kalerkantho


রাজশাহী বাইপাস নির্মাণে ব্যয় ১৮২ কোটি টাকা

এক বাড়িতে মুখ থুবড়ে প্রকল্প

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



এক বাড়িতে মুখ থুবড়ে প্রকল্প

রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের সঙ্গে রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কের সংযোগস্থলের মুখে আলিম লাম মীম ইন্ডাস্ট্রিজের এই বাড়ি। ইনসেটে বাড়ির পেছনের অংশ। ছবি দুটি গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

১৮২ কোটি টাকার প্রকল্প। নির্মিত হবে রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কের সঙ্গে রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের সংযোগ, যা হবে নগরীর বাইপাস (বিকল্প সড়ক)। নির্মাণকাজের প্রায় ৬৭ শতাংশ শেষ হয়েছে। কিন্তু পুরো প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে একটি বাড়ির কারণে।

নগরীর আলিফ লাম মীম ভাটা এলাকার ওই বাড়ির মালিক প্রয়াত আব্দুল মতিন। তাঁর ওয়ারিশরা বাড়ির ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণকাজের ওপর আপত্তি জানিয়ে উচ্চ আদালতে রিট করেছেন। আদালত সম্প্রতি ওই অংশ দিয়ে রাস্তা নির্মাণকাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। বাড়ির পূর্ব দিকে পৌনে সাত কিলোমিটার রাস্তার বেশির ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কোয়াটার কিলোমিটারের কাজ করা যাচ্ছে না।

অভিযোগ উঠেছে, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের উদাসীনতার কারণে বাড়ি মালিকের রিট পিটিশনটি নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। এত বড় একটি প্রকল্প একজন ব্যক্তির আপত্তির কারণে থমকে থাকায় নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কারণে স্থানীয় কয়েক শ লোকের বাড়িঘর ও জমি গেছে। যদিও ক্ষতিগ্রস্ত সবাই ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে। তার পরও জমিভিটা হারিয়ে নগরবাসীর সুবিধার কথা বিবেচনা করে প্রকল্পটিতে বাধা দেয়নি তারা। কিন্তু ভাটা মালিকের ওয়ারিশরা প্রকল্পের বিপরীতে অবস্থান নেয়। এর ফলে প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। প্রকল্পটি শুরু হয় সাবেক মেয়র এ এইচ এম খাইরুজ্জামান লিটনের আমলে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই প্রকল্পের আওতায় রাজশাহীতে প্রথম একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হবে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের জনসভায় যোগ দিতে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন। ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ শুরুর দিকে। সাত কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৬০ ফুট প্রস্থের এই সংযোগ সড়কটির কাজ শেষ হলে নগরীর যানজট নিরসন হবে।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, আলিফ লাম মীম ভাটার (অনেক আগে সেখানে ইটভাটা ছিল) পূর্ব দিকে রাস্তার কাজের এখন শুধু কার্পেটিং করতে বাকি রয়েছে। ভাটা এলাকার সঙ্গে একটি নালা থাকায় সেখানে সেতু নির্মাণকাজ চলছে। ফলে কার্পেটিং ছাড়া প্রায় সব কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু ভাটা এলাকায় এসে থমকে আছে এ সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি। ভাটা এলাকার পূর্ব দিকের কলার জমি এবং পশ্চিম দিকে রয়েছে একটি বাড়ি। কলার জমি এবং বাড়ির মাঝখান দিয়ে বাকি অংশটুকুর কাজ করতে হবে এখন। কিন্তু এই অংশের মালিক হলো মতিনের ওয়ারিশরা। তারাই উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন করে ওই অংশের কাজ স্থগিত করে রেখেছে। এতে রাস্তার অন্য অংশ দিয়ে যান চলাচল শুরু হলেও বাড়ির অংশের কাজ শেষ করা যায়নি।

স্থানীয় ছোট বনগ্রাম পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা আকবর আলী বলেন, ‘এই সংযোগ সড়কের কারণে আমাকে বাড়িসহ ভিটা হারাতে হয়েছে। তবে ক্ষতিপূরণের টাকা দিয়ে অন্যত্র বাড়ি করেছি। শহরের হাজার হাজার মানুষের কথা বিবেচনা করে আমরা আপত্তি করিনি। এখন একজন ব্যক্তির কারণে শেষ হচ্ছে না রাস্তার কাজ। এটি হতে দেওয়া যায় না। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে এককভাবে কেউ সুবিধা নিতে পারে না।’

আরেক ব্যক্তি মকবুল হোসেন বলেন, ‘এই সংযোগ সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ হলে নগরীর শপুরা এলাকা থেকে চৌদ্দপাই এলাকায় যেতে সময় লাগবে সর্বোচ্চ ১০ মিনিট। কিন্তু এখন মূল শহরের ভিতর দিয়ে চলাচল করতে সময় লাগে অন্তত ৪০ মিনিট। আবার রাস্তাটি হলে বাস-ট্রাক চলাচল করবে এই সংযোগ সড়ক দিয়ে। তখন মূল শহরে চাপ কমবে।’

রিটকারীরা হলেন প্রয়াত আব্দুল মতিনের স্ত্রী মাহমুদা বেগম, ছেলে নাহিদ বিল্লাহ ও মেয়ে ফাহমিদা বেগম। নাহিদ বিল্লাহর দাবি, ‘আমাদের বাড়ির বড় অংশের ওপর দিয়ে এই রাস্তা যাবে। এতে করে যে পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, সেই পরিমাণ ক্ষতিপূরণ আমরা পাচ্ছি না।’

জানতে চাইলে প্রকল্পটির পরিচালক ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মোর্শেদ জানান, প্রকল্পটির মেয়াদ রয়েছে ২০১২ সাল থেকে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এর মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। বেশির ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু একজন বাড়ির মালিকের বাধার কারণে কাজটির বাকি অংশ শেষ করতে সময় লাগছে। পৌনে সাত কিলোমিটার কাজের বেশির ভাগ শেষ হয়েছে। কিন্তু বাড়ির অংশে এখনো হাত দেওয়া যায়নি। এতে করে পুরো রাস্তার কার্পেটিং থমকে আছে। তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে কিছু জটিলতা সৃষ্টি হবে। তবে আশা করছি, দ্রুত উচ্চ আদালত থেকে স্থগিত আদেশ প্রত্যাহার হয়ে যাবে। সময়মতো কাজটি শেষ করতে পারব।’


মন্তব্য