kalerkantho


মহাপৃথিবী

গণেশ দেবি ভাষা খুঁজে ফেরেন

ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন গণেশ নারায়ণ দাস দেবি। কিন্তু নাম করেছেন ভাষা খুঁজে ফিরে। বিবিসি তাঁর সম্পর্কে লিখেছে, মানুষটি ৭৮০টি ভারতীয় ভাষা ‘আবিষ্কার’ করেছেন। আগ্রহ দেখিয়েছেন আরিবা রেজা

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



গণেশ দেবি ভাষা খুঁজে ফেরেন

মহারাষ্ট্রের সালক ভাষার পাণ্ডুলিপি

গণেশ দেবির ভাষা বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। কিন্তু ভাষা নিয়ে তাঁর প্রেমের কথা ভিনদেশিরাও জানে। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ভাষা গবেষণা ও প্রকাশনা কেন্দ্র। সরকার ও ইউনেসকোকে সহযোগিতা করেছেন ভাষা বৈচিত্র্য বুঝতে ও সংরক্ষণ করতে। সরকারের আগ্রহে তাঁর নেতৃত্বেই  ২০১০সালে তিন হাজার গবেষক ভারতে ভাষা জরিপ করেছেন। প্রকল্পটির নাম ছিল পিপলস ল্যাংগুয়েজ সার্ভে অব ইন্ডিয়া (পিএলএসআই)। তাঁরা ভারতে মোট ৭৮০টি ভাষা খুঁজে পেয়েছেন। এর মধ্যে ১৯৭টি ভাষা বিপন্ন, ৪২টি বেশি বিপন্ন। ওই দল আরো দেখেছে অরুণাচল, পূর্ব-উত্তর আসাম, পশ্চিম মহারাষ্ট্র, পশ্চিম বঙ্গের পূর্বাঞ্চল এবং রাজস্থানে ভাষার সংখ্যা বেশি। ৬৮টি হস্তলিপি রয়েছে ভারতে। ৩৫টি ভাষায় সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। দেশের ৪০ ভাগ মানুষ হিন্দিতে কথা বলে। বাংলায় বলে ৮ শতাংশ মানুষ। তেলেগুতে  বলে ৭.১ শতাংশ মানুষ, মারাঠি ভাষা বলে ৬.৯ শতাংশ। অরুণাচলে সবচেয়ে বেশি ভাষার সন্ধান পাওয়া গেছে। সংখ্যাটি ৯০। গবেষণাটি আরো দেখিয়েছে, গত পাঁচ দশকে ২২০টি ভাষা হারিয়ে গেছে। ইউনেসকো পরে হিসাব করে দেখেছে, বিপন্ন ভাষা সংখ্যার তালিকায় ভারত সবার ওপরে, ১৯৭টি। তারপর যুক্তরাষ্ট্র ১৯১টি। ব্রাজিলে ১৯০টি। চীনে ১৪৪টি। নেপালে ৭১টি। উল্লেখ্য, ইউনেসকো সারা পৃথিবীতে দুই হাজার ৪৬৫টি বিপন্ন ভাষার সন্ধান পেয়েছে। 
 

২০০৬ সাল

গণেশ দেবি ও তাঁর স্ত্রী সুরেখা ভাবলেন, বরোদায় আর থাকবেন না। উল্লেখ্য, বরোদার মহারাজা সয়াজি রাও বিশ্ববিদ্যালয়েই ইংরেজি পড়াতেন দেবি। প্রথমে ভাবলেন, সিকিমে গিয়ে থাকবেন। কিন্তু সুরেখার আবার হাঁটুতে সমস্যা, তাই পাহাড়ি এলাকা বাদ। তারপর আসামের তেজপুরের কথা ভাবলেন। শেষে কর্নাটকের ধারওয়ার। দেবি আগেও ধারওয়ারে গেছেন। একটি ছোট্ট ছিমছাম বিশ্ববিদ্যালয় শহর। নাট্যকার গিরিশ কারনাড, উচ্চাঙ্গসংগীত শিল্পী ভীমসেন যোশী এবং গাঙ্গুবাই হঙ্গলের সঙ্গে পরিচিত এই শহর। ধারওয়ারের বাড়ির বসার ঘরে বসে দেবি বলেছিলেন, ধারওয়ারে শহুরে জঞ্জাল আসতে এখনো বাকি অনেক। একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে এমন শহর ভারতে খুব বেশি নেই। আমরা দীর্ঘদিন ছিলাম ইন্দো-আর্য (ফারসি, আরবি ও তুর্কি ভাষা মিলেমিশে তৈরি) ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে, এখানে পাচ্ছি দ্রাবিড়দের (এদের প্রধান চারটি ভাষা হলো তেলেগু, তামিল, মালায়ালাম এবং কন্নড়)। ধারওয়ারের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।’

