kalerkantho


খুঁজে ফেরা

তুঘলকের রাজধানী জাঁহানপনা

মোহাম্মদ মাহবুবুর নূর হিল্লি-দিল্লি ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিন বছর ধরে। খুঁজে বেড়াচ্ছেন পুরনো রাজধানীগুলো। তুঘলকের রাজধানী জাঁহানপনা দেখে তিনি সত্যি অবাক হয়েছেন।

৩১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



তুঘলকের রাজধানী জাঁহানপনা

মুহম্মদ বিন তুঘলককে বলা হয় ম্যাড জিনিয়াস। যুদ্ধের ময়দানে থাকতেই বেশি পছন্দ করতেন এবং কোনো যুদ্ধেই হারেননি। বিশ্বের অনেক দেশের সঙ্গেই তাঁর যোগাযোগ ছিল। নিয়মিত তাঁর দরবারে ভিনদেশি দূতেরা হাজিরা দিত। এই তুঘলকেরই রাজধানী জাঁহানপনা। এর অর্থ জগতের আশ্রয়। দিল্লির চার নম্বর শহর এটি। এখনকার দিল্লি অষ্টম শহর। জাঁহানপনা বাদ দিলে আরো যে ছয়টি থাকে সেগুলোর নাম লালকোট, সিরি, তুঘলকাবাদ, ফিরোজাবাদ, দিনপনাহ ও শাহজাহানাবাদ। দিল্লি থেকে জাঁহানপনা যাওয়া যায় অটোরিকশায় চড়েই। বলতে হয় বেগমপুর গ্রামের কেল্লায় যাব।

 

বাকি আছে কিছু

জাঁহানপনার কিছু অংশ টিকে আছে এখনো। তারই খোঁজে চলেছি। মোঙ্গল আক্রমণ থেকে বাঁচতে তুঘলক লালকোট, সিরি, তুঘলকাবাদ ও রাজধানী জাঁহানপনাকে দেয়াল দিয়ে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। অর্থাভাবে অবশ্য এ বিশাল দেয়াল নির্মাণ শেষ করতে পারেননি। এখনো খিরকি গাঁয়ে দেয়ালের কিছু অবশেষ দেখা যায়। অলিগলি পেরিয়ে লোহার গেটের ভেতর দিয়ে পৌঁছলাম জাঁহানপনার বিজয়মণ্ডলের সামনে। এখানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার একটি সাইনবোর্ড আছে। আরেকটি বোর্ডে লেখা আছে ইবনে বতুতার কথা। তিনি এখানে এসেছিলেন।

 

ঘুরে ঘুরে দেখলাম

বিজয়মণ্ডলে আছে উঁচু একটি মঞ্চ। চুন, সুরকি আর পাথরের তৈরি। সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়। মঞ্চে ওঠার পর একজন মানুষ পেলাম। তিনি প্রত্নতত্ত্ব দপ্তরের গার্ড। এককোণে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। সামনে চোখ মেলে দিয়ে একটু দূরের খোলা প্রান্তরে সুফি শেখ হাসান তাহিরের সমাধি দেখতে পেলাম। সিকান্দার লোদীর শাসনামলে (১৪৮৯-১৫১৭) শেখ সাহেব এখানে বসবাস করতেন। আরো সিঁড়ি ভেঙে বিজয়মণ্ডলের ছাদে উঠলাম। ছাদে একটি আটকোনা ঘর আছে। বলা হয়ে থাকে তুঘলক এখান থেকে তাঁর সামরিক বাহিনীর অনুশীলন দেখতেন। বিজয়মণ্ডলের পাশেই আছে একটি বড় গম্বুজওয়ালা ভবন। ধারণা করা হয়, এটি ছিল বৈঠকখানা। সুলতানের সঙ্গে যাঁরা দেখা করতে আসতেন তাঁরা এখানে নাম-পরিচয় খাতায় উঠাতেন। তারপর ডাক না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন। ঘরের ভেতর দিয়ে কিছুটা এগিয়ে গেলাম। বিজয়মণ্ডলের সঙ্গে একটি পথ এই ভবনের সঙ্গে যোগ করা ছিল। জাঁহানপনায় হাজার সুতুন বা হাজার স্তম্ভের ঘরও আছে। হাজার সুতুন সুলতান আলাউদ্দিন খিলজিরও ছিল, তবে সেটা তাঁর রাজধানী সিরিতে। হাজার সুতুনের বেশি কিছু আর অবশিষ্ট নেই। পিলারগুলো শুধু বিলাপ করছে।

 

তুঘলকদের কিছু কথা

১৩২১ থেকে ১৪১৪ সাল পর্যন্ত মোটমাট ১০৭ বছর তুঘলক বংশ দিল্লির গদিতে সমাসীন ছিল। প্রথম তিন তুঘলক গিয়াসউদ্দিন তুঘলক (১৩২১-১৩২৫), মুহম্মদ বিন তুঘলক (১৩২৫-১৩৫১) এবং ফিরোজ শাহ্ তুঘলক (১৩৫১-১৩৮৮) শাসন করেন ৬৭ বছর। দিল্লির পুরনো সাতটি রাজধানীর তিনটিই তাঁদের হাতে তৈরি। মুহম্মদ বিন তুঘলক দিল্লির পাশাপাশি মহারাষ্ট্রের দৌলতাবাদেও রাজধানী স্থাপন করেন। তিনি চেয়েছিলেন জোড়া রাজধানী তৈরি করতে। দৌলতাবাদে তিনি একটি নতুন অভিজাত শ্রেণি তৈরি করতে চেয়েছিলেন। এরই ফলে বাহমনি বংশের উত্থান ঘটে। ইবনে বতুতা তখনকার দিল্লির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি কাজির দায়িত্বেও ছিলেন কিছুকাল। তাঁর লেখা থেকে পাচ্ছি, ১৩৩৪ সালের মার্চের দুর্ভিক্ষে দিল্লিতে ছয় মাস ধরে শস্য বিতরণের আদেশ দেন সুলতান। মুহম্মদ বিন তুঘলক পারস্য থেকে চীন পর্যন্ত সালতানাতের প্রসার ঘটাতে চেয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে গদিতে বসেন ফিরোজ শাহ্ তুঘলক। তিনি ভারতের সেচ ব্যবস্থার জনক। তিনি পাথুরে দিল্লিকে শস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেন। তুঘলকদের আমলের বেশির ভাগ সময় বাংলা দিল্লির সঙ্গেই যুক্ত ছিল।

 

ছবি : লেখক ও সংগ্রহ


মন্তব্য