kalerkantho


পঞ্চগড়ে অনুমোদনহীন করাতকলের ছড়াছড়ি

পঞ্চগড় প্রতিনিধি   

২৪ জুন, ২০১৮ ০০:০০



পঞ্চগড়ে অনুমোদনহীন করাতকলের ছড়াছড়ি

পঞ্চগড় শহরের জালাসী এলাকায় রফিকুল হক বাচ্চুর অবৈধ করাতকল। এই করাতকলের কয়েক শ মিটারের মধ্যে রয়েছে একটি বিদ্যালয়। ছবিটি গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

অনুমোদন বা লাইসেন্সবিহীন করাতকলে (সমিল) ছেয়ে গেছে পঞ্চগড়। জেলা শহর থেকে মফস্বল পর্যন্ত নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে অবৈধ করাতকল। করাতকলের চাহিদা মেটাতে নির্বিচারে ধ্বংস করা হচ্ছে বনভূমি। এতে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্টের আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা। অন্যদিকে লাইসেন্স ছাড়া চলায় রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

করাতকল বিধিমালা অনুযায়ী, পৌর এলাকা ব্যতীত সরকারি কোনো বনভূমির ১০ কিলোমিটারের মধ্যে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্থল সীমানার পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে এবং সরকারি অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বিনোদন পার্কের ২০০ মিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু বোদা উপজেলার বোদেশ্বরী বনের দেড়-দুই কিলোমিটারের মধ্যে, তেঁতুলিয়া ও বোদা উপজেলায় ভারত সীমান্তের দেড়-দুই কিলোমিটারের মধ্যে এবং জেলার পাঁচ উপজেলার বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে করাতকল গড়ে উঠেছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সড়ক ঘেঁষে করাতকল গড়ে ওঠায় পথচারী ও শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছে। বেশির ভাগ করাতকলের মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় স্থানীয় লোকজন প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেই অবাধে চলছে করাতকলগুলো।

সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার পাঁচ উপজেলায় যেখানে-সেখানে আড়াই শতাধিক করাতকল গড়ে উঠেছে। বেশির ভাগ করাতকলের মালিকরা দীর্ঘদিন ধরে কল পরিচালনা করলেও এখনো লাইসেন্সের আবেদন পর্যন্ত করেনি। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত করাতকল চালানোর বিধান থাকলে কিছু কিছু এলাকায় চলছে গভীর রাত পর্যন্ত।

পঞ্চগড় বন বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চগড়ের পাঁচটি উপজেলায় ২৩৮টি করাতকল (সদর উপজেলায় ৭৫, আটোয়ারীতে ২৪, তেঁতুলিয়ায় ৩০, দেবীগঞ্জে ৫১ ও বোদা উপজেলায় ৫৮টি) রয়েছে। এর মধ্যে বোদায় তিনটি ও দেবীগঞ্জে ১২টি করাতকলের লাইসেন্স রয়েছে। অন্যগুলো অবৈধ। এর মধ্যে পাঁচ বছর আগে ৫৯টি করাতকল লাইসেন্স নিলেও সময়মতো নবায়ন করেনি। বন বিভাগের এ পরিসংখ্যানের বাইরে সম্প্রতি জেলায় আবেদন বা লাইসেন্স ছাড়াই বিভিন্ন সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে ২৫-৩০টি করাতকল গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকার কাছাকাছিও গড়ে উঠেছে অনেক করাতকল। এর মধ্যে গত ছয় মাসে সদর উপজেলার সদর ইউনিয়নের শিংপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকায় তিনটি, বোদা উপজেলার বড়শশি, বগদুলঝুলা ও অখড়বাড়ী এলাকায় পাঁচটি করাতকল গড়ে উঠেছে। এক করাতকল শ্রমিক বলেন, বন বিভাগের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে করাতকল মালিকরা তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

পঞ্চগড় সদর ইউনিয়নের শিংপাড়ায় স্থাপিত করাতকলের মালিক মানিক হোসেন বলেন, ‘আমার করাতকলের লাইসেন্সের আবেদন করেছি। কিন্তু রেঞ্জার বদলি হওয়ায় লাইসেন্স হয়নি। শিগগিরই লাইসেন্স করে নেব।’

কালিয়াগঞ্জের জাকির হোসেন বলেন, ‘আমি করাতকলের লাইসেন্সের জন্য কয়েকবার আবেদন করেছি। কিন্তু পাশেই ভারতীয় সীমান্ত ও বনভূমি থাকায় লাইসেন্স দেওয়া হয়নি।’

জেলা পরিবেশ পরিষদের সভাপতি তৌহিদুল বারী বাবু বলেন, ‘অবৈধভাবে যত্রতত্র করাতকল গড়ে ওঠায় গাছগুলো পূর্ণাঙ্গ হওয়ার আগেই কেটে ফেলা হচ্ছে। এটা পরিবেশের জন্য হুমকি। অবৈধভাবে করাতকল স্থাপন বন্ধে প্রশাসনকে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। অবৈধ করাতকল বন্ধ করে দিতে হবে।’

পঞ্চগড় বন বিভাগের ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার কবির হোসেন বলেন, ‘সদর উপজেলায় ছয়টি, বোদায় ছয়টি ও দেবীগঞ্জে সাতটি করাতকলের বিরুদ্ধে বন বিভাগ মামলা করেছে। অবৈধ করাতকল মালিকদের দ্রুত লাইসেন্স করার জন্য আমরা নোটিশ করেছি। তারা লাইসেন্স করতে ব্যর্থ হলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক এবং জেলা করাতকল স্থাপন ও পরিচালনা সুপারিশ প্রণয়ন কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘যেসব করাতকল লাইসেন্স ছাড়া চলছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



মন্তব্য