। কলকাতা থেকে ফেরার পর তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন গৌরাঙ্গ নন্দী

২০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



৫২ বছর পর আবার

কাজী জালালউদ্দিন এখন ৭৮ বছরের যুবা। লম্বা-চওড়া বেশ দশাসই চেহারা। ঘুরে বেড়ান। ভারতে যে কতবার গিয়েছেন, তার ঠিক-ঠিকানা নেই। চিকিৎসা করাতে নিয়মিতই যাওয়া হয়। ছেলের পড়াশোনার সুবাদেও অনেকবার মাদ্রাজ গিয়েছেন, থেকেছেনও। সামনের পরিকল্পনা দিল্লি যাবেন, চিকিৎসা করাতে। সঙ্গে অবশ্যই থাকবেন তাঁর একান্ন বছরের দাম্পত্য জীবনের সঙ্গী রহিমা জালাল।

জালালউদ্দিন পিরোজপুরের কাজীবাড়ির ছেলে। এখন থাকেন খুলনায়। জন্ম ১৯৪০ সালের ১২ ডিসেম্বর। দুই ভাই, সাত বোনের মধ্যে সবার ছোট। সবার ছোট হওয়ায় বেশ আদুরে ছিলেন, পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গেও ছিল খুব ভাব। বাড়ির আশপাশে অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বী বারুজীবী সম্প্রদায়ের মানুষের বাস ছিল। তাদের অনেকের বাড়িতে জৌলুস না থাকলেও পূজা-পার্বণ সামনে রেখে বেশ আড়ম্বর হতো। সেই সময়ে বেশ ‘রয়ানি’ গানের চল ছিল। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে তিনিও রয়ানি গানের দলে ভেড়েন। গান গাইতেন না, ‘চাকি’ বাজাতেন।

প্রতিবেশী বারুজীবী সম্প্রদায়ের মানুষগুলো সেই সময়ে একে একে দেশ ছাড়তে শুরু করেছে। জালালউদ্দিনের মনে কষ্ট জমতে থাকে। দেখার ইচ্ছা জাগে সেই প্রতিবেশীদের। সেই ভাবনা থেকে পিরোজপুর থেকে লঞ্চে খুলনা এসে সেখান থেকে ট্রেনে করে সোজা কলকাতা। তখন ১৯৬০ সাল। যেতে তখন পাসপোর্টও দরকার হতো না। ট্রেনে চেপে বসলেই হতো। ভাড়া মাত্র দেড় টাকা। ট্রেনের কামরায় কাঠের বেঞ্চি। কামরাগুলোও অতটা সুদৃশ্য ছিল না। 

সেই থেকে তিনি অনেকবার গিয়েছেন। এরপর অবশ্য পাসপোর্ট তৈরি করতে হয়েছে। তখন তো হাতে লেখা পাসপোর্টের কাল। ট্রেনের কামরার মধ্যেই ইমিগ্রেশনের প্রয়োজনীয় কাজকর্ম হতো। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর বন্ধ হয়ে যায় সরাসরি ট্রেনযোগাযোগ।

দেশ স্বাধীনের পর তিনি আরো অনেকবার ভারতে গিয়েছেন। ভারতের প্রায় সব বড় শহরে ঢু মেরেছেন। ঢাকা-কলকাতা সরাসরি ট্রেন সার্ভিস চালু হয়েছে আগেই। জালালউদ্দিন অপেক্ষায় ছিলেন কবে খুলনা-কলকাতা ট্রেন চালু হবে। তাঁর ভাষায়, ‘আগে খুলনা-কলকাতা সরাসরি ট্রেন সার্ভিস ছিল। খুলনার মানুষ সকালের ট্রেনে কলকাতায় গিয়ে কাজ সেরে সন্ধ্যার ট্রেনে ফিরত।’

অবশেষে জালালউদ্দিনের অপেক্ষার অবসান হলো। বাংলাদেশ ও ভারতের সরকার খুলনা-কলকাতা সরাসরি ট্রেন সার্ভিস চালুর ঘোষণা দেয়। বন্ধন ট্রেন। খুলনা-কলকাতা সরাসরি ট্রেন। জালালউদ্দিন প্রথম ট্রেনেই যাত্রী হওয়ার প্রস্তুতি নেন।

১৬ নভেম্বর কলকাতার চিত্পুর রেলস্টেশন থেকে সকাল ৭টায় ছেড়ে দুপুর সাড়ে ১২টায় পৌঁছে খুলনা রেলস্টেশনে। ওই ট্রেনই যাত্রী নিয়ে দুপুর দেড়টায় কলকাতার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এই ট্রেনযাত্রার উদ্বোধনীতে আসেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রীংলা। তিনি কাজী জালালউদ্দিনকে আলিঙ্গন করেন। বলেন, তাঁকে তাঁর সরকার ১০ বছরের ভিসা দেবে।

এই ট্রেনযাত্রা নিয়ে কাজী জালালউদ্দিনও উচ্ছ্বসিত। তিনি বলেন, ‘এখনকার ট্রেন অনেক চমৎকার! চমৎকার কামরা, সোফাসেট। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।’ তবে ট্রেনে খাবারের ব্যবস্থা না থাকাটা তাঁর ভালো লাগেনি। ভালো লাগেনি বেনাপোল নেমে ইমিগ্রেশন করিয়ে আবারও ট্রেনে ওঠার বিষয়টাও। মালামাল নিয়ে ট্রেন থেকে নামা, আবারও ওঠা বেশ পীড়াদায়ক। তবে তিনি নিজেই বলেন, ‘কিছু করারও নেই। আগের মতো আর হাতে লিখে সব কাজ তো হয় না, এখন অনেক কিছুই হয় ডিজিটাল পদ্ধতিতে। যে কারণে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে যেতে হয়।’

ভারতের অংশে ইমিগ্রেশনের পর্ব সম্পন্ন হয় চিত্পুর রেলস্টেশনে, একেবারে নেমে গিয়ে। খুলনা থেকে বন্ধন ট্রেনটি ছেড়ে সোজা থামে বেনাপোল স্টেশনে। সেখানে গিয়ে ইমিগ্রেশন পর্ব সেরে আবার ছোটে কলকাতার দিকে। ভারতীয় অংশে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই দেখা যায় নিরাপত্তার বিশেষ ব্যবস্থা। প্রতি বগিতেই সশস্ত্র প্রহরা। আর চিত্পুর স্টেশনে ১০টি কাউন্টারে ইমিগ্রেশন পর্বের আনুষ্ঠানিকতা। 

বন্ধন ট্রেনটি এখন সপ্তাহে এক দিন, শুধু বৃহস্পতিবার যাতায়াত করছে। সকালে কলকাতা থেকে ছেড়ে আসে, আবার ওই ট্রেনই খুলনা থেকে ফিরে যায়। ভাড়া ১৫০০ টাকা। জালালউদ্দিন বলেন, ‘ভাড়া ৫০০ টাকা হওয়া উচিত। আর ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাও আরো সহজ করা উচিত, তা না হলে যাত্রী আকর্ষণ করতে পারবে না। ইতিমধ্যেই প্রথম দিনের তুলনায় যাত্রীসংখ্যা কমে গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে একসময় যাত্রী একেবারে কমে যাবে। তখন হয়তো সরাসরি এই ট্রেন সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাবে!’


মন্তব্য