 

গণেশ দেবির কথা

পুনের কাছে ভর নামের জায়গায় এক গুজরাটি পরিবারে ১৯৫০ সালে তাঁর জন্ম। পিএইচডি করেছেন শ্রী অরবিন্দের কবিতা নিয়ে। বরোদার (এখন ভাদোদরা) এমএস বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন ১৯৭৩ সালে। ২৩ বছর অধ্যাপনা করে ১৯৯৬ সালে অবসরে যান। ভাষা গবেষণা ও প্রকাশনা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে যাযাবর আদিবাসীদের অধিকার নিয়েও কাজ করতে থাকেন। ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ভাষাতাত্ত্বিক পিটার অস্টিন বলেন, ‘দেবির কাজ অন্য ভাষাবিদদের চেয়ে আলাদা এই কারণে যে তিনি তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করেছেন।’ দেবি পৃথিবীর ৫০টি দেশের ১৫০ জন ভাষাবিদ নিয়ে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজ করছেন এখন। বলেছেন, ‘পৃথিবীজুড়ে অনিবন্ধিত মানুষের ভাষা নিয়ে কাজ করতে পারাটা বিরাট ব্যাপার বলেই ভাবছি। এভাবে এর আগে বেশি ভাবা হয়নি। বলতে পারেন এটা একটা নতুন কিছু।’ এ জন্য দেবি গ্লোবাল ল্যাংগুয়েজ স্ট্যাটাস রিপোর্ট (জিএলএসআর) নামের প্রকল্প চালু করেছেন। বলেছেন, ‘আগে আমরা ভাষার ভৌগোলিক বিস্তার নিয়ে কাজ করেছি। আর জিএলএসআর দেখবে কিভাবে ভাষা টিকে থাকে? বিপন্ন ভাষা টিকে থাকবে না হারিয়ে যাবে? যেগুলো হারিয়ে যাবে সেগুলোর স্থান কারা দখল করবে?’ গবেষকরা বলছেন, দেবির এই প্রকল্প পৃথিবীর সাড়ে ছয় হাজার ভাষার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবে। উল্লেখ্য, গণেশ দেবি পদ্মশ্রী পদক পেয়েছেন ২০১৪ সালে।

 

দেবির গবেষণায় বিশেষ প্রাপ্তি

হিমাচল প্রদেশের ১৬টি ভাষায় ২০০টি শব্দ রয়েছে শুধু বরফ নিয়ে। কোনো কোনো শব্দ আবার অলংকারসমৃদ্ধ। প্রকাশ করে গভীর ভাব। যেমন পরতে পরতে পানি জমেছে। দেবি দেখেছেন, রাজস্থানের যাযাবরদের বিরানভূমি বোঝানোর অনেক শব্দ আছে। শূন্যতার মতো কাব্যিক শব্দও আছে এর মধ্যে। তিনি দেখেছেন মহারাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে এখনো সেকেলে পর্তুগিজ চালু আছে। আন্দামান আর নিকোবরের লোককে কারেন ভাষায় কথা বলতে শুনেছেন। মিয়ানমারের একটি জাতিগোষ্ঠীর ভাষা এই কারেন। তিনি অবাক হয়েছেন দেখে, গুজরাটের কিছু লোক জাপানি ভাষায় কথা বলে। 

 

একটি বিশেষ ঘটনা

দেবি ১১টি আদিবাসী ভাষায় একটি সাময়িকী প্রকাশ করেছিলেন। সেটি ১৯৯৮ সালের কথা। তিনি একটি থলেতে পুরে সাময়িকীটির ৭০০ কপি একটি দরিদ্র আদিবাসী এলাকায় নিয়ে গিয়েছিলেন। থলেটি তিনি ফেলে চলে এসেছিলেন। বলে এসেছিলেন, যদি কেউ এখান থেকে একটি বই নাও, তবে বিনিময়ে ১০ রুপি রেখে যেয়ো। দিনশেষে থলিটিতে কোনো কপি অবশিষ্ট ছিল না। ফিরে এসে তিনি দেখেছিলেন, থলিটি রুপিতে ভরা। সবাই ১০ রুপি করে দেয়নি, বরং যে যা পেরেছে দিয়েছে। বলেছেন, তাঁরা দিনমজুর। কিন্তু নিজেদের ভাষার কিছু দেখতে পেয়ে মজুরির পুরোটাই হয়তো রেখে গেছেন। ভাষার প্রতি মানুষের এমনই টান। এতটাই বন্ধন।


মন্তব্য