kalerkantho


ফেসবুক থেকে পাওয়া

১০ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ফেসবুক থেকে পাওয়া

মাতালের মানবতা

মা হঠাৎ কল দিয়ে বললেন, ‘এখনই গাড়িতে ওঠ। বাড়িতে চলে আয়, ঝামেলা হয়ে গেছে।’ তড়িঘড়ি করে সকাল ১১টার বাসে উঠলাম। ঢাকা থেকে চুয়াডাঙ্গা—প্রায় ২১৭ কিলোমিটার। সেখান থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ভেতরে আমার গ্রাম। পৌঁছতে পৌঁছতে অনেক রাত হয়ে যাবে। তাই শীতের কাপড়চোপড় সঙ্গে নিয়েই বের হলাম। ফেরিতে খুব একটা সময় লাগল না। তবে চুয়াডাঙ্গা পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা ৬টা বাজল। ভাগ্যক্রমে একটা অটো পেয়ে গেলাম। অটোতে পরিচয় হয় এক মাঝ বয়সী মাতালের সঙ্গে। আমার পরনে কালো প্যান্ট আর কালো জ্যাকেট। এটা দেখে লোকটা ভেবে বসে—আমি পুলিশের লোক। লোকটার পকেটে তখনো মদের বোতল। লোকটা একটু ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করে আমার সঙ্গে। উনি হরিজন, পেশায় সুইপার। উনার ২১ বছরের একটা ছেলে আছে। গ্রামে নতুন থানা হয়েছে। সেখানে ছয়জন সুইপার রেখেছে। কিন্তু তার ছেলেকে রাখা হয়নি। খুব দুঃখ তার।

আমাকে বারবার বলল, ‘স্যার, আপনি যদি বলে দেন, তাহলে ছেলেটার চাকরি হয়ে যায়। ঘুষের কারণে চাকরি হচ্ছে না।’ আমি লোকটাকে বোঝাই যে আমি পুলিশের লোক না। তবু ছাড়ে না। কিছুক্ষণ পর অটো বন্ধ হয়ে গেল। আর যাবে না।

আমার বাড়ি এখান থেকে আরো ১৫ কিলোমিটার দূরে। ওই মাতাল লোকটি আমাকে বলে, ‘স্যার, আপনাকে কোনো টেনশন করা লাগবে না।’ উনি ছেলেকে কল দিয়ে ডেকে আনেন। রাত তখন ১০টা। গ্রামে তখন সুনসান নীরবতা। রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই। তবু ওই ছেলেটি অনেক কষ্টে একটা মোটরসাইকেল জোগাড় করে কনকনে শীতের রাতে আমাকে পৌঁছে দেয়। ছেলেটা আমাকে রেখে যাওয়ার পর ওর পথের দিকে তাকিয়ে থাকি, ভাবি, যদি কোনো দিন বড় অফিসার হতে পারি, ছেলেটাকে ডেকে বলব, ‘নে, চাকরি কর। ভাবিস না, চাকরিটা এমনি দিলাম। এর জন্যও ঘুষ লেগেছে। তবে এই ঘুষ কোনো টাকা-পয়সা না, এটা হলো ওই রাতের সেই মানবতা।’

আল সানি

সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

 

আমার বাবা

বাবার দেওয়া সস্তা ঘড়িটায় নামকরা কোনো ব্র্যান্ডের সিল বাড়ায় না সময়ের যশ। ওতে লেগে থাকে একবেলা শাক, মাছ না কিনেও ‘এবেলা চলে যাবে’ বলার সৎ সাহস।

বাবার সততার স্পর্শে ওই ঘড়িটাই হয়ে যায় সবচেয়ে দামি ঘড়ি। যদিও গুগলের সার্চ লিস্টে তা পাওয়া যায় না। বাবার দেওয়া ঘড়িও নামকরা ব্র্যান্ডের ঘড়ির মতো নির্ভুল হিসাব দেখায়। পার্থক্য কিছুই রয় না। বাবার দেওয়া পোশাকটায় সবার পরিচিত ফ্যাশন হাউসের টোকেন হয় না শোভিত। সেখানে থাকে বাবার পছন্দের শার্টটা না কিনে বলা, ‘আরে আমার অনেক শার্ট আছে। আমরা আমরাই তো। সেই পোশাকে শরীর ঢাকে, সঙ্গে ঢেকে যায় সামর্থ্য আর সাধ্যের হিসাবের কিছু টুকরো।’ বাবা ভাবেন, বেতনটা জানি কবে পাব? পরের মাস আসতে বাকি কয়টা শুক্রবার? আমার বাবার দেওয়া আদরে থাকে না সোনামণি, জাদুমণি কিংবা মাই প্রিন্সেস বলে ডাক। ভালোবেসে ডাকা ‘গরুর বাচ্চা’ ডাকটাই বারবার করে আমাকে অবাক। বাবা কখনো পাঁচ তারকা হোটেলে সারপ্রাইজ পার্টি করাতে নেন না আমাদের, নিজের পাত থেকে খাবারের কিছু অংশ আমাদের পাতে তুলে দেওয়ায়ই ভালোবাসা থাকে ঢের!

আমার বাবার দেওয়া সব কিছুতে থাকে নিখাদ ভালোবাসার বিশাল সমুদ্র, নামিদামি ব্র্যান্ড, অর্থ, সাম্রাজ্য—সব যেখানে নিতান্তই নামমাত্র বা ক্ষুদ্র। আমার সহজ-সরল আর ভীষণ সৎ বাবার মধ্যে থাকে শুধু অসীম পবিত্রতা। আমি গর্ব করে প্রতিবার তাই বলতে পারি, ‘ইনি আমার জনক, আমার পিতা।’

নিশীতা মিতু

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি)।

 

ক্যানভাসে ক্যাম্পাস

গল্পের শুরু ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি। কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে যখন পা রাখলাম ভার্সিটি লাইফে। সব নতুন মুখ। কাউকে চিনতাম না, জানতাম না। ভাবতাম কেমন যেন সব—মিশতেও চায় না। নিজেই গায়ে পড়ে মিশতাম কারো কারো সঙ্গে। আস্তে আস্তে দূরত্ব কমল। ৫ থেকে ১০ জন, ১০ থেকে ১৫ জন করে গ্রুপটার পরিধি বাড়ল। আমাদের হৈচৈ আর আড্ডায় গমগম ক্লাসরুম, সেমিনার। কখনো নাচে-গানে, কখনো আড্ডায় জমে থাকে দিনগুলো। ক্লাস শেষে নাশতা খাওয়ার পারমানেন্ট হোটেলও হয়ে গেছে। নানা ধরনের ছেলে-মেয়ে, কেউ নিজের দুখ-কষ্ট ভুলে সর্বদা অন্যকে আনন্দ দিতে ব্যস্ত, কেউ আবার অল্পতেই রাগী, কেউ বা বড্ড অভিমানী। কেউ আবার লাজুক, কেউ খুব বোকাপড়ুয়া, কেউ চাপাবাজিতে ওস্তাদ, কেউ হাড়কিপটে। কখনো কারো জন্মদিন পালনের নাম করে হাসি-মজার সুযোগ খুঁজে নেওয়া আর কখনো বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যাওয়া, পিক আপলোড দেওয়া। এই তো কাটছে জীবন। আমরা একটা পরিবার। যেখানে সবাই সবাইকে ভালোবেসে আগলে রেখেছি।

জীবনের অনেক পাওয়ার মধ্যে একটা বড় পাওয়া হলো এমন কতগুলো বন্ধু আর এমন একটা পরিবার। আর অনেক কিছু হারিয়েছিও; কিন্তু সব থেকে বেশি হারাব কখনো এই পরিবার থেকে আলাদা হয়ে গেলে। অটুট থাকুক বন্ধুত্ব, অক্ষত থাকুক পরিবার—আমাদের পদার্থবিজ্ঞান পরিবার।

অদিতি চক্রবর্তী

চট্টগ্রাম কলেজ।



মন্তব্